• facebook
  • twitter
Tuesday, 20 January, 2026

গলওয়ান, বলিদান, ভুলে গেলাম?

মার্কিন মুলুকের লম্ফঝম্প উপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই, কিন্তু চিনের সঙ্গে আগ বাড়িয়ে ভাব দেখাতে চাওয়ার পরিণতি কি কখনও ভালো হতে পারে?

নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়

করুণ, কঠিন এমন একটা সময় আগে কখনও আসেনি। দক্ষিণ এশিয়ায় অথবা সার্বিক সামগ্রিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্র জড়িয়েই বলা চলে, ভারত আগে কখনও এতখানি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েনি। তিয়ানজিনে সাংহাই কো-অপারেশান অরগানাইজেশান সম্মেলনে চিন মার্কিন আর রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তুলে যতই বলুন, আমরা তিন বন্ধু— বাস্তবে ব্যাপারটা কি তেমনই?

Advertisement

ট্রাম্প সাহেবের মাশুল ম্যানিয়া নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। দৃশ্যত বিচলিত তাঁর ‘বন্ধু’ মোদী অনাবিষ্কৃত দিগন্তে নতুন বন্ধুবান্ধবের সন্ধান করবেন, সে তো স্বাভাবিক! ভারতের বিদেশনীতি নিয়ে যেন চিন-মার্কিন লোফালুফি খেলছে, কিছু সাংবাদিকের এমনই ধারণা। এদিকে, এইসব খেলাধূলায় চিন তার কোর্ট ছেড়ে বেরোতে চায় না কখনও। যা আছে তা চিরকালই আমার, ভাগাভাগি যা হবার তা হবে তোমারই সীমানায়, এমনই তার হাবভাব। গলওয়ানে কুড়িজন সেনার আত্মবলিদান, পাঁচ বছরের বেশি হল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন মাল্টিপোলার এশিয়া, ওদিকে চিন বলে চলে মাল্টিপোলার পৃথিবীর প্রসঙ্গ। এশিয়ায় চিনের ওস্তাদি ভারত মানতে অপারগ। কিন্তু বাণিজ্যক্ষেত্রে বার্ষিক ভারসাম্যহীনতা যখন একশো বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়, তখন ভারতের যে শিরে সংক্রান্তি! ব্যবসা আরও বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়বে। সুবিধে পাবে চিন৷ ভারতে বৈদ্যুতিক সামগ্রীর বাজার চল্লিশ শতাংশেরও বেশি চিন অধিকার করে আছে। আইটি হার্ডওয়্যার, নানান বৈদ্যুতিন বস্তু অনিবার্য অংশ তার। ওষুধপত্র, বস্ত্র ব্যবসাতেও চিনা পণ্যের গুরুত্ব অনেক!

Advertisement

কোভিডকালের সময় থেকে বন্ধ থাকা বিমান চলাচল আরম্ভ হয়েছে আবার, এইটুকুই যা ভরসা। চলাচল বাড়বে কৈলাস মানস সরোবর তীর্থযাত্রীদের। ওদিকে লাদাখের পূর্বদিকের সীমান্ত এখনও বিপজ্জনক। মুখোমুখি বেয়নেট উঁচিয়ে দু’পক্ষের সেনাবাহিনী এখন দাঁড়িয়ে নেই ঠিকই, কিন্তু ভারতের মেষপালকরা যেখানে বিচরণ করাতো তাদের প্রাণীদের, সেসব এখন নোম্যান্সল্যান্ড। চিনের বাহিনী রুট মার্চ করে নিরন্তর নিজেদের অস্তিত্বের অধিকারবোধ দেখায়। ২০২০ সাল থেকেই এই অবস্থা চলছে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে, ভারত যেন লজ্জা পায় এইসব ‘দ্বিপাক্ষিক’ সমস্যার কথা বলতে। বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু কবে? কীভাবে?

২০১৭ সালে, ডোকালাম, মানে ভারত-ভুটান সীমান্তে চিন ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল, মনে পড়ে? চিনের সৈন্য এখনও একইভাবে রয়ে গেছে সেখানে। কারও কোনও হেলদোল নেই। বাংলাদেশের এখনকার অবস্থার প্রেক্ষিতে দেখি, আমাদের এই বাংলার চিকেন্স নেক কাটা পড়ার কাল্পনিক আশঙ্কায় অনেকেই চিন্তিত; কিন্তু এত কাছাকাছি চিনের নাক গলানো যে আরও কত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, তা নিয়ে কোনও কথা নেই। চিনের চোখ সিকিমের দিকেও রয়েছে৷

