ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কের সাম্প্রতিক উষ্ণতা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। ইজরায়েলের পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দুই দেশের অভিন্ন অবস্থানের কথা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলায় প্রায় ১,২০০ ইজরায়েলির মৃত্যুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসদমনকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তারপর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ককে ‘বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব’-এর স্তরে উন্নীত করে বাণিজ্য, কৃষি, শক্তি, সাইবার প্রযুক্তি, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ব্যক্তিগত রসায়নও এই সম্পর্ককে উষ্ণ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নিঃসন্দেহে, ইজরায়েল ভারতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি-সহযোগী। যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি ভারতের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোর পক্ষে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। কৃষি ও জলব্যবস্থাপনায় ইজরায়েলের অভিজ্ঞতা, সাইবার নিরাপত্তায় দক্ষতা, এসব ক্ষেত্রেও সহযোগিতা ভারতের জন্য উপকারী। বাস্তববাদী কূটনীতিতে জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে এবং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দিল্লির এই পদক্ষেপ অস্বাভাবিক নয়।
Advertisement
তবে প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়। ইজরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতি সমর্থন জানালেও গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযানে বিপুল প্রাণহানির প্রসঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর নীরবতা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির হিসাব অনুযায়ী, গাজায় মৃতের সংখ্যা কয়েক লক্ষ ছাড়িয়েছে। ভারতের ঐতিহ্যগত অবস্থান ছিল— সন্ত্রাসবাদের নিন্দা, কিন্তু একই সঙ্গে প্যালেস্তাইনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে সমর্থন এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি আস্থা। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যই এতদিন ভারতের পশ্চিম এশিয়া নীতির ভিত্তি ছিল।
Advertisement
ভারত দীর্ঘদিন ধরে ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইন– দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একদিকে ইজরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, অন্যদিকে প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে নীতিগত সমর্থন। এই কৌশল ভারতের কূটনীতিকে নমনীয়তা দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক অবস্থান যদি একপেশে বলে প্রতীয়মান হয়, তবে তা শুধু প্যালেস্তাইন নয়, বৃহত্তর আরব বিশ্বের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
পশ্চিম এশিয়া ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় দেশগুলিতে বিপুল ভারতীয় প্রবাসী কর্মরত, জ্বালানি আমদানির বড় অংশ আসে এই অঞ্চল থেকে এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কও গভীর। সেই প্রেক্ষাপটে, ইজরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো যেমন যৌক্তিক, তেমনই আরব অংশীদারদের উদ্বেগকে উপেক্ষা করাও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষত এমন সময়ে, যখন আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা ওই অঞ্চলটিকে অস্থিরতার মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে, তখন ভারসাম্য রক্ষা আরও জরুরি।
ভারতের কূটনৈতিক শক্তি বরাবরই ছিল তার বহুমুখী সম্পর্ক রক্ষা করার ক্ষমতা। দিল্লি একই সঙ্গে ওয়াশিংটন, তেহরান, রিয়াধ ও তেল আভিভের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছে। এই বহুমাত্রিক কৌশলই ভারতের স্বার্থকে সুরক্ষিত করেছে। তাই ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার সময় প্যালেস্তাইন প্রশ্নে মানবিক উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা প্রয়োজন ছিল বলেই অনেকের মত।
এখানে আরও একটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। ভারত নিজেকে গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের একটি দায়িত্বশীল কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরতে চায়। সেই অবস্থানে থেকে মানবিক সঙ্কট, বেসামরিক প্রাণহানি ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রশ্নে সম্পূর্ণ নীরব থাকা কঠিন। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনই সামরিক প্রতিক্রিয়ার অনুপাত ও মানবিক প্রভাব নিয়েও মত প্রকাশ করা দায়িত্বের অংশ।
অতএব, ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী। একদিকে ইজরায়েলের সঙ্গে প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো; অন্যদিকে প্যালেস্তাইনি জনগণের অধিকার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে নীতিগত অবস্থান বজায় রাখা। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই পরিণত কূটনীতির লক্ষণ। অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা যেমন ভুল বার্তা দিতে পারে, তেমনই অযথা দূরত্বও জাতীয় স্বার্থে সহায়ক নয়।
ভারতের উচিত স্পষ্টভাবে জানানো যে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই ও মানবিক ন্যায়বোধ— দুইই তার নীতির অংশ। কৌশলগত অংশীদারিত্বের উষ্ণতার মধ্যেও এই নীতিগত স্পষ্টতা বজায় রাখাই দীর্ঘমেয়াদে দিল্লির জন্য লাভজনক হবে। কারণ পশ্চিম এশিয়ার জটিল সমীকরণে একপেশে অবস্থান নয়, ভারসাম্যই সঠিক পথ।
Advertisement



