আর্থিক বৃদ্ধি ও উন্নয়নের আলোয় আজকের ভারতে অনেক সাফল্যের নিদর্শন তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই আলোয় দাঁড়িয়েই যদি আমরা সম্পদের বণ্টনের ছবিটা দেখি, তাহলে এক গভীর বৈপরীত্য চোখে পড়ে। সাম্প্রতিক ‘বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০২৬’ (World Inequality Report 2026)-এর তথ্য বলছে, দেশের শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষের হাতে প্রায় ৪০ শতাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত। শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের প্রায় ৬৫ শতাংশ। বিপরীতে, নীচের ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মাত্র অল্প কয়েক শতাংশ সম্পদ। এই পরিসংখ্যান শুধু অর্থনৈতিক অসমতার কথা বলে না; এটি আমাদের গণতন্ত্র, সামাজিক স্থিতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে।
গণতন্ত্রের মূল কথা রাজনৈতিক সমতা, প্রত্যেক নাগরিকের ভোট সমান মূল্যবান। কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবে যদি সম্পদ ও সুযোগের এত তীব্র বৈষম্য থাকে, তবে সেই রাজনৈতিক সমতা কতটা কার্যকর থাকে? শীর্ষ ১ শতাংশ যখন প্রায় অর্ধেক সম্পদের মালিক, তখন তাদের প্রভাবও স্বাভাবিকভাবেই বিস্তৃত হয় ব্যবসা, বিনিয়োগ, গণমাধ্যম, এমনকি নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও। অর্থশক্তি রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে শুরু করলে সাধারণ নাগরিকের কণ্ঠ তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে গণতন্ত্রের কাঠামো অক্ষত থাকলেও তার প্রাণশক্তি ক্ষীণ হতে থাকে। শুধু সম্পদের বণ্টন নয়, আয়ের ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা যায়। দেশের আয়ের বড় অংশ উপরের স্তরে কেন্দ্রীভূত।
Advertisement
অন্যদিকে, নীচের অর্ধেক মানুষের হাতে যে সামান্য অংশ রয়েছে, তা দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই কঠিন। অর্থাৎ উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছচ্ছে না। এই বঞ্চনার অনুভূতি ধীরে ধীরে সামাজিক ক্ষোভে পরিণত হতে পারে।
Advertisement
এখানে নারীদের অবস্থান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভারতে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ এখনও প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ কর্মক্ষম নারীদের একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক মূলধারায় নেই। এর ফলে পরিবারের মোট আয় কমে যায়, আর্থিক স্বাধীনতা সীমিত হয় এবং সম্পদ সঞ্চয়ের সুযোগও সংকুচিত হতে থাকে। অর্ধেক জনসংখ্যার সামর্থ্য যদি পুরোপুরি কাজে না লাগে, তবে বৈষম্য স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। নারী-পুরুষের আয়ের ব্যবধানও সামগ্রিক অর্থনৈতিক ফাটলকে আরও গভীর করে।
অত্যধিক বৈষম্যের সঙ্গে সামাজিক অস্থিরতার সম্পর্ক অস্বীকার করা যায় না। যখন সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ দ্রুত সম্পদশালী হয়ে ওঠে এবং বৃহত্তর অংশ দৈনন্দিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, তখন আস্থাহীনতা জন্মায়। মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করে, ব্যবস্থা কি সবার জন্য সমান? পরিশ্রমের ফল কি ন্যায্যভাবে মিলছে? যদি এই প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক মনে হয়, তবে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা কমে যায়। সেই আস্থাহীনতা রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রতিবাদ বা আরও তীব্র অবস্থানের জন্ম দিতে পারে।
ভারতের মতো বহুমাত্রিক সমাজে এই ঝুঁকি আরও সংবেদনশীল। এখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য অনেক সময় সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গেও জড়িয়ে যায়— গ্রাম ও শহর, শিক্ষিত ও অদক্ষ, সংগঠিত ও অসংগঠিত শ্রমিক। যখন নীচের ৫০ শতাংশের হাতে মাত্র কয়েক শতাংশ সম্পদ থাকে, তখন সামাজিক গতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়। এক প্রজন্মের বঞ্চনা পরবর্তী প্রজন্মেও বয়ে যায়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অসম প্রবেশাধিকার এই চক্রকে আরও দৃঢ় করে।
তবে এই বাস্তবতা অনিবার্য নয়। নীতিগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বৈষম্য কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। প্রগতিশীল করব্যবস্থা, মানসম্মত সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সহায়তা এবং নারীদের কর্মসংস্থানে সক্রিয় উদ্যোগ— এসব পদক্ষেপ বৈষম্য হ্রাসে কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে অর্থশক্তি গণতান্ত্রিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে না পারে।
গণতন্ত্র কেবল ভোটের অধিকার নয়, এটি সমান সুযোগের প্রতিশ্রুতি। যদি শীর্ষ ১ শতাংশের হাতে ৪০ শতাংশ সম্পদ এবং শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে ৬৫ শতাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত থাকে, আর নীচের অর্ধেক মানুষ সামান্য অংশ নিয়ে বেঁচে থাকে, তবে সেই প্রতিশ্রুতি প্রশ্নের মুখে পড়ে। অর্থনৈতিক অসমতা যখন সামাজিক দূরত্ব বাড়ায়, তখন গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়।
ভারত দ্রুত উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে— এ কথা সত্য। কিন্তু সেই উন্নয়নকে দীর্ঘমেয়াদি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে বৈষম্যের ফাঁক কমানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক স্থিতি, রাজনৈতিক আস্থা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি— সবই নির্ভর করে ন্যায্য বণ্টনের উপর। বৈষম্য যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তা শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, গণতন্ত্রের জন্যও শুভ নয়।
Advertisement



