• facebook
  • twitter
Monday, 9 February, 2026

কর্পোরেট স্বার্থে

দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক উন্নয়নের কোনও দিশা দেখাতে পারল না এই বাজেট

কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন গত ১ মার্চ ২০২৬-২৭ আর্থিক বর্ষের বাজেট সংসদে পেশ করলেন। দেখা যাচ্ছে পুরোটাই সংখ্যাতত্ত্বের খেলা। দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক উন্নয়নের কোনও দিশা দেখাতে পারল না এই বাজেট। ধনী এবং কর্পোরেটদের তোয়াজ করলেন ছাড় আর উৎসাহ ভাতা যুগিয়ে। আর তার দায় বহন করতে হবে শ্রমজীবী মানুষ, সমাজের বঞ্চিত অংশকে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এই বাজেটে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়বে বই কমবে না।

এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর ও তীব্র করে তুলবে। বিজেপির নেতৃত্বাধীন প্রথম সরকার থেকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বৃহৎ কর্পোরেটদের দেদার ছাড় দেওয়া হচ্ছে। যুক্তি হিসাবে বলা হচ্ছে, এর ফলে কর্পোরেটরা নাকি উৎসাহিত হয়ে আরও বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। কিন্তু বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, তেমন কিছুই ঘটছে না। তথাপি তাদের কর্পোরেট ট্যাক্স ক্রমাগত হ্রাস করা হচ্ছে।

Advertisement

কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় কৃষি প্রায় উপেক্ষাই রয়ে গেছে। এবার কৃষিক্ষেত্রে বরাদ্দ ঘোষণা হয়েছে ১.৪০ লক্ষ কোটি টাকা। গতবারের তুলনায় ৫.৩ শতাংশ বেশি হলেও ২০২৫-২০২৬ সালের সংশোধিত হিসাবের তুলনায় যৎসামান্যই। আর মুদ্রাস্ফীতি ধরলে কৃষিক্ষেত্রে বরাদ্দ বস্তুত চোখে পড়বে না। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বড়মুখ করে বলেছেন, কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি সরকারের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

Advertisement

অথচ কৃষি গবেষণা ও শিক্ষা দফতরের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাজেটের পরিসংখ্যান লক্ষ্য করলে দেখা যায়, রাজস্ব আদায়ে এক বিশাল সংকোচন ঘটেছে, যা পুষিয়ে নিতে গ্রামীণ উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সমাজ কল্যাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলি-সহ সর্বত্র ব্যায়ের বরাদ্দে ব্যাপক কাটছাট করা হয়েছে। সার, খাদ্য ও পেট্রোলিয়াম ভর্তুকি আরও কমানোর প্রস্তাব দিয়ে সমাজের প্রান্তিকশ্রেণির মানুষের উপর বাড়তি আর্থিক বোঝা চাপানো হচ্ছে।

গ্রামীণ কর্মসংস্থান যে সরকার ধ্বংস করে দিতে চায় তার প্রমাণ মেলে বাজেট ঘোষণায় পূর্বতন ‘মনরেগা’ প্রকল্প কিংবা সদ্য নাম পরিবর্তন করে আনা ‘জি রামজি’ প্রকল্প এনে তার খরচের বড় অংশই রাজ্যের উপর কেন্দ্র চাপিয়ে দিয়েছে। বাজেটেও কেন্দ্র তার আর্থিক দায় ঝেড়ে ফেলল। এবার এই প্রকল্পের ৪০ শতাংশ খরচ বহন করতে হবে রাজ্যগুলিকে। দেশের কৃষিজীবী পরিবারের ৫২ শতাংশই ঋণগ্রস্ত এবং এই ঋণের বোঝা সবচেয়ে বেশি রয়েছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে।

