• facebook
  • twitter
Sunday, 1 March, 2026

হোলি উৎসব ও ঈদ-ই-গুলাবি

দোলযাত্রা বা হোলি হলো মিলনের উৎসব। ধর্মীয় প্রসঙ্গে আড়ালে থাকা এক সামাজিক অনুষ্ঠান— যার একটি সর্বজনীন আবেদন আছে।

প্রতীকী চিত্র

সুকান্ত পাল

দোল উৎসব একটি প্রাচীন হিন্দু বৈষ্ণব উৎসব। ফাল্গুনী পূর্ণিমায় এই উৎসব পালন করা হয়। এই উৎসবের উৎস হিসেবে হিন্দু বৈষ্ণবদের বিশ্বাস এই যে, এই দিন শ্রীকৃষ্ণ রাধারানী ও তার গোপিকাদের সঙ্গে বৃন্দাবনে আবির রঙের খেলা খেলেছিলেন। এই সময় বসন্তের আগমন ঘটে। প্রকৃতিতে ফাগুনের রঙের আগুন যেমন জ্বলে ওঠে তেমনি মানুষ ও মানুষীদের মনেও রঙের দোলা লাগে। বাংলায় এই দিন শ্রীচৈতন্যের জন্মদিন হওয়াতে একদিকে যেমন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের জন্মদিন পালিত হয় তেমনি দোল উৎসব পালন করা হয়।। এই দিন শ্রীকৃষ্ণ ও চৈতন্যদেব সব মিলেমিশে একাকার। বাংলায় আমরা বলি ‘দোলযাত্রা’ আর পশ্চিম ও মধ্য ভারতে বলে ‘হোলি’। হোলি থেকে হোলিকা যার অর্থ ডাইনি— এক অশুভ শক্তি। তাই দোলযাত্রার আগের দিন হোলিকাকে ধ্বংস করে নতুনকে স্বাগত জানানো হয় দোলযাত্রার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীকালে দোলযাত্রার পুরো অনুষ্ঠানটি সামগ্রিক অর্থে ‘হোলি’ বলে পরিচিত হয়ে আসছে।

Advertisement

দোলযাত্রা বা হোলি হলো মিলনের উৎসব। ধর্মীয় প্রসঙ্গে আড়ালে থাকা এক সামাজিক অনুষ্ঠান— যার একটি সর্বজনীন আবেদন আছে। তাই দোলযাত্রা বা হোলির একটি ধর্মনিরপেক্ষ দিক রয়েছে। শুধুমাত্র সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে হোলি খেলা আর সীমাবদ্ধ নয়, সব ধর্মের নারী পুরুষের মনের মধ্যে এই রঙের খেলার মতন জাগে। এবং এটাই স্বাভাবিক। কারণ এই রঙ শুধু শরীরকে রাঙায় না, প্রকৃতির সঙ্গে মনকে এবং জীবনকেও রাঙায়।

Advertisement

সম্রাট আকবর এই হোলি উৎসবকে স্বীকৃতি দিয়ে একে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। তিনি নিজে হিন্দু রানীদের সঙ্গে রঙ ও আবির দিয়ে হোলি খেলতেন এবং এর নাম দিয়েছিলেন ‘ঈদ-ই-গুলাবি’। জাহাঙ্গীর তাঁর স্মৃতি কথায় বলেছেন, তখন হোলি উৎসবটাই ছিল নতুন বছরের উৎসব উদযাপন। রঙ খেলার পর পুরনো পোশাক ছেড়ে নতুন পোশাক পরার মধ্যে লুকিয়ে ছিল পুরনো বছরের যাবতীয় গ্লানি ও মলিনতা ত্যাগ করে নতুন বছরে নতুন জীবনে প্রবেশের এক মহোৎসব। শুধু দিল্লির দরবারেই নয়, অযোধ্যায় আসফ-উদ্-দ্দৌলার দরবার ও রাজ্যে হিন্দু-মুসলমান সম্মিলিতভাবেই হোলি উৎসবে মেতে উঠতেন। দিল্লির দরবারে শুধু ঔরঙ্গজেবের আমলে এই উৎসব বন্ধ ছিল। কিন্তু তারপরে আবার শুরু হয়। এর থেকে বোঝা যায় যে এই উৎসব হিন্দুদের মতো মুসলমানদেরও ছিল প্রাণের উৎসব। আকবরের নিকট ঈদ আর হোলি সমানভাবে আদরের, মর্যাদার ও আনন্দের উৎসব ছিল। সমগ্র মোগল যুগ জুড়ে দেখতে পাই হিন্দুদের হোলি উৎসবে বিভিন্ন নবাব-বাদশাদের হার্দিক অংশগ্রহণ। প্রায় সকল মোগল সম্রাটরাই এই হোলি উৎসবকে নিজেদের প্রাণের উৎসব হিসেবেই মেনে নিয়েছিলেন। মোগল বাদশাদের মতো বাংলার নবাবরাও হোলিতে অংশগ্রহণ করতেন।

