পশ্চিম এশিয়ায় শান্তির সম্ভাবনা আবার অনিশ্চয়তার ছায়ায় ঢেকে গেল। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা বহু দশক পর সরাসরি মুখোমুখি হয়েছিলেন, তার ব্যর্থ পরিণতি শুধু কূটনৈতিক অচলাবস্থার ইঙ্গিতই নয়, বরং সম্ভাব্য নতুন সংঘাতেরও পূর্বাভাস বহন করছে। যে দুই-সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে স্থাপিত হয়েছিল, তা এখন কার্যত দোদুল্যমান। বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যুদ্ধ কি আবার শুরু হতে চলেছে?
এই ব্যর্থতার দায় কার, তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। মার্কিন পক্ষের দাবি, ইরান নাকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘নমনীয়’ প্রস্তাব গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, প্রস্তাবটি আদৌ কতটা নমনীয় ছিল? ৪৩০ কেজি প্রায় অস্ত্র-মানের ইউরেনিয়াম ত্যাগ করা, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারের জমাট বাঁধা অর্থ মুক্ত করার দাবি— এই তিনটি শর্তই ইরানের কাছে অত্যন্ত কঠোর বলে প্রতীয়মান হওয়া স্বাভাবিক। ফলে আলোচনার টেবিল থেকে কোনও সমাধান ছাড়াই প্রতিনিধিদলগুলির ফিরে আসা অপ্রত্যাশিত নয়।
Advertisement
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন— একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র কি তার প্রতিরক্ষার স্বার্থে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করতে পারে না? ইরান বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রতিরক্ষামূলক, প্রতিরোধমূলক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল এটিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় বিপদ বলে মনে করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত দুই বছরে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র দু’বার বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছে এবং সাম্প্রতিক সংঘাতে প্রায় ১,৭০০ সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ২৫০ জন শিশু।
Advertisement
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের নিরাপত্তা-উদ্বেগকে একেবারে অমূলক বলা যায় না।তবে এখানেই ইরানের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন তারা হরমুজ প্রণালীকে চাপ সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এই প্রণালী বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রধান পথ। এটি বন্ধ করে দেওয়া মানে কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ইজরায়েলকে নয়, গোটা বিশ্বকেই বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যাহত হওয়া– এসবের প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনীতিতে, এমনকি ভারতের মতো দেশেও যার জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক জলপথ অবরুদ্ধ করা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয় এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ।
অন্যদিকে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপও কোনো অংশে কম অযৌক্তিক নয়। একটি দেশের ওপর এভাবে একতরফা শর্ত চাপিয়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক কূটনীতির মৌলিক নীতির পরিপন্থী। শক্তির জোরে শর্ত আরোপের এই প্রবণতা বিশ্বব্যবস্থাকে আরও অস্থির করে তুলছে। একইসঙ্গে, ইজরায়েলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। লেবাননে হিজবুল্লাহকে কেন্দ্র করে তাদের সামরিক তৎপরতা এবং যুদ্ধবিরতির সুযোগে ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ— এই সমস্ত পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় হলো, আলোচনার পথ খোলা রাখা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষকেই তাদের কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসতে হবে। অবশ্য ইরান বলেছে, একটি বৈঠক ব্যর্থ হওয়া মানেই আলোচনা শেষ হয়ে যাওয়া নয়।তবে পরস্পরের প্রতি আস্থার অভাবই এই সংকটের মূল কারণ, এবং সেই আস্থা পুনর্গঠনের জন্য ধারাবাহিক সংলাপ অপরিহার্য। যুদ্ধ কোনও সমাধান নয়— বরং তা আরও ধ্বংস, আরও অস্থিরতা ডেকে আনে।
বিশেষ করে উপসাগরীয় আরব দেশগুলির জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইরান সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে না পারলেও, তার প্রতিক্রিয়া পড়ছে এই দেশগুলির ওপর— মিসাইল ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে। ফলে এই অঞ্চলটিই হয়ে উঠছে প্রক্সি সংঘর্ষের প্রধান মঞ্চ।
সবশেষে বলা যায়, এই মুহূর্তে বিশ্ব যে এক নতুন যুদ্ধের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে— তা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগ্রাসী ভাষণ, ইজরায়েলের সামরিক প্রস্তুতি এবং ইরানের প্রতিরোধমূলক অবস্থান— এই তিনের সমন্বয় এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে। এই অবস্থায় সংলাপই একমাত্র পথ, যা অন্তত যুদ্ধবিরতিকে টিকিয়ে রাখতে পারে এবং ভবিষ্যতের একটি স্থায়ী শান্তির ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।শান্তি প্রতিষ্ঠার এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে, তার মূল্য শুধু পশ্চিম এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বকেই চোকাতে হবে।
Advertisement



