আগুনের শহর, দায় কার?

Image: IANS

পশ্চিমবঙ্গে অগ্নিকাণ্ড যেন আর বিচ্ছিন্ন কোনও দুর্ঘটনা নয়। কয়েক দিনের ব্যবধানে তারাপীঠ ও কলকাতায় হোটেলে আগুনে বহু মানুষের মৃত্যু আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমাদের শহর ও মফস্বলের বহু বাণিজ্যিক ভবনে নিরাপত্তার কতটা অভাব। তীর্থশহর তারাপীঠে আগুনে দুই শিশুসহ ন’জনের মৃত্যু এবং তার পর কলকাতার কেন্দ্রস্থলের একটি হোটেলে আরও সাতজন বাংলাদেশি-সহ ন’জনের প্রাণহানি নিছক দুর্ভাগ্য বলে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। প্রতিটি মৃত্যুর পিছনে রয়েছে একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা।
কলকাতা এমন ঘটনার সাক্ষী বহুবার হয়েছে। ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতাল থেকে পার্ক স্ট্রিটের স্টিফেন কোর্ট— বড় প্রতিষ্ঠানের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড যেমন মানুষের স্মৃতিতে দাগ কেটেছে, তেমনই অগণিত ছোট বাজার, কারখানা, গুদাম ও আবাসিক-বাণিজ্যিক ভবনেও প্রাণ কেড়েছে আগুন। প্রতিবার তদন্ত হয়েছে, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, নতুন করে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি এসেছে। কিন্তু কিছুদিন পরেই সব ফিরে গিয়েছে আগের জায়গায়।
সমস্যার মূল অনেক গভীরে। শহরের পুরনো এবং অপরিকল্পিত ভবনগুলির বড় অংশ আজকের জনসংখ্যা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী নয়। কোথাও সরু সিঁড়ি, কোথাও বেরোনোর বিকল্প পথ নেই, কোথাও আবার আগুন লাগলে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই। বহু হোটেল বা অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকলেও তা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় কি না, কর্মীরা জরুরি পরিস্থিতিতে কী করবেন তা জানেন কি না— সেই প্রশ্নও থেকে যায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়ম না মানার প্রবণতা। ভবন তৈরির সময় একরকম নকশা অনুমোদিত হলেও পরে তার ব্যবহার বদলে যায়। আবাসিক ভবন হয়ে ওঠে হোটেল, দোকান বা গুদাম। কোথাও অতিরিক্ত ঘর তৈরি হয়, কোথাও করিডর বা সিঁড়ির জায়গা দখল করে অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়। অথচ প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং নিরাপত্তার শংসাপত্র মিলেও যায়। এখানেই প্রশাসনিক নজরদারির বড় প্রশ্নটি সামনে আসে।
প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পরে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়। কোন সরকারের আমলে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, কার সময়ে নিয়ম ভাঙা হয়েছিল— তা নিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলতেই থাকে। কিন্তু আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষের পরিবারের কাছে তার কোনও মূল্য নেই। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে সদ্যই। তাই এই অগ্নিকাণ্ডের দায় আগের সরকারের উপরেই বর্তাবে, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই ব্যর্থ ব্যবস্থাকে সংশোধন করার দায়িত্ব এখন নিতে হবে বর্তমান সরকারকেই।
প্রথমেই রাজ্যের সমস্ত হোটেল, হাসপাতাল, বাজার, শপিং কমপ্লেক্স, গুদাম, কারখানা এবং জনসমাগম হয় এমন পুরনো ভবনের ঝুঁকি নির্ধারণ করা দরকার। সব ভবনকে একই মাপকাঠিতে না দেখে কোথায় বিপদের সম্ভাবনা বেশি, কোথায় মানুষের সংখ্যা বেশি এবং কোথায় বেরোনোর পথ সবচেয়ে দুর্বল— সেই ভিত্তিতে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। প্রয়োজন হলে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে অগ্নি-নিরাপত্তা সমীক্ষা করানো যেতে পারে।
নিয়ম ভাঙলে কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। শুধু ভবনের মালিক নয়, নিয়ম লঙ্ঘনে সহায়তা করা কোনও আধিকারিক বা অনুমোদনদাতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ নিয়ম তৈরি করে তা প্রয়োগ না করলে সেই নিয়মের কোনও অর্থ থাকে না। একই সঙ্গে নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। পরিদর্শনের খবর আগেভাগে জানিয়ে দিলে চলবে না, হঠাৎ পরিদর্শন এবং বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই জরুরি।
তবে সব দায়িত্ব সরকারের উপর চাপিয়ে দিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। নিরাপত্তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতাও প্রয়োজন। হোটেলে ওঠার সময় জরুরি বেরোনোর পথ কোথায়, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র আছে কি না— এই সাধারণ বিষয়গুলি দেখার অভ্যাস তৈরি হতে পারে। আবাসিক সমিতি, ক্লাব, স্কুল-কলেজ এবং স্থানীয় সংগঠনগুলিও নিজেদের এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করতে পারে।
আগুন লাগার পরে দমকল পৌঁছনোর অপেক্ষা করার চেয়ে আগুন যাতে ভয়াবহ আকার নিতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের শহর ও মফস্বলকে নিরাপদ করতে হলে তাই প্রশাসন, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিক— তিন পক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পরে শোকপ্রকাশ নয়, আগেই বিপদ ঠেকানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ আগুন কখনও দল দেখে আসে না, ভোট দেখে আসে না। তার সামনে ধনী-গরিব, শাসক-বিরোধী— কেউ আলাদা নয়। তাই সেই সম্মিলিত সতর্কতাই হয়তো পরের আগুনটিকে ভয়াবহ বিপর্যয়ে পরিণত হওয়া থেকে
আটকাতে পারে।