বাংলার প্রেক্ষাপটটা আরও বেশি মজবুত ছিল অন্য কারণে। তা সংক্ষেপে একটু বলা প্রয়োজন। চৈতন্যদেবের জাতপাতহীন দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবতার প্রতি উদার আহ্বান বহু মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের হৃদয়ে তরঙ্গ তুলেছিল। আমরা লক্ষ্য করি বৈষ্ণব প্রেম ধর্মের‌ মধ্যে‌ যে মানবপ্রেমের উদারতা ছিল তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বহু মুসলিম কবিরও আবির্ভাব ঘটেছিল। এর মধ্যে আলী রাজা উল্লেখযোগ্য। তাঁর লিখিত জ্ঞানসাগর, মুন্সী শ্রীযুক্ত আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত হয়। আব্দুল করিম তাঁকে মুসলমান বৈষ্ণব কবি নামে অভিহিত করেন। প্রখ্যাত পীর এবং বৈষ্ণব কবি সৈয়দ মুর্তজা রচনা করেন—
‘পার কর, পার কর, মোরে নাইয়া কানাইয়া
কানাই মোরে পার কর রে।
ঘাটের ঘাটিয়াল কানাই পন্থের চৌকিদার
নয়ালী যৌবন দিমু খেয়ার পাই পার…’
আরও একজন মুসলমান কৃষ্ণ আরাধক লাল মাহমুদ লেখেন—
‘জন্ম নিয়া মুসলমানের বঞ্চিত হব শ্রীচরণে,
মনে মনে ভাবি না একবার।
(এবার) লাল মামুদে হরেকৃষ্ণ নাম করেছে সার।’
প্রকৃতপক্ষে বাংলায় চৈতন্যদেবের আন্দোলনটাই একটা সামাজিক সমন্বয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। এ কারণেই এই বাংলার মাটিতে মহরমের তাজিয়া আর হোলি উৎসব যেন দুই সম্প্রদায়ের একই উৎসব।
হিন্দু মুসলমান নয়, বাঙালির উৎসব।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলায় হোলি উৎসব একটা সামাজিক সমন্বয় এবং মেলবন্ধন ও প্রীতি উৎসবে পরিণত হয়। দিল্লির সম্রাট বা বাদশাদের মত বাংলার নবাবরা আন্তরিকভাবেই হোলিতে অংশগ্রহণ করতেন। আবুল ফজলের আইনী আকবরী, জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনী তুজুক-ই- জাহাঙ্গীরি, আরভিন সাহেবের কুতুব-উল-মূলক, হাজী মুস্তফার শের-উল-মুতাক-হেরিন প্রভৃতি গ্রন্থ থেকেই আমরা বিস্তৃত তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারি যে, বাংলার মুসলমান শাসকরা কতটা আন্তরিকভাবে এই হোলি উৎসবকে গ্রহণ করেছিলেন। বাংলার নবাব মীরজাফর এবং তাঁর পুত্র মুবারকউদ্দৌল্লা হিন্দুদের সঙ্গে রীতিমতো এই বসন্ত উৎসবে মেতে উঠতেন। মীরজাফর নিজে হোলির রঙ খেলার জন্য তো রীতিমত একটি সুরম্য বাগান ‘চেল সুহান’ তৈরিই করে ফেলেছিলেন।
মনে রাখতে হবে যে উৎসবে মানুষের সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধন ঘটে-সেটা মহোৎসব। এই মহোৎসবে অন্তরের যোগাযোগটাই আসল। তাই হিন্দুর ধর্মীয় অনুষ্ঠান হোলি মুসলমানের কাছে হয়ে ওঠে ঈদ-ই গুলাবি এবং ঈদ-ই-গুলাবি হিন্দুর কাছে হোলি। এখানে ধর্মের থেকেও মানুষ বড়। অন্তরে টান যে অমোঘ! একথা আমরা আর কবে বুঝব?

Advertisement