খালি পায়ের দৌড় এবং শিক্ষার স্বপ্ন

Photo: Pexels (প্রতীকী ছবি)

মহারাষ্ট্রের বীড জেলার ৪৭ বছরের রামাবাই রণবীরের খালি পায়ে তিন কিলোমিটার দৌড়ের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে অনেকের মন ছুঁয়ে গেছে। তিনি কোনও প্রশিক্ষিত দৌড়বিদ নন। তাঁর পায়ে ছিল না দৌড়ের উপযুক্ত জুতোও। তবু তিনি দৌড়েছিলেন এবং প্রথম হয়েছিলেন। পুরস্কার হিসেবে পাওয়া তিন হাজার টাকা তাঁর কাছে ছিল অমূল্য। কারণ সেই টাকা দিয়ে তিনি মেয়েদের বই ও পড়াশোনার সামগ্রী কিনতে চেয়েছিলেন। তাই রামাবাইয়ের এই দৌড় কেবল একটি প্রতিযোগিতায় জয়ের গল্প নয়, এটি দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের শিক্ষার জন্য প্রতিদিনের সংগ্রামের একটি প্রতীক।

রামাবাই নিজে মাত্র তেরো বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর ২০১২ সাল থেকে তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। কখনও অন্যের জমিতে সয়াবিন, ছোলা বা হলুদ সংগ্রহ করেছেন, কখনও সেগুলি প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করেছেন। সংসারের অভাব তাঁর জীবনের সঙ্গী। কিন্তু নিজের জীবনে যে সুযোগ পাননি, সেই সুযোগ মেয়েদের দিতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
রামাবাইয়ের দুই মেয়েই পড়াশোনা করছেন। একজন পুলিশ নিয়োগের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যজন সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই পরীক্ষাগুলির জন্য বই, নোট, যাতায়াত এবং কোচিংয়ের খরচ দরকার। দরিদ্র পরিবারের কাছে এই খরচ অনেক সময় বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর ছোট মেয়ে বই কেনার টাকা না পেয়ে মায়ের সঙ্গে আট দিন কথা বলেনি। সেই অভিমানই যেন রামাবাইকে দৌড়ানোর শক্তি দিয়েছিল।

দৌড়ের সময় চটি বারবার খুলে যাচ্ছিল। তাই তিনি চটি খুলে ফেললেন, শাড়ি গুটিয়ে নিলেন এবং খালি পায়ে ছুটলেন। শেষ পর্যন্ত তিনিই জয়ী হলেন। তাঁর বড় মেয়েও নিজের বয়সের বিভাগে দ্বিতীয় হয়ে পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ের কাছে আসল বিজয়ী ছিলেন তাঁর মা।
এই ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্নও তুলে ধরে। একজন মা মেয়ের বই কেনার জন্য খালি পায়ে দৌড়ে পুরস্কারের টাকা জোগাড় করছেন— এটি কি শুধু গর্বের বিষয়, নাকি আমাদের সমাজের জন্য একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন? রামাবাইয়ের সাহস অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত কি না, সেটিও ভাবতে হবে।


ভারতে শিক্ষা সামাজিক উন্নতির অন্যতম প্রধান পথ। দরিদ্র পরিবারের কাছে পড়াশোনা মানে শুধু পরীক্ষায় পাশ করা নয়; শিক্ষা মানে ভবিষ্যতে একটি নিরাপদ জীবন, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ এবং দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে শিক্ষার গুরুত্ব আরও গভীর। একটি মেয়ে শিক্ষিত হলে তার নিজের জীবন যেমন বদলায়, তেমনই বদলাতে পারে একটি পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের জীবন।

কিন্তু দরিদ্র মেয়েদের পথ সহজ নয়। অনেক পরিবারে এখনও মেয়ের পড়াশোনার চেয়ে সংসারের কাজ, ছোট ভাইবোনের দেখাশোনা বা দ্রুত বিয়েকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। অর্থের অভাব সেই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। স্কুলে যাওয়ার যাতায়াত, বই-খাতা, পোশাক, পরীক্ষার ফি— প্রতিটি খরচই কখনও কখনও শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। উচ্চশিক্ষায় পৌঁছনোর সময় এই চাপ আরও বাড়ে। শহরের বাইরে পড়তে হলে থাকার খরচ, কোচিংয়ের ব্যয় এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জন্য বড় বাধা হয়ে ওঠে।