সার এবং চাষের পরিকাঠামোয় বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বহুল বিজ্ঞাপিত প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় গত বছর বাজেট বরাদ্দ ছিল ১২২৪২.২৭ কোটি টাকা, তা এই বছর কমিয়ে দিয়ে করা হলো ১২২০০.০০ কোটি টাকা। এ ছাড়াও গত বাজেটে ডাল, সবজি, ফল, শঙ্কর বীজ, ইত্যাদি নানা প্রকল্প ঘোষণা করেছিল সরকার। সেই প্রকল্পগুলি এবছর বাজেটে একেবারেই শূন্য করে দেওয়া হয়েছে। কৃষি পরিকাঠামো এবং উন্নয়ন তহবিলে এ বছর কোনও বরাদ্দ হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ যোজনায় বরাদ্দ ২০,৩০০ কোটি টাকা থেকে সামান্য বেড়ে হয়েছে ২২,৭৪২৯ কোটি টাকা। সংখ্যাগুলি এই কারণেই উল্লেখ করা প্রয়োজন কারণ বরাদ্দ যৎসামান্য বাড়লেও যদি আর্থিক সমীক্ষায় ঘোষিত মুদ্রাস্ফীতির হার ১.৮% ধরি তাহলে আসল বরাদ্দ অনেকটাই কমে যায়। এই প্রকল্পগুলির উল্লেখ করা হলো কারণ এগুলি বারেবারে সরকারি বিজ্ঞাপনে ফলাও করে বলা হয়। কৃষিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নারকেল, বাদাম, চন্দনকাঠ এইরকম কয়েকটি উৎপাদনে। এগুলি কোনোভাবেই কৃষির মূল উৎপাদনের মধ্যে পড়ে না।

অর্থমন্ত্রীর ভাষণে শ্রমিকদের জন্য বিশেষ কিছু বরাদ্দ নেই। শ্রম এবং কর্মসংস্থান দপ্তরে গত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩২৬০৬.৯২ কোটি টাকা। কিন্তু আসলে ব্যয় হয়েছে ১২৬৫৯.৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষদের দেশের বৃদ্ধির হারের অংশীদার করা হয়নি। এবার আর্থিক বাজেটে এই দপ্তরের বরাদ্দ টাকার অঙ্কে প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে হয়েছে ৩২৬২৫.৩৩ কোটি টাকা। এইভাবেই বাজেট বরাদ্দগুলি আগের বাজেটের অঙ্কেই প্রায় থমকে রয়েছে বা কমে গেছে। বাড়েনি আশা, অঙ্গনওয়াড়ি, মিড ডে মিলের মতো প্রকল্পেও। তাহলে শ্রমিক কৃষকদের প্রতি সরকার কি কর্তব্য পালন করল?

শিল্পে যে ক্ষেত্রগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা হলো বায়োফার্মা, সেমিকন্ডাক্টর ইত্যাদি এমন কিছু ক্ষেত্র, যা ইতিমধ্যেই গুটিকয়েক কর্পোরেটের দখলে রয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলি কোনোভাবেই শিল্প কারখানার উৎপাদনের মৌলিক ক্ষেত্র নয়। দেশের উৎপাদনের মৌলিক ক্ষেত্রগুলি বাদ দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটি ক্ষেত্রকে বাছাই করে ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে।

দেশে প্রাথমিক (primary) এবং মাধ্যমিক (secondary) ক্ষেত্র ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে, জিডিপিতে এই দুই ক্ষেত্রের অবদান অতি- দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং এর বিপরীতে পরিষেবা (service) সেক্টর ফুলে ফেঁপে উঠছে ও জিডিপি’তে তার অবদান লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। অর্থনীতির স্বাস্থ্যর পক্ষে এটা মোটেই ভাল কিছু নয়।স্পষ্ট ভাষায়, এবারের বাজেটে দেশের সামনে ছয়টি বড় সংকটকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

কর্মসংস্থানহীন যুব সমাজ, উৎপাদন শিল্পের অবনমন, বিনিয়োগকারীদের পুঁজি প্রত্যাহার, গৃহস্থালি সঞ্চয়ের দ্রুত পতন, সংকটে নিমজ্জিত কৃষক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ধাক্কার আশংকা মোকাবিলার কথা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ভারত এখনও মূলত যে অসংগঠিত ক্ষেত্রের উপরে নির্ভরশীল, তার উন্নয়নের কোনও রূপরেখা বাজেটে নেই। অভ্যন্তরীণ অর্থব্যবস্থার চাহিদা বাড়বে কোন পথে, বাজেটে সেই প্রশ্নটির যথাযথ উত্তর নেই।
এই বাজেট তাই দেশের বেশিরভাগ মানুষের কোনও উন্নয়নে আসবে না।

বাজেটে অধিকাংশ ব্যয় বরাদ্দ হয় গত বছরের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে, নয়ত বরাদ্দ কমে গেছে। ১.৮% মুদ্রাস্ফীতি ধরলে বরাদ্দ কমে গেছে। তাই এই বাজেট সঙ্কীর্ণ বাজেট। তফসিলি জাতি ও উপজাতি খাতে বাজেট বরাদ্দ কমেছে। মহিলাদের জন্য বাজেট বরাদ্দ কমে গেছে। মহিলাদের জন্য বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ মোট জিডিপি’র ১.৬% থেকে ১.৩% এ নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। শিশু কল্যাণ ও মহিলা মন্ত্রকের বরাদ্দ মোট বাজেট বরাদ্দের ০.০৫% এ নেমেছে। ‘বেটি পঢ়াও, বেটি বাঁচাও’-সহ নারী আদালত, নির্ভয়া ফান্ড ইত্যাদিতে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

