• facebook
  • twitter
Tuesday, 20 January, 2026

‘… ক্ষয় আছে কিন্তু বিনাশ নেই…’

মাষ্টার ঘরে প্রবেশ করে দেখেন শ্রীরামকৃষ্ণ একা তক্তপোষের ওপর বসে আছেন। চোখ দুটি অর্ধ নিমীলিত। ঠাকুর দুজনকে বসতে বললেন।

ফাইল চিত্র

সুরেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ী। পাশেই পতিতপাবনীর নিরলস অনন্তযাত্রা। যেন যুগের পর যুগ ধরে প্রবহমান প্রাণের অবিনাশী সঞ্চালন। হিরণ্ময়গর্ভ প্রসূত সকল নিরাকার প্রাণবিন্দু অজান্তেই এগিয়ে চলেছে সিন্ধুর পথে। সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলেছে কত শত বেনামী বোঝা। সব ছেড়ে আবার পরমশক্তির পুঞ্জীভূত শিখরে ফিরে আসবে জমাটবাঁধা শুভ্র দেহে। নির্গুণ সত্ত্বায় যুগ-যুগ অপেক্ষার অবসানে আবার প্রকৃতিমায়ের কোলে ফুটে ওঠবে কোনও কিশলয় হয়ে। যে ক্ষয়িত ধারা ফুলের পাপড়ি হয়ে আগলে রেখেছিল সৃষ্টির বীজ, সেই আবার বিকশিত হয় শত ফুলের জননী হয়ে। বসন্তকাল। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। ঢলে পড়া সূর্যের অভিমানী আলো বৃক্ষরাজি থেকে অনেকদূরে আড়াল করছে নিজেকে। গঙ্গার তেজস্বী আভা পরিণত হচ্ছে সন্ধ্যার রূপালী জ্যোৎস্নাভরা মায়াবী উপন্যাসে। ইংরেজি ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাস। ঠাকুরের আবির্ভাব উৎসব কয়েকদিন পরেই। মায়ের মন্দিরের পাশেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ঘর। ঠাকুর তক্তপোশের ওপরে বসে আছেন। মেঝেয় বসে আছেন অনেক ভক্ত। ঠাকুরের ঘরে আজ মাষ্টার উপস্থিত হয়েছেন।

Advertisement

এই প্রথম দর্শন। তিনি দেখলেন, একঘর মানুষ বিভোর হয়ে ঠাকুরের কথামৃত পান করছেন। ঠাকুর পূর্বাস্য হয়ে সহাস্য বদনে হরি কথা বলে চলেছেন। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ এই অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করতে লাগলেন তিনি। ঠাকুরের মুখনিঃসৃত বাণী সুধা পান করার পর মাষ্টার ভাবলেন, অন্ধকার নামার আগেই চার দিকের স্থানটি একবার ঘুরে দেখবেন। কিন্তু ঘরের বাইরে আসতে না আসতেই মন্দিরের আরতির বাজনা বেজে উঠলো। মন্দিরের সন্ধ্যারতি দর্শন করে আবার যেন কিসের টানে তিনি ঠাকুরের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। দেখলেন এখন লোকজন আর কেউ নেই, ভক্তরা সবাই ফিরে গেছে। ঠাকুরের ঘরের দরজা বন্ধ। বিনা অনুমতিতে ঘরের ভিতরে যেতে ইচ্ছা করলো না তাঁর। দুয়ারে বাড়ীতে কাজ করার এক মহিলাকে দেখতে পেলেন মাষ্টার। নাম বৃন্দা। মাষ্টার তাকে জিজ্ঞাসা করলেন- ‘হ্যাঁ গা, সাধুটি কি এখন এর ভিতরে আছেন? বৃন্দা বললেন – হ্যাঁ! তিনি এই ঘরের ভিতরই আছেন। মাষ্টার জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইনি এখানে কতদিন আছেন?’ বৃন্দা উত্তর দিলেন তা, অনেক দিন আছেন। মাষ্টার আবার জিজ্ঞেস করলেন— আচ্ছা, ইনি কি খুব বই টই পড়েন? বৃন্দা বললেন আর বাবা বই টই। সব ওঁর মুখে! মাষ্টার পড়াশোনা ভালোবাসেন।