আর একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। দরিদ্র পরিবারের ছাত্রীদের লড়াই কেবল অর্থের বিরুদ্ধে নয়; অনেক সময় তাঁদের লড়তে হয় সামাজিক ধারণার বিরুদ্ধেও। মেয়েদের বেশি পড়াশোনা করিয়ে লাভ কী, শেষ পর্যন্ত তো বিয়ে হবে— এমন কথা এখনও শোনা যায়। এই মানসিকতা বদলানো জরুরি। একটি মেয়ের শিক্ষা তার বিয়ের বাজারে মূল্য বাড়ানোর জন্য নয়, তার নিজের চিন্তা, সিদ্ধান্ত এবং জীবনের অধিকার শক্তিশালী করার জন্য। তাই পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষক, স্থানীয় সমাজ এবং প্রশাসনেরও দায়িত্ব আছে, যাতে কোনও মেয়ে অর্থ বা সামাজিক বাধার কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য না হয়। শিক্ষিত মেয়েরা শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎ নয়, পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যৎও বদলাতে পারে। এই সত্যটি আমাদের ভুললে চলবে না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দীর্ঘ প্রস্তুতি। সরকারি চাকরি এখনও বহু পরিবারের কাছে নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতীক। ফলে পুলিশ, প্রশাসন বা অন্যান্য সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার জন্য তরুণ-তরুণীরা বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়মের অভিযোগ তরুণদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান যদি বহু কষ্টে প্রস্তুতি নেওয়ার পর একটি অনিশ্চিত পরীক্ষাব্যবস্থার মুখোমুখি হয়, তার ক্ষতি শুধু অর্থের নয়, সময় ও মানসিক শক্তিরও।

এই পরিস্থিতিতে রামাবাইয়ের গল্প বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি নিজের অসম্পূর্ণ শিক্ষার দুঃখকে মেয়েদের জন্য বাধা হতে দেননি। বরং নিজের শ্রম, ঘাম এবং সীমিত সামর্থ্য দিয়ে তাঁদের সামনে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কথায়, তিনি চান না তাঁর মেয়েরা তাঁর মতো কাদা মাড়িয়ে, রোদ-বৃষ্টি সহ্য করে জীবন কাটাক। এই কথার মধ্যে একজন মায়ের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি ভারতের অসংখ্য দরিদ্র মায়ের স্বপ্নও রয়েছে।

তবে শুধু এমন মায়েদের আত্মত্যাগের প্রশংসা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রশ্ন হল, কেন একটি দরিদ্র মেয়ের বই কেনার জন্য তার মাকে পুরস্কারের টাকার আশায় দৌড়াতে হবে? শিক্ষা যদি অধিকার হয়, তবে সেই অধিকার বাস্তবে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজেরও। সরকারি বৃত্তি, বিনামূল্যে বই, আবাসিক সুবিধা, যাতায়াতের সহায়তা এবং অন্যান্য প্রকল্পের সুফল যেন সত্যিই দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের কাছে পৌঁছয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশেষ করে গ্রাম ও ছোট শহরের মেয়েদের জন্য নিরাপদ ও সহজলভ্য শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। স্কুলছুট মেয়েদের ফিরিয়ে আনা, উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং দরিদ্র পরিবারের ছাত্রীদের জন্য আর্থিক সহায়তা আরও কার্যকর করা দরকার। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য করা জরুরি, যাতে পরিশ্রমের মূল্য থাকে।

রামাবাইয়ের তিন হাজার টাকার পুরস্কার অর্থের হিসাবে সামান্য। কিন্তু তার প্রতীকী মূল্য অনেক বড়। সেই টাকা আসলে একজন মায়ের বিশ্বাসের মূল্য— শিক্ষা তাঁর মেয়েদের জীবন বদলাতে পারে। তাঁর খালি পায়ের দৌড় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের শিক্ষা এখনও কত কঠিন লড়াই।

রামাবাইয়ের আসল জয় অবশ্য দৌড়ের ময়দানে নয়। তাঁর আসল জয় হবে সেদিন, যেদিন তাঁর মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং মাকে বলতে পারবে—তোমার সেই দৌড় বৃথা যায়নি। সেই দিনটির জন্যই শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও মানবিক, সহজলভ্য ও ন্যায়সঙ্গত করে তোলা আমাদের সবার দায়িত্ব।