• facebook
  • twitter
Saturday, 7 March, 2026

এসআইআরের নামে বাঙালি ও বাংলার উপর এত বড় আঘাত আগে আসেনি

রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি বরাবর এ রাজ্যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী এবং বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতির অভিযোগ করে আসছে।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

নোটন কর

প্রায় চার মাস ধরে পশ্চিম বাংলায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) ভোটার তালিকা তৈরি পর্ব চলার পর অবশেষে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে জাতীয় নির্বাচন কমিশন প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন নথিপত্র-যাচাইয়ের নামে নাগরিকদের চূড়ান্তভাবে হেনস্থা করা হয়েছে। আতঙ্কে অনেকে মারা গেছেন। কয়েকজন বিএলও অত্যধিক কাজের চাপ ও টেনশনে মারা গেছেন। নির্বাচন কমিশন এই দফায় বাদ দিয়েছে প্রায় ৫.৫ লক্ষ নাম। প্রথম খসড়া তালিকায় (গত ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত) বাদ গিয়েছিল প্রায় ৫৮.২০ লক্ষের নাম। এদের মধ্যে আছেন মৃত ভোটার, নয়তো ঠিকানা বদলেয়েছেন, আর আছেন আরও প্রায় ৩০ লক্ষ ‘আনম্যাপড’ ভোটার। এই ৫৮.২০ লক্ষের সঙ্গে ৫ লক্ষ যোগ করলে দু’দফা মিলিয়ে মোট বাদ গেল ৬৩ লক্ষের বেশি নাম। তথ্যগ্রাহ্য অসঙ্গতির (logical discrepancy) আওতায় ঝুলে রইল আরও অন্তত ৬০ লক্ষর বেশি ভোটারের নাম। লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেনসিতে শুনানির সময় নানা অবান্তর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পাঁচ ভাই বোনের বাবার নাম একই কেন, চট্টোপাধ্যায় আর চ্যাটার্জী একই কেন, শেখ বানান Sk নাকি sheikh নাকি শেখ, মহিলাদের বিয়ের পর পদবী বদল হল কেন…. ইত্যাদি।

Advertisement

কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুসারে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে চূড়ান্ত ভোটার রয়েছেন ৬,৪৪,৫২,৬০৯ জন। এছাড়া বিচারাধীন রয়েছেন ৬০,০৬,৬৭৫। এই ৬০ লক্ষ ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের নথি এখন যাচাই করবেন বিচারক ও বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা। প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, পুরুষ ভোটার ৩,২৮,১০,৮৭২ জন, মহিলা ভোটার ৩,১৬,৪০,৫৮৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১,১৫২ জন। গত বছরের নভেম্বর মাসে এসআইআর শুরু হওয়ার সময় মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭,৬৬,৩৭,৫২৯। বাদ পড়া তালিকায় বেশি রয়েছেন মুসলিম, দলিত, মতুয়া ও মহিলারা। প্রথম দফায় চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়া মহিলা ভোটার রয়েছেন ২৭৭৮৭৭ জন এবং পুরুষ ভোটার ২৬৮১৪৭ জন।

Advertisement

যে চূড়ান্ত তালিকাটি প্রকাশ হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে সব থেকে বেশি নাম বাদ পড়েছে দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায়। জেলাগুলো মুসলিম অধ্যুষিত। প্রথম দফা চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে নাম বাদ (deleted) এবং বিচারাধীন (under adjudication) থাকার নিরিখে সংখ্যালঘু প্রধান জেলা নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ রাজ্যের মধ্যে এগিয়ে। নদীয়া জেলায় নাম ‘বাদ’ গিয়েছে প্রায় ৬২০০০। মুর্শিদাবাদ জেলায় ‘বিচারাধীন’ অন্তত ১১,২১,২০৫ জন। কমিশন জেলাভিত্তিক বিচারাধীন যে তালিকা প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, এই ৬০ লক্ষের মধ্যে ২৪ লক্ষ নাম রয়েছে ৩টি জেলায়। মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং উত্তর দিনাজপুর। ঘটনাচক্রে এই তিনটি জেলাই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। যে অংশ রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের ভোটের অন্যতম ভিত্তি। মুর্শিদাবাদে বিচারাধীন রয়েছে ১১ লক্ষ ১ হাজার ১৪৫ জনের নাম। মালদহে সংখ্যাটা ৮ লক্ষ ২৮ হাজার ১২৭। আর উত্তর দিনাজপুরে ৪ লক্ষ ৮০ হাজার ৩৪১। এই তিন জেলায় মোট বিচারাধীনের সংখ্যা ২৪ লক্ষ ৯ হাজার ৬১৩। এ ছাড়াও দুই ২৪ পরগনা যেমন উত্তর ২৪ পরগনায় বিচারাধীন রয়েছে ৫ লক্ষ ৯১ হাজার ২৫২ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৫ লক্ষ ২২ হাজার ৪২। দুই ২৪ পরগনার বিচারাধীন ভোটার সংখ্যা ১১ লক্ষ ১৩ হাজার ২৯৪। অর্থাৎ এই ৫টি জেলায় যে পরিমাণ নাম বিচারাধীন তালিকায় রয়েছে, তা মোট নামের ৫০ শতাংশের বেশি। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এ বনগাঁ ও দক্ষিণ নদিয়ায় মতুয়া ও নমঃশূদ্র সমাজের বড় অংশের নাম বাদ পড়ায় রীতিমতো অস্বস্তিতে বিজেপি নেতৃত্ব। কমিশনের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে মালদহের রতুয়া কেন্দ্রে বিজেপি ভোট পেয়েছিল ৫৭ হাজার। সেই এলাকাতেই বিচারাধীন এবার ১ লক্ষ ৪ হাজার।