Advertisement

শ্রীরামকৃষ্ণ বই পড়েন না শুনে আরও অবাক হলেন। মাস্টারের ভেতরে গিয়ে ঠাকুরের সঙ্গে আলাপ করার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। তাই তিনি বৃন্দাকে জিজ্ঞেস করলেন- আচ্ছা, উনি বুঝি এখন সন্ধ্যা করবেন? আমরা কি ঘরের ভিতর যেতে পারি? তুমি কী একবার খবর দেবে? বৃন্দা বললেন— তোমরা যাও না বাবা! গিয়ে ঘরে বোস। বন্ধুকে সাথে নিয়ে মাষ্টার ঘরে প্রবেশ করে দেখেন শ্রীরামকৃষ্ণ একা তক্তপোষের ওপর বসে আছেন। চোখ দুটি অর্ধ নিমীলিত। ঠাকুর দুজনকে বসতে বললেন। জানতে চাইলেন ‘কোথায় থাক, কি কর, বরাহনগরে কি করতে এসেছ ইত্যাদি। মাষ্টার লক্ষ্য করলেন, দু’একটি কথা বলেই ঠাকুর কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছেন। পরে শুনলেন, এরই নাম ভাব। সন্ধ্যার পর ঠাকুরের এরূপ ভাবান্তর হয়। কখনো কখনো তিনি একেবারে বাহ্যজ্ঞান শূণ্য হয়ে পড়েন। মাষ্টার বুঝতে পারলেন কথাবার্তার এটি উপযুক্ত সময় ও পরিবেশ নয়। তাই তাঁরা ফিরে যাবার জন্য বিদায় চাইলেন। ঠাকুর মাষ্টারকে বললেন, ‘আবার এসো’।

ঠাকুরের কাছ থেকে ফিরে এসে মাষ্টার নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না। কী যেন এক অজানা আহ্বান অন্তর থেকে বার বার ভেসে আসছে সুগন্ধের মত। কতো পরিচিত সেই আহ্বান, কতো চেনা সেই সুগন্ধ, যাকে বার বার আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে এসেছেন তিনি এতোদিন। তিনি যেন হঠাৎ খোঁজ পেয়েছেন কোন অজানা সমুদ্রতটের। যার বালুকাবেলায় ছড়ানো রয়েছে অজস্র দুর্মূল্য মণিরত্ন। সব ফিরে পাওয়ার আর সব হারিয়ে দেওয়ার এক অতৃপ্ত সুধা যেন অঞ্জলি ভরে পান করছেন তিনি। পরের দিন দুপুরেই মাষ্টার আবার এলেন দক্ষিণেশ্বর। ঠাকুর তখন নাপিতের কাছে চুল দাড়ি কাটাচ্ছিলেন। সেই অবস্থাতেই কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি মাষ্টার মশাইয়ের বিস্তারিত পরিচয় জানতে চাইলেন। হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন মাষ্টার মশাইকে, তিনি বিবাহিত কিনা বা সন্তানলাভ হয়েছে কিনা। একটি সন্তান আছে শুনে ঠাকুর আপশোস করতে লাগলেন। মাষ্টার লজ্জিত হলেন। তাঁর অহঙ্কার চূর্ণ হতে লাগলো। একটু পরে ঠাকুর কৃপাদৃষ্টি করে খুব স্নেহ সহকারে বললেন ‘দেখ, তোমার লক্ষণ ভালো ছিল। আমি কপাল, চোখ এসব দেখলে বুঝতে পারি’। তারপর প্রসঙ্গ সরিয়ে ঠাকুর মাষ্টারকে জিজ্ঞেস করলেন আচ্ছা, তোমার পরিবার কেমন? বিদ্যাশক্তি না অবিদ্যাশক্তি? মাষ্টার বিনয়ের সুরে বললেন ‘আজ্ঞা ভালো, কিন্তু অজ্ঞান।

