শোভনলাল চক্রবর্তী
সম্প্রতি শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, অসম্পূর্ণ ও গর্তে ভরা অথবা যানজটের কারণে চলাচলে অনুপযোগী জাতীয় মহাসড়কে যাত্রীদের টোল দিতে বাধ্য করা যাবে না। রায়টি দেওয়া হয় কেরলের পালিয়েক্কারা টোল প্লাজায় টোল আদায় স্থগিত করার কেরল হাই কোর্টের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে সর্বোচ্চ আদালতে আবেদনের শুনানির পরিপ্রেক্ষিতে।
Advertisement
কেরলের ত্রিশূরের ৫৪৪ নম্বর জাতীয় মহাসড়কের এডাপ্পালি-মান্নুথি অংশের খারাপ অবস্থার কথা উল্লেখ করে অগস্টের গোড়ায় কেরল হাই কোর্ট ওই সড়কে চার সপ্তাহের জন্য টোল আদায় স্থগিত করেছিল। সম্প্রতি কেরল হাই কোর্টের সেই রায় বহাল রেখে সর্বোচ্চ আদালত জানায় যে, যখন জনসাধারণ আইনত পরিষেবার জন্য মূল্য প্রদানে বাধ্য হয়, তখন তারা একই সঙ্গে রাস্তায় অবাধ ও নিরাপদ প্রবেশাধিকার দাবি করার অধিকার অর্জন করে।
Advertisement
কিন্তু জাতীয় মহাসড়ক কর্তৃপক্ষ বা এর প্রতিনিধিদের এই ধরনের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা জনসাধারণের বৈধ প্রত্যাশার লঙ্ঘন এবং টোল ব্যবস্থার ভিত্তিটিকেই ক্ষুণ্ণ করেছে। এনএইচএআই নির্দিষ্ট কিছু রাস্তা বা সেতুর জন্য টোল কর আরোপ করে, এবং এর মাধ্যমে প্রাপ্ত রাজস্ব সংশ্লিষ্ট রাস্তা এবং সেতুগুলির রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনার খরচ মেটাতে ব্যবহৃত হয়। অথচ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে জাতীয় সড়কের শোচনীয় অবস্থার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সরকারি সংস্থাটির উদাসীনতার বিষয়টি।
বস্তুত, ত্রিশূরের জাতীয় মহাসড়কের পরিস্থিতির বিষয়ে গত ফেব্রুয়ারিতেই এনএইচএআই-কে সতর্ক করা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
বরং অভিযোগ, তারা মেরামতির দায়িত্বটি তৃতীয় পক্ষের ঠিকাদারদের উপরে ন্যস্ত করে দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে। সরকারি উদাসীনতার পাশাপাশি বহু ক্ষেত্রে জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজগুলি প্রভাবিত হয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি, রাজনৈতিক আঁতাঁতে কোনও সংস্থাকে চুক্তি পাইয়ে দেওয়া এবং সর্বনিম্ন মূল্যে চুক্তি আদায়ের মতো প্রবণতার জেরে। এ বছরের গোড়াতেই জাতীয় মহাসড়ক এবং এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণের মান নিয়ে ক্রমবর্ধমান অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যাপক উপ-ঠিকাদারি কিংবা সর্বনিম্ন মূল্যে চুক্তি হাসিল করে ঠিকাদারদের নিম্নমানের কাজের মতো পদ্ধতিগত সমস্যাগুলি সমাধানের নির্দেশ দেন সড়ক পরিবহণ মন্ত্রককে।
এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে উদ্বোধনের কয়েক মাসের মধ্যেই সদ্যসমাপ্ত মহাসড়ক হয় খানাখন্দে ভরে গিয়েছে অথবা ধসে পড়েছে। বেসরকারি হোক বা সরকারি, জনসাধারণ যার কাছ থেকেই পরিষেবা কিনুক না কেন, সংশ্লিষ্ট পরিষেবার সঠিক মান পাওয়া তাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে। এর অন্যথা হলে, পরিষেবার মূল্য দেওয়ার কোনও দায় যে জনসাধারণের থাকা উচিত নয়, তা যথার্থই নির্দেশ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। দুর্ভাগ্য, যে কোনও সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রে এই বিষয়টিকে কোনও কালেই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ভুললে চলবে না, এই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ সড়কের জেরে যানজট তো বটেই, কিছু ক্ষেত্রে দুর্ঘটনারও শিকার হতে হয় মানুষকে। ফলে, জনসাধারণের স্বার্থ এবং অর্থ যেখানে জড়িয়ে, সেখানে এমন উদাসীনতা ও গাফিলতি চলে কি? কথাটি সড়ক নিয়ে বটে, কিন্তু সেটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। ভাঙা রাস্তা নাগরিক যন্ত্রণার কারণ। গর্তবোঝাই পথকে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালানোর চেষ্টাটিও ভয়ঙ্কর। এতে রাস্তা অসমান হয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ে। কলকাতার মতো সঙ্কীর্ণ ও জনবহুল শহরে দীর্ঘ সময় রাস্তার একাংশ বন্ধ রাখলে যানজট প্রবল হয়।