মালতিপুর কেন্দ্রে বিজেপি ভোট পেয়েছিল ৩৬ হাজার ১৫৬টি। বিচারাধীন ভোটার রয়েছেন ৯৪ হাজার ৩৭ জন। হরিশচন্দ্রপুরে বিজেপি ভোট পেয়েছিল ৪৯ হাজার, বিচারাধীন হয়েছেন ৯১ হাজার ভোটার। মোথাবাড়িতে বিজেপি ভোট পেয়েছিল ৪৩ হাজার। এসআইআর-এ বিচারাধীন রয়েছেন ৮০ হাজার। একই ভাবে মুর্শিদাবাদের জেলার রঘুনাথগঞ্জে বিজেপি ভোট পেয়েছিল ২৭ হাজার। বিচারাধীন হয়েছেন ১ লক্ষ ১৫ হাজার ভোটার। ভগবানগোলায় বিজেপি ভোট পেয়েছিল ১৮ হাজার ৪৯০টি। বিচারাধীন হয়েছেন ১ লক্ষ ১০ হাজার ভোটার। এছাড়াও সামশেরগঞ্জে বিচারাধীন রয়েছেন ১ লক্ষ ৮ হাজার, সুতিতে বিচারাধীন ১ লক্ষ ৯ হাজার এবং লালগোলায় ১ লক্ষ। এইসব বিধানসভায় গড়ে ২ লক্ষ ভোটার আছে, কমিশন ১ লক্ষ থেকে ১.৫ লক্ষকে বিচারাধীন রেখেছে। মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে ‘বিচারাধীন’-এর সংখ্যা এমন নিখুঁত হিসেবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ২০২১এ তৃণমূল কংগ্রেস যত ব্যবধানে জিতেছে, সেখানে তার থেকে বেশি বিচারাধীন। যাঁরা বাদ গেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠই সংখ্যালঘু এবং তূণমূল কংগ্রেসের ভোটার।
বিহারে এসআইআর-এ ফর্ম-৬-এর মাধ্যমে ২১ লক্ষ ৫৩ হাজার নাম যোগ হয়। খসড়া তালিকায় থেকে নাম বাদ যায় ৩ লক্ষ ৬৬ হাজারের নাম। খসড়া তালিকা থেকে যত নাম বাদ গিয়েছে, তার ৬ গুণের বেশি যোগ হয়েছে। সম্প্রতি তামিলনাড়ুর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এসআইআর-এর দাবি-অভিযোগ পর্বে ২৭ লক্ষ ৫৩ হাজার নাম যোগ হয়েছে। কিন্তু বাদ গিয়েছে মাত্র ৪ লক্ষ ২৩ হাজার। এ ক্ষেত্রেও যত নাম বাদ গিয়েছে, তার ৬ গুণের বেশি যোগ হয়েছে। পঃবাংলায় ঠিক উল্টো ছবি। খসড়া তালিকায় যোগ হয়েছে ১ লক্ষ ৮২ হাজারের নাম। বাদ গিয়েছে ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার। ৩ গুণের বেশি।

রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি বরাবর এ রাজ্যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী এবং বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতির অভিযোগ করে আসছে। এ বিষয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ যোগ্য ভোটারদের বেছে তালিকাভুক্ত করা এবং অযোগ্য ভোটারদের প্রমাণ-সহ তালিকা থেকে বের করা। কে বাংলাদেশি বা কে রোহিঙ্গা, সেই বিচার কমিশন করতে পারে না।’ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার যেটা বলেননি, তা হল, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী আর রোহিঙ্গা তো দূরস্থান, বৈধ ভোটাররাই ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। এবার সবটা মিলিয়ে যদি হিসাব করি তা হলে দেখা যাবে মোট সংখ্যাটা ১ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। বিজেপি নেতৃত্ব প্রথম থেকে দাবি করে আসছিল, ১ কোটি মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। যে দাবি তারা করেছিল, সে মতোই যে নির্বাচন কমিশন কাজ করছে, প্রথম দফা চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হতেই তা পরিষ্কার হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কত বৈধ ভোটার এই তালিকা থেকে বাদ যাবেন তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় এবং উদ্বেগ রয়েছে। এসআইআর-এর নামে আজ বাঙালি ও বাংলার উপর যে আঘাত অশুভ শক্তির দ্বারা নেমে এসেছে, যদি না এই মূহূর্তে আমরা রুখে দাঁড়াই, তবে তার ক্ষত বাঙালি ও বাংলাকে বহুদিন বইতে হবে।

Advertisement