শ্রীরামকৃষ্ণ একটু বিরক্ত হয়ে বললেন আর তুমি বুঝি খুব জ্ঞানী? মাষ্টার জ্ঞান-অজ্ঞান কাকে বলে ঠিক জানেন না। শুধু এইটুকু জানতেন যে লেখাপড়া শিখলে ও বই পড়তে জানলে জ্ঞান হয়। কিন্তু ঠাকুরের থেকে তিনি যখন জানলেন, ঈশ্বরকে জানার নামই জ্ঞান আর তাঁকে না জানাটাই অজ্ঞান তখন মাস্টারের অহঙ্কারের ওপর বিশেষ আঘাত পড়লো। শ্রীরামকৃষ্ণ আবার বললেন ‘তোমার সাকারে বিশ্বাস নাকি নিরাকারে? মাষ্টার মশাই মনে মনে বললেন সাকারে বিশ্বাস থাকলে কি নিরাকারে বিশ্বাস হয়? অথবা দুটো বিষয়ই কি সত্য হতে পারে? মাষ্টার অনেক ভেবে মুখে বললেন ‘আজ্ঞা নিরাকার, আমার এইটি ভালো লাগে’। শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, তা বেশ-একটাতে বিশ্বাস থাকলেই হল। নিরাকারে বিশ্বাস। তাতো ভালোই। তবে এ বুদ্ধি কোরো না যে, এইটি কেবল সত্য, আর সব মিথ্যা। এইটি জেনো যে নিরাকারও সত্য, আবার সাকারও সত্য। তোমার যেটি বিশ্বাস, সেইটিই ধরে থাকবে’।

ইন্টারন্যাশনাল বেদান্ত সোসাইটির প্রাণপুরুষ শ্রী ভগবানও বলেছেন ‘ঈশ্বর তো প্রত্যেকের অন্তরের মধ্যেই আছেন। মহাপুরুষেরা ঈশ্বরকে অনুভব করেছেন, দেখেছেন, তাঁর সাথে কথা বলেছেন। তাহলে আমরা অনুভব করতে পারছি না কেন? তার কারণ হল আমরা মায়ার জালে জড়িয়ে আছি। ব্যাকুল হয়ে তাঁকে ডাকলে তিনি ঠিক দেখা দেবেন।’ মাষ্টার মশাই শ্রীরামকৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করলেন ঈশ্বরে কী করে মন হয়? ঠাকুর বলছেন, ‘ঈশ্বরের নাম গুণগান আর সৎসঙ্গ সর্বদা করতে হয়। ঈশ্বরের ভক্ত বা সাধু এদের কাছে মাঝে মাঝে যেতে হয়। সংসারের ভিতর ও বিষয় কাজের ভিতর রাতদিন থাকলে হয় না। প্রথম অবস্থায় মাঝে মাঝে নির্জন না হলে ঈশ্বরে মন রাখা খুব কঠিন।

তেমনই শিষ্য-গুরুর সংস্পর্শে এলে গুরুশক্তির প্রভাবে তার অজ্ঞান নাশ হয়, তার অন্তর্নিহিত চৈতন্যের প্রকাশ হয়, এটাই ‘তত্ত্বমসি’। শ্রীভগবান বলেছেন, ‘যতক্ষণ না জ্ঞান লাভ হয়, ততক্ষণ সংসারে ফিরে ফিরে আসতে হবে। জ্ঞান লাভের জন্য চাই একাগ্রতা, নিষ্ঠা এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। যতক্ষণ না আত্মদর্শন হচ্ছে, ততক্ষণ বারে বারে চেষ্টা করে যেতেই হবে। গুরুর উপদেশ ঠিক ঠিক পালন করতে হয়। সচ্চিদানন্দই গুরুরুপে আসেন। গুরুতে মনুষ্য বুদ্ধি করতে নেই। গুরু বা গুরুশক্তি ব্রহ্মই।’

