অন্নপূর্ণার বার্তা

Image: FB/narendramodi

১৭ সেপ্টেম্বর ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ৭৬তম জন্মবার্ষিকী। সেই দিনই পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের জন্য অন্নপূর্ণা যোজনার চতুর্থ কিস্তির আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিলেন, তার রাজনৈতিক তাৎপর্য যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সরাসরি মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়ার যে ব্যবস্থা, তা মহিলাদের আর্থিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
অন্নপূর্ণা যোজনার আওতায় পশ্চিমবঙ্গের প্রায় দেড় কোটি মহিলা চতুর্থ কিস্তিতে ৩,০০০ টাকা করে পাচ্ছেন বলে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই অর্থ কোনও মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে নয়, সরাসরি মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে। ফলে সরকারি সহায়তার অর্থ কারও হাতে আটকে থাকার বা তার একটি অংশ অন্য কারও কাছে চলে যাওয়ার আশঙ্কা কমে। সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সরাসরি অর্থ হস্তান্তর যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই ব্যবস্থা তারই একটি উদাহরণ।
অন্নপূর্ণা যোজনার সবচেয়ে ইতিবাচক দিকগুলির একটি হল, এর কেন্দ্রে রয়েছেন মহিলারা। একটি পরিবারে মহিলার হাতে যখন কিছু নিজস্ব অর্থ থাকে, তখন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজনই মেটে না; পরিবারের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তাঁর ভূমিকা বাড়তে পারে। সন্তানদের পড়াশোনা, ওষুধপত্র, খাদ্য, পোশাক কিংবা সংসারের অন্য জরুরি খরচ— কোথায় অর্থ ব্যয় হবে, সেই সিদ্ধান্তে মহিলার নিজের মতামতের গুরুত্ব বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ, আর্থিক সহায়তা যদি সরাসরি মহিলার হাতে পৌঁছয়, তা নিছক একটি সরকারি অনুদান হয়ে থাকে না; তা ধীরে ধীরে ক্ষমতায়নের একটি উপায়ও হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই ইতিবাচক সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে পরিণত করতে হলে প্রকল্পের বাস্তবায়নে আরও কিছু বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোনও যোগ্য মহিলা যেন অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা থেকে বাদ না পড়েন। এই কথাটিই এখন প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হওয়া উচিত। কারণ, কোনও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সাফল্য শুধু কত টাকা বিতরণ করা হল, তার হিসাব দিয়ে নির্ধারিত হয় না। প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন যোগ্য প্রত্যেক মানুষ সহজে এবং সম্মানের সঙ্গে তাঁর প্রাপ্য সুবিধা পান।
এখানেই যোগ্যতার মাপকাঠি ও উপভোক্তা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ছিল তুলনামূলকভাবে সর্বজনীন প্রকল্প, আর অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে যোগ্যতার নির্দিষ্ট মাপকাঠি রয়েছে। ফলে দু’টি প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও কাঠামো এক নয়। অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষেত্রে তাই উপভোক্তা বাছাইয়ের প্রক্রিয়া যতটা স্বচ্ছ, সহজ ও দ্রুত হবে, প্রকল্পটি তত বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। যোগ্য হয়েও কোনও মহিলা যেন শুধু নথির সমস্যা, প্রযুক্তিগত জটিলতা বা প্রশাসনিক ভুলের কারণে বাদ না পড়েন, সেটিও নিশ্চিত করা দরকার।
প্রধানমন্ত্রী ‘কাটমানি’ বন্ধ হওয়ার কথা বলেছেন। এই অভিযোগ ও পাল্টা-অভিযোগের রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়েও একটি বিষয় স্পষ্ট— সরকারি প্রকল্পের অর্থ সরাসরি উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছনো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা কমানোর একটি কার্যকর পদ্ধতি। ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার এবং সরাসরি অর্থ হস্তান্তর তাই আরও শক্তিশালী করা দরকার। একই সঙ্গে যাঁদের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা বা ডিজিটাল পরিষেবায় সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থাও থাকা জরুরি।
অন্নপূর্ণা যোজনাকে তাই কেবল একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের হিসাব হিসেবে দেখলে এর সামাজিক সম্ভাবনাটি ছোট করে দেখা হবে। মহিলাদের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দেওয়া, তাঁদের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানো এবং সরকারি সহায়তার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর নির্ভরতা কমানো— এই তিনটি দিক যথাযথভাবে কার্যকর হলে প্রকল্পটি বৃহত্তর মহিলা ক্ষমতায়নের পথে ভূমিকা রাখতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে যে কোনও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ক্ষেত্রেই শেষ কথা হওয়া উচিত উপভোক্তার স্বার্থ। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, প্রকল্পের নাম ও পদ্ধতি নিয়ে মতভেদও থাকবে। কিন্তু তার ঊর্ধ্বে উঠে যদি নিশ্চিত করা যায় যে যোগ্য মহিলার হাতে নিয়মিত, স্বচ্ছ এবং কোনও অতিরিক্ত বাধা ছাড়াই তাঁর প্রাপ্য অর্থ পৌঁছচ্ছে, তাহলেই অন্নপূর্ণার প্রকৃত অর্থ প্রতিষ্ঠিত হবে। মহিলার হাতে অর্থ মানে শুধু একটি পরিবারের হাতে বাড়তি টাকা নয়— অনেক সময় তা সেই পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর কণ্ঠস্বরকেও আরও শক্তিশালী করে।