পুলক মিত্র
শুরু হয়েছিল ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বা এসআইআর দিয়ে। এখন পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধের আঁচ এসে পড়েছে এই বাংলায়। এলপিজি সঙ্কটের জেরে রান্নার গ্যাসের হাহাকার চরমে উঠেছে। নাকাল হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। একে হাতিয়ার করে ভোটমুখী বাংলায় তাঁর সক্রিয়তা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এসআইআর বিতর্ক এখন কার্যত চাপা পড়ে গিয়েছে। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ‘অসম্মান’ বিতর্কও এখন পিছনে চলে গিয়েছে।
Advertisement
কেন্দ্র তথা নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর আক্রমণের ঝাঁঝ বাড়িয়ে দিয়েছেন মমতা। রান্নার গ্যাস নিয়ে বারবার নিশানা করে চলেছেন কেন্দ্রকে। পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন প্রশাসনিক তৎপরতাও। নবান্নে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠকও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। দলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে প্রতিবাদ কর্মসূচিরও ডাক দেওয়া হয়েছে।
Advertisement
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ কতদিন চলবে, তা বলা কঠিন। তাই আমজনতার দুশ্চিন্তা বাড়ছে। শুধু মমতা নন, রান্নার গ্যাস নিয়ে এই পরিস্থিতির জন্য কেন্দ্রকে দুষছেন আম নাগরিকদের অনেকে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ প্রথমে জানানো হয়েছিল, একটি গ্যাস বুক করার পর ২১ দিনের মধ্যে দ্বিতীয় গ্যাস বুকিং করা যাবে না। পরে তা বাড়িয়ে এই সময়সীমা ২৫ দিন করা হয়। কেন্দ্রের এই ঘোষণার জন্যই মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
তাই কলকাতা থেকে রাজ্যের সর্বত্র বিভিন্ন গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার কার্যালয়ে মানুষের ভিড় করছেন। অন্যদিকে, ফোনের মাধ্যমে গ্যাস বুক করার যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা-ও ঠিকভাবে কাজ করছে না। চাপের মুখে কেন্দ্রীয় সরকার মানুষকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, দেশে গ্যাসের কোনও সঙ্কট হবে না। কিন্তু কেন্দ্রের ঘোষণা সত্ত্বেও খুব একটা ভরসা পাচ্ছেন না আমজনতা।
কেন্দ্রকে কাঠগড়ায় তুলে মমতা বলেছেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা প্যানিক তৈরি হয়েছে। গ্যাসের জোগান নেই। তাই আমি ভর্তুকি দিতে চাইলেও, কোনও লাভ হবে না। গ্রাম বাংলা থেকে শহর, সবার সমস্যা হচ্ছে।’ রাজ্যের গ্যাস যাতে বাইরে না-যায়, সেই নির্দেশও জারি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বাড়ি বাড়ি তো বটেই, রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান, অটো, সবাই সঙ্কটের শিকার। অনেক অটোচালক আবার রান্নার গ্যাস ভরে অটো চালাচ্ছেন, কারণ, সিএনজি নিয়ে অনিশ্চয়তা। বেশ কয়েকটি রুটে অটো ভাড়াও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
১৯৮৪-র লোকসভা ভোটে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট সিপিএম প্রার্থীকে হারিয়ে সংসদীয় রাজনীতির আঙিনায় পা রেখেছিলেন মমতা। তারপর ২০১১-তে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারের পতন এবং মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতার অভিষেক। ১৯৮৪ থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রীর হওয়ার আগে পর্যন্ত বাংলায় প্রতিবাদের মুখ হিসেবে বারবার সংবাদের শিরোনামে উঠে এসেছেন মমতা। নন্দীগ্রামে বিক্ষোভ-আন্দোলন, সিঙ্গুরে অবস্থান-বিক্ষোভ, ধর্মতলায় ২৬ দিনের অনশন, কিংবা, ১৯৯৩-এর ২১ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক মহাকরণ অভিযান–সবক্ষেত্রেই নিজের অবিসংবাদী নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মমতা।
মুখ্যমন্ত্রী হয়েও তাঁর সেই প্রতিবাদী ভাবমূর্তিকে অক্ষত রেখেছেন মমতা। তাই যখনই রাজ্যের ওপর কোনও আঘাত এসেছে, তিনি তাঁর প্রতিবাদী সত্তাকে হাতিয়ার করে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তার সর্বশেষ নজির হল, রান্নার গ্যাস-সঙ্কট।
আর মমতার এই ভূমিকা বেজায় অস্বস্তিতে ফেলেছে বাংলার বিজেপির নেতৃত্বকে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ায় ভোটারদের একাংশ বিজেপির ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। এই ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত দরবার করেছেন মমতা। তাঁর প্রতিবাদকে ছড়িয়ে দিয়েছেন জাতীয় স্তরে।
এই মুহূর্তে রুষ্ট ভোটারদের তুষ্ট করার মতো কোনও জুতসই জবাব বিজেপি নেতাদের কাছে নেই। তার ওপর ভোটের মুখে গ্যাস-সঙ্কট তাঁদের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, কেন্দ্রের ভুলের জন্যই এই পরিস্থিতি। আর তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে তৎপর হয়ে উঠেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই রাজ্যের ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর বারবার কেন্দ্রের আঘাত থেকে শুরু করে রাজ্যের প্রাপ্তি নিয়ে বঞ্চনা, বিজেপির মোকাবিলায় তৃণমূলের হাতে একগুচ্ছ ইস্যু। এখন সেইসব ইস্যুকে হাতিয়ার করে লড়াইয়ের অস্ত্রে শান দিচ্ছেন
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
Advertisement



