পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন কর্মসূচি— এসআইআর (SIR) ঘিরে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছে, তা আর প্রশাসনিক রুটিনের পর্যায়ে নেই। এই বিতর্ক আজ স্পর্শ করছে মানুষের জীবন, মানসিক নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাকে। আতঙ্কে আত্মঘাতী হওয়ার অভিযোগ উঠেছে একাধিক সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে। কাজের অস্বাভাবিক চাপ, অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক অসংবেদনশীলতার জেরে প্রাণ হারিয়েছেন কয়েকজন বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও)। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন অনিবার্য— এই পরিণতি কি এড়ানো যেত না?
নির্বাচন কমিশন বরাবরই বলে এসেছে, ভোটার তালিকার শুদ্ধতা গণতন্ত্রের ভিত্তি। সন্দেহভাজন নাম ছাঁটাই, ভুয়ো ভোটার চিহ্নিতকরণ— এই উদ্দেশ্য নীতিগতভাবে প্রশ্নাতীত। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে পদ্ধতি নিয়ে। শুদ্ধতার নামে যদি সন্দেহ, আতঙ্ক এবং প্রশাসনিক চাপই প্রধান হয়ে ওঠে, তবে সেই প্রক্রিয়া নিজেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরোধী হয়ে দাঁড়ায়।
Advertisement
এসআইআর কার্যকর করার ক্ষেত্রে যে তাড়াহুড়ো দেখা গিয়েছে, তা বিস্ময়কর। এখনও নির্বাচন দূরে। তবু স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ তথ্য যাচাই, নথি সংগ্রহ ও ফিল্ড রিপোর্টিং— সব কিছু একসঙ্গে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বহু ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারছেন না, কী নথি লাগবে, কোথায় জমা দিতে হবে, কিংবা ভুল হলে তার পরিণতি কী। নাম বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা, ‘ডাউটফুল ভোটার’ তকমার ভয়—এসব মিলিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়েছে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক সমাজে।
Advertisement
এই আতঙ্ক যে নিছক মনস্তাত্ত্বিক নয়, তার প্রমাণ মিলছে আত্মহত্যার অভিযোগে। কোনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এমন পরিণতি কেবল ‘দুঃখজনক’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যদি প্রশাসনিক কর্মসূচির ফলে মানুষের মধ্যে নাগরিক পরিচয় হারানোর ভয় এতটাই তীব্র হয় যে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে, তবে তার নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায় নির্বাচন কমিশনকে নিতেই হবে।
একই সঙ্গে নজর দেওয়া জরুরি বিএলওদের অবস্থার দিকে। ভোটার তালিকার কাজের মেরুদণ্ড তাঁরাই। অথচ সীমিত জনবল, বাড়তি দায়িত্ব, অবাস্তব ডেডলাইন এবং উপরের স্তরের কড়া নজরদারি—সব মিলিয়ে তাঁদের উপর চাপ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা যদি সত্যিই কাজের চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তা প্রশাসনিক ব্যর্থতার স্পষ্ট ইঙ্গিত। যে ব্যবস্থায় কর্মীর জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের মূল্য নেই, সেই ব্যবস্থা গণতন্ত্রকে কতটা সুরক্ষা দিতে পারে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এত তাড়াহুড়োর প্রয়োজন ছিল কি? চাইলে ধাপে ধাপে, দীর্ঘ সময় ধরে, রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এবং সর্বোপরি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে এই সংশোধন করা যেত। আচমকা ও কঠোর প্রশাসনিক অভিযানের পথে না গিয়ে স্বচ্ছতা ও সহমর্মিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই ছিল যুক্তিযুক্ত পথ।
নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তার দায়িত্ব কেবল ভোটার তালিকা সংশোধন নয়; মানুষের আস্থা রক্ষা করাও তার কর্তব্য। সেই আস্থা একবার ভাঙলে তা ফেরানো কঠিন।
এসআইআর নিয়ে বর্তমান বিতর্ক তাই নিছক প্রশাসনিক ভুলের হিসেব নয়— এ এক গভীর আত্মসমালোচনার মুহূর্ত। কমিশন যদি এখনই তাড়াহুড়োর বদলে সংবেদনশীলতা, স্বচ্ছতা এবং মানবিকতাকে প্রাধান্য না দেয়, তবে ক্ষত আরও গভীর হবে। আর তার মূল্য চোকাতে হবে গণতন্ত্রকেই।
Advertisement