এতে শুধু মূল্যবান সময় নষ্ট হয় না, গাড়ির গতি থমকালে তা থেকে দূষণের সম্ভাবনাও বাড়ে অনেক গুণ। রাস্তার গর্তে বৃষ্টির জল জমে পতঙ্গবাহিত রোগ সংক্রমণের আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়। চলতি বছরের শুরু থেকে শহরের প্রায় ১১২টি রাস্তায় সংস্কারের কাজ চলছে। যে কাজ ধাপে ধাপে সারা বছর জুড়ে করার কথা, তাকে এক সঙ্গে করতে গেলে হয়রানি বাড়বেই। কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ— সেই দশাই প্রকট। অবশ্য নির্বাচন-সম্মুখে এই তৎপরতার কারণটি সহজবোধ্য। আপাতত হয়রানি সহ্য করাই সু-নাগরিকের দায়িত্ব— পুরকর্তাদের মনোভাব অনেকটা এমনই।
বহুব্যয়ে নির্মিত রাস্তা কিছু দিন অন্তর ভেঙে গেলে তার সারাই করতে যে পরিমাণ খরচ হয়, তার অনেকটাই সাশ্রয় হবে, যদি রাস্তা দীর্ঘ সময় ভাল অবস্থায় থাকে। কিন্তু, রাস্তা নির্মাণ, ফের তা ভেঙে যাওয়া, তাকে মেরামত করা— এ সব বার বার হতে থাকলে বরাদ্দ টাকা নয়ছয়ের সম্ভাবনাটিও প্রভূত বৃদ্ধি পায়।
তৃণমূল শাসনের গোড়ায় রাস্তাঘাট উন্নত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। শহর জুড়ে রাস্তার হাল ফেরানো হয়েছিল উল্লেখযোগ্য ভাবে। রাস্তার কঙ্কালের সঙ্গে বাম আমলের পুরাতন ঘুঘুর বাসাটিও স্বমহিমায় বেরিয়ে পড়েছে। সেই বাসা না-ভাঙলে শতেক বৈজ্ঞানিক পন্থাও জলে যাবে।কলকাতা পুরসভা নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে ভাবে না— এমন দুর্নাম দেওয়া চলে না। তাঁরা অনেক কিছুই ভাবেন, নানা সময়ে হরেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ঘোষণাও করেন— সবই নাগরিক স্বার্থে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের সেই ভাবনাচিন্তার পরিণাম টের পেতে নাগরিকদের বহু সময় লেগে যায়, অথবা তাঁরা বুঝে উঠতেই পারেন না— পরিবর্তনটি ঠিক কোন দিক দিয়ে এল। এর জ্বলন্ত উদাহরণ কলকাতার বহু জায়গার ভাঙা রাস্তা। নাগরিক অভিজ্ঞতা বলে, পুজোর আগে, ভোটের আগে নিয়ম মেনে রাস্তা সারাইয়ের কাজ চলে, গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার একাংশ বন্ধ রেখে, গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে পূর্ত দফতর যে জোরকদমে কাজ করছে— নাগরিকরা বিবিধ অসুবিধা সহ্য করে তা প্রত্যক্ষও করেন। কিন্তু সময় গড়ালেই রাস্তার হাঁ-করা দশাটি পূর্ত দফতরের কাজকেই ব্যঙ্গ করতে থাকে।
সে সব সামলাতে এ বার কিছু অন্য উপায় ভাবা হয়েছে। পূর্ত দফতরের জারি করা নির্দেশিকায় পিচের আস্তরণ বসানোর ক্ষেত্রে দু’ধরনের পদ্ধতি অনুমোদন করা হয়েছে। যেমন— রাস্তার ভিতরের স্তরের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে, পিচ দেওয়ার সময় তার তিনটি স্তর— বেস কোর্স, সাব-বেস বা সাব-গ্রেডের স্থিতিশীলতা নষ্ট করা যাবে না। যে-হেতু এই ভিতরের স্তরটিই রাস্তার মূল ভারটিকে ধরে রাখে, তাই তাকে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে প্রস্তুত করা জরুরি। আরও বলা হয়েছে, আলগা ফাঁকফোকর থাকা স্তর ব্যবহার না করার কথা। কলকাতার মতো শহরে, যেখানে বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক নিয়ম, সেখানে ভিতরের স্তরে জল ঢুকে রাস্তা বসে যাওয়া আটকানোর ভাবনাটিও ইতিবাচক। কিন্তু অচিরেই তার সুফল মিলবে, অভিজ্ঞতা তেমন সাক্ষ্য দেয় না।
সম্প্রতি রাজ্য সরকার পথশ্রী রাস্তাশ্রী প্রকল্পে প্রায় কুড়ি হাজার কিলোমিটার রাস্তা গড়ার কাজে হাত লাগিয়েছে। রাস্তা করার থেকেও যেটা জরুরী সেটা হল রাস্তা সংরক্ষণের কাজ সারা বছরভর চালিয়ে যাওয়া। ভোটের আগে অনেক সময় কাজে তাড়াহুড়ো করে রাস্তার সমস্ত সরঞ্জাম সঠিক অনুপাতে দেওয়া হয়না, তাই সেই সব রাস্তার ক্ষেত্রে সঠিক সংরক্ষণের অভাব রাস্তাকে দ্রুত খারাপ হয়ে যেতে ত্বরান্বিত করে। বেশ কিছু রাস্তায় ইদানিং পিচের খানাখন্দের মাঝে ঝামা ফেলে মেরামতের চেষ্টা হচ্ছে। ঝামার উপরে পিচের প্রলেপ না দিলে অচিরেই গাড়ির চাকার সঙ্গে ঝামা উঠে যাচ্ছে এবং রাস্তা আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আশা করা যে রাস্তাঘাট উন্নয়নের জন্য সরকার আরও মনোযোগী হবেন।
Advertisement