একইরকম ভাবে শিক্ষার বাজেটে প্রায় মন্ত্রক চালানো ছাড়া আর বিশেষ বরাদ্দ নেই। বাজেট বক্তৃতায় শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য, এই দু’টি ক্ষেত্রের প্রতি অবহেলা প্রকট। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার খাতে ভারত বিনিয়োগ করবে, পরিষেবা ক্ষেত্রে জোর দেবে ইত্যাদি। বাজেটে জোর দেওয়া উচিত ছিল শিক্ষা ও গবেষণার বিস্তৃতি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র, জেলাওয়াড়ি একটি করে সাধারণ হাসপাতাল, উপযুক্ত সংখ্যায় ডাক্তার, সাহায্যকারি কর্মী ও নার্সের উপরে। তার বদলে অর্থমন্ত্রী জোর দিলেন সুপ্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের উপর। বাজেটে তাই সংস্থান রয়েছে নতুন তিনটি অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ আয়ুর্বেদ তৈরি করার।

উৎপাদক খাতের বদলে অনুৎপাদক খাতে প্রতিবছর বাজেট বহূগুণ বেড়ে যাচ্ছে। পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ এবার ১২.২ লক্ষ কোটি টাকা। গত বছরের তুলনায় এক লক্ষ কোটি টাকার সামান্য বেশি। প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ এবার করা হয়েছে ৭.৮৪ লক্ষ কোটি টাকা যা গত বছর সংশোধীত বাজেটে ছিল ৭.৩২ লক্ষ কোটি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সামগ্রিক বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে এবার। ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের ২ লক্ষ ৩৩ হাজার ২১০ টাকা থেকে তা বেড়ে ২ লক্ষ ৫৫ হাজার ২৩৩.৫৩ টাকা হয়েছে।

ভারতের বৃহত্তম আধা সামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ)-এর বাজেটও ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের ৩৫,১৪৭.৪৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এবার হয়েছে ৩৮,৫১৭.৯৩ কোটি টাকা। ফলত দেশ যেন ধীরে ধীরে একটি ‘পুলিশ রাষ্ট্র’র মতো পরিস্থিতি বা পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।কেন্দ্রীয় বাজেটে বাংলার প্রাপ্তি এবারও শূন্য রয়ে গেল। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি এই বাজেট থেকে যা যা পেয়েছে তার ছিটেফোঁটা পায়নি বাংলা। গতবছর বিধানসভা নির্বাচন থাকায় বিহারের জন্য দরাজ হতে দেখা গিয়েছিলে কেন্দ্রের সরকারকে।

যার ফায়দা ভোটে পেয়েছে বিজেপি। এবার বাংলায় নির্বাচন। এই রাজ্য দখল করতে উঠে পড়ে লেগেছে গেরুয়া শিবির। এমন অবস্থায় এই রাজ্যের জন্য বাজেটে বলার মতো কিছুই রাখল না কেন্দ্রের সরকার। প্রশ্ন উঠছে, তা হলে কি ললাটলিখন জেনে গেছে বিজেপি? ডানকুনি থেকে সুরাট পণ্য করিডর, বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি হাই স্পিড রেল করিডর ছাড়া পঃবঙ্গের জন্য কোনও বড় বরাদ্দ হয়নি। আসলে বাংলাকে যেভাবে বঞ্চনা করে আসছে, সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়তে দিল না কেন্দ্রের সরকার।

ভারতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আর্থিক বৈষম্য। কারণ ভারতের বাজার, অর্থনীতি ও সমাজ নিয়ন্ত্রণ করে এখন সাঙাততন্ত্র। ২০২৪ সালে অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি, নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছিলেন যে ২০২৩ সালে ভারতের আয় ও সম্পদের বৈষম্য ভয়াবহ জায়গায় পৌঁছে গেছে যা ব্রিটিশ আমলে ছিল না। জনসংখ্যার ধনী এক শতাংশ জাতীয় সম্পদের ৪০.১ শতাংশের মালিক। কার্যত কর্পোরেটদের জন্য কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর এই বাজেট। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ এই বাজেট থেকে কোনরকম সুযোগ সুবিধা পাবেন না।
কেন্দ্রীয় বাজেট

Advertisement