অপারেশান সিঁদুর-এর সাফল্য নিয়ে ছাপ্পান্ন ইঞ্চির কত না মাতামাতি। একপেশে অস্মিতায় দেশবাসীকে ভুলিয়ে দেওয়া কি ভালো যে, ভারতের যুদ্ধবিমানগুলো ধ্বংসের পেছনে পরোক্ষ হাত চিনেরই ছিল? পাকিস্তানের অস্ত্রসম্ভারের পাঁচ ভাগের চার ভাগ চিন থেকে পাওয়া। সাম্প্রতিক এই সংঘাতে চিন তার অস্ত্রসম্ভারের প্রত্যক্ষ পরীক্ষাগার হিসেবে পাকিস্তানকে ব্যবহার করেছে, সে তো স্বীকার করেছেন সেনাবাহিনীর কর্তারা কেউ কেউ৷ অথচ, তিয়ানজিনের সম্মেলনে উগ্রপন্থী নাশকতার বিরুদ্ধে যে নিন্দাপ্রস্তাব নেওয়া হয়, তাতে পহেলগাম প্রসঙ্গ থাকে না। কিন্তু পাকিস্তানে জাফর এক্সপ্রেস নিয়ে যে নাশকতা, সম্ভাব্য বালুচ উগ্রপন্থীদের ঘটানো ছোটো বড় আরও যা যা গোলমাল সে দেশের অন্দরে, তার উল্লেখ থাকে ঠিক৷ এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রী চুপচাপ স্বাক্ষর করে আসেন তাতে। না করে উপায়ই বা কী? নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণে প্রতিবেশী দেশের হাত আছে, এই ইঙ্গিত যে ভারতের দিকেই, কে না বোঝে? কাবুল যাবার পথে নয়াদিল্লিতে থেমেছিলেন চিনের বিদেশমন্ত্রী অয়াং ই। সেখানে এসব কথা ওঠেনি।

বিদেশমন্ত্রীদের ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হল পাকিস্তানে। চিন পাকিস্তান ইকনোমিক করিডর আফগানিস্তানে কতদূর অবধি প্রসারিত হবে, তা নিয়ে আলোচনা হল। বাষট্টি বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল প্রকল্পের রাস্তা, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের ভেতর দিয়ে গিয়েছে অনেকটাই। পৌছবে বালুচিস্তানের গদর বন্দর অবধি। এই প্রকল্পে ভারত আপত্তি জানিয়ে আসছে ২০১৫ সাল থেকে। কানে তুলছে কে?

ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর বাঁধ দিতে উদ্যোগী হয়েছে চিন। ভূ–রাজনৈতিক প্রেক্ষিত বুঝি প্রাকৃতিক সংকটের পালে বাতাস দিচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান অশান্তি জড়িয়েই। আপৎকালীন পরিস্থিতিতেই শুধু জানানো হবে জলসম্পদ জড়িত তথ্য, এমন অস্পষ্ট কথাবার্তায় আবারও স্পষ্ট হতে থাকে চিনের আধিপত্য বিস্তারের বাসনা। তিস্তার ওপর কয়েকটি আধুনিক বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে চেয়েছিল চিন। হাসিনা মেনে নেননি, সম্পর্ক খারাপ করতে চাননি ভারতের সঙ্গে। গতবছর থেকে যে গণ্ডগোল চলছে, এই কারণটাও তার পেছনে রয়েছে বলে শোনা যায়।

নীরবতা কখনও কখনও দরকারি, কিন্তু দেশের ভালোমন্দ বা সার্বভৌমত্ব যখন জড়িয়ে যায়, তখন তা কাপুরুষতা। অবশ্য, গরীব দেশকে শক্তিশালী প্রতিবেশী পাত্তা দিয়েছে কবেই বা? অস্ত্রসম্ভারে চিন ভারতের থেকে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি প্রাগ্রসর। চিনের বিদেশমন্ত্রী তো দাবি করেছিলেন, জয়শঙ্কর নাকি বলেছেন, তাইওয়ান চিনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ভারত এই কথার প্রতিবাদ করেছে, কিন্তু তাতে সরকারিভাবে চিনের কোনও জবাব নেই। দলাই লামাকে নব্বইতম জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানালেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। চিন তার ক্ষোভ জানালো। ভারত নীরব।

মার্কিন মুলুকের লম্ফঝম্প উপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই, কিন্তু চিনের সঙ্গে আগ বাড়িয়ে ভাব দেখাতে চাওয়ার পরিণতি কি কখনও ভালো হতে পারে? আন্তর্জাতিক সমীকরণ কী বলে? চিন যখন বলছে, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই, তাতে নিশ্চয়ই মিথ্যে নেই কোনও। কিন্তু সবটাই চলবে তাদের মর্জিমাফিক। গরীব দেশের কি আর কিছু বলার থাকে?

বিদেশনীতির বিপর্যয়, সেসব ওঠানামা তো থাকবেই। কিন্তু এই যে দেখা যাচ্ছে হোমফ্রন্টেই যাবতীয় হইহই, বাইরে নীরব; যুযুধান প্রতিবেশীকে দেখে জুজুর ভয়ে উদাসীন হবার ভান, এসব অনেকেরই চোখে পড়ে। জয়শঙ্কর তিয়ানজিনে গেলেনই না, দূর থেকে বক্তব্য রেখে দায় সারলেন। এদিকে মোদীর নীরবতা দেখতে দেখতে তাঁরই লেখা একটি বইয়ের কথা মনে পড়ছে। দুই দশক আগে, দ্য ইনডিয়ান ওয়ে-তে জয়শঙ্কর লিখেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লড়ছে, কিন্তু জিতছে না; কিন্তু চিন জিতে যাচ্ছে লড়াই না করেই!
কী মর্মান্তিকভাবে সত্যি!

Advertisement