এই তো কয়েকদিন আগেরই কথা। লেক-গার্ডেন্সের অনিমাদি আর কৃষ্ণাদি চরম দারিদ্র্যের মাঝেও ভগবানকে যেভাবে আপ্যায়ন করলেন, তাদের সে আতিথেয়তা যেন চির নবীন। রেখার বাবা মায়ের মুখেও কি সুন্দর হাসি। দারিদ্র্যের চরম প্রকাশ। ভগবান বললেন ‘চাও আমার কাছে, কি চাও বলো?’। ভগবানের একনিষ্ঠ ভক্ত তাঁরা বলে উঠলেন, ‘ভগবান, তোমায় পেয়ে আমরা সব পেয়েছি। আমাদের তো কোনো অভাব নেই। তোমার ভালোবাসা পেয়েছি। তুমি আমাদের বাড়ী এসেছো আমরা ধন্য’। হেসে উঠলেন ভগবান, বললেন ‘এই জগৎ সংসারে সবাই সব সময় চেয়েই চলেছে। চাই, আরও চাই। আর তোমরা বলছো তোমাদের সব আছে, তোমাদের কিচ্ছু চাই না। এটাই আধ্যাত্মিকতার পরাকাষ্ঠা। তোমরা সত্যি ধন্য। ভগবান সকলের জন্য বলেছেন, প্রেমের পরশটাই আসল। প্রেম, ভালোবাসা এক নয়। একটি নিঃস্বার্থ। অপরটি সহজাত। আমরা সবাই এক একটি ফুল। সুন্দর মালা যিনি গাঁথেন, তিনিই ঈশ্বর। দেহধারী মানুষ যখন ঈশ্বরকে উপলব্ধি করেন তখন তিনি মানুষ নন। তাঁর মধ্যে অহঙ্কার বোধ থাকেনা। একমাত্র জীবের অহঙ্কার থাকে।

ব্রহ্মজ্ঞ মানুষ অহঙ্কার শূন্য হন। তখন তিনি ঈশ্বরীয় সত্ত্বায় সত্ত্বাবান হয়ে যান। তখন তিনিই ভগবান। ভগবান বলেছেন— জগৎকে একটা কথাই মনে করিয়ে দিতে এসেছি। ‘ভালোবাসো, সবাইকে ভালোবাসো’। এটাই এবারের মন্ত্র। ভগবানের এই মূল মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছেন পৃথিবীর হাজার হাজার অধ্যাত্ম পিপাসু মানুষ। ভগবানের ভালোবাসা সুন্দর। সাধারণের ভালোবাসায় নিষ্কাম প্রেম থাকে না বলে সেটি মলিন। জগতের মানব সমাজকে ভগবান দিব্য জ্যোতির ও অন্তর্নিহিত দেবত্বের সন্ধান দিয়ে গেছেন। সংসারের সব সাধারণ মানুষ যাদের সমাজে কেউ দাম দেয় না, যাঁদের কোনও সামাজিক প্রতিষ্ঠা প্রতিপত্তি বা বিলাস বৈভব নেই। তাদের হৃদয় সাম্রাজ্যে তিনিই রাজাধিরাজ, তিনিই আপামর জনসাধারণের প্রাণপুরুষ ভগবান। তিনিই মসীহা। আমরা সবাই খুব একা। নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন ছাড়া আমরা কোনো কিছু ভাবতেই পারিনা। একটি বহমান নদীর মতো আমরা বয়ে চলেছি উদ্দেশ্যহীনভাবে। ভাবিনা আমাদের সকলকে সেই মহাসংগমের মোহনার দিকেই যেতে হবে। আমরা প্রচার করি আমাদের মতো জ্ঞানী কেউ নেই। আমরাই ত্রিকালদর্শী। কিন্তু আধ্যাত্মিকতার পথ সহস্র যোজন দূরে। আস্তে আস্তে আমাদের প্রাণ বায়ু শেষ হয়ে যাচ্ছে। কণ্টকাকীর্ণ জীবনের জঞ্জাল পথে ঐ তো দেখা যাচ্ছে মহাপুরুষদের চরণ চিহ্ন! ঐ পথই তো আমাদের সকলের চলার পথ। অন্ধকার নামছে চারদিকে। অরণ্যের শুকনো পাতায় কাদের পায়ের শব্দ! ওরা মনে হয় রাতজাগা জীব। দিনের আলো তো ওদের কাছে অসহ্য। ভগবান আমাদের চলার পথ তৈরি করে দিয়েছেন।

৩ জানুয়ারি ২০২৬, ইন্টারন্যাশনাল বেদান্ত সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রাণপুরুষ শ্রীশ্রী ভগবানের ৮৫তম আবির্ভাব মহোৎসব অনুষ্ঠিত হবে শৃঙ্গেরীমঠ, মহমূরগঞ্জ, বারাণসীতে। এই পুণ্য অবসরে লণ্ডন এবং নেদারল্যাণ্ডের দুইজন ব্রহ্মচারিণী সন্ন্যাস গ্রহণ করবেন। তাদের সন্নাস প্রদান করবেন ইন্টারন্যাশনাল বেদান্ত সোসাইটির পূজ্যপাদ প্রেসিডেন্ট মহারাজ।

Advertisement