• facebook
  • twitter
Saturday, 16 May, 2026

চিন-মার্কিন বৈঠক

সম্প্রতি বেইজিংয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি জিনপিংয়ের বৈঠক সেই সম্পর্কেরই এক নতুন অধ্যায় খুলবে বলে অনেকে আশা করেছিলেন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের সম্পর্ক আজকের বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল সমীকরণ। সম্প্রতি বেইজিংয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি জিনপিংয়ের বৈঠক সেই সম্পর্কেরই এক নতুন অধ্যায় খুলবে বলে অনেকে আশা করেছিলেন। দু’দিনের এই সফরে দুই নেতা পরস্পরকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন, ভবিষ্যৎ সহযোগিতার কথা বলেছেন, এমনকি সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারও করেছেন। কিন্তু এই বাহ্যিক সৌহার্দ্যের আড়ালে বাস্তব চিত্রটি অনেকটাই ভিন্ন।
প্রথমেই চোখে পড়ে, এত আলোচনা ও আনুষ্ঠানিকতার পরেও কোনও যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা যায়নি। কূটনৈতিক দুনিয়ায় এটি একটি বড় সংকেত— দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক মতভেদ এখনও গভীর। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কথার চেয়ে অবস্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আর সেই অবস্থানে কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত এই বৈঠকে মেলেনি।
চিন ও আমেরিকার সম্পর্কের মূল সমস্যা হল পারস্পরিক অবিশ্বাস ও প্রতিযোগিতা। বিশ্ব নেতৃত্বের প্রশ্নে দুই দেশই নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। শি জিনপিং ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’-এর প্রসঙ্গ তুলে সংঘাত এড়ানোর কথা বললেও বাস্তবে সেই সংঘাতের উপাদানগুলি অটুট রয়েছে। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বন্ধুত্বপূর্ণ ভাষায় কথা বললেও তাঁর নীতিতে কোনও মৌলিক পরিবর্তন দেখা যায়নি।
এই বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইরান প্রসঙ্গ। বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে চিন ইরানের উপর প্রভাব খাটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সাহায্য করুক। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চিন স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা এই সংকটের জন্য আমেরিকাকেই দায়ী মনে করে এবং ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করতে আগ্রহী নয়। এর ফলে স্পষ্ট যে, আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা।
অন্যদিকে তাইওয়ান ইস্যুতেও কোনও অগ্রগতি হয়নি। চিন বহুদিন ধরেই চাইছে আমেরিকা তাইওয়ানের প্রতি সামরিক সহায়তা কমাক। কিন্তু এই সফরে সেই বিষয়ে আমেরিকার অবস্থানে কোনও নরম ভাব দেখা যায়নি। ফলে পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিও একইভাবে উত্তেজনাপূর্ণ রয়ে গেছে।
বাণিজ্য যুদ্ধের প্রসঙ্গও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গত কয়েক বছরে দুই দেশের মধ্যে শুল্ক আরোপ নিয়ে যে সংঘাত তৈরি হয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি মেটেনি। যদিও বর্তমানে তা কিছুটা স্থগিত রয়েছে, কিন্তু আলোচনায় এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। বরং দুই দেশের বিবৃতির মধ্যেই পার্থক্য চোখে পড়েছে। মার্কিন পক্ষ যে দাবি করেছে— যেমন চিনের ফেন্টানিল নিয়ন্ত্রণ বা আমেরিকার তেল কেনার প্রতিশ্রুতি— সেগুলির উল্লেখ চিনের তরফে করা হয়নি। এতে বোঝা যায়, তথ্য ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে ফারাক রয়েছে।
তবে এই বৈঠকের একটি ইতিবাচক দিকও আছে। তা হল, কোনও পক্ষই পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে চায়নি। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে, যেখানে একাধিক যুদ্ধ ও সংকট চলছে, সেখানে বিশ্বের দুই বৃহত্তম শক্তির মধ্যে সরাসরি সংঘাত অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। সেই দিক থেকে এই সংযম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এই সাময়িক সংযম কি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার বিকল্প হতে পারে? উত্তর সম্ভবত, না। কারণ সমস্যার মূল কারণগুলি যদি অমীমাংসিত থাকে, তাহলে সম্পর্কের ওপরের স্তরের সৌজন্য খুব বেশি দিন টিকবে না। প্রকৃত স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন আস্থা, স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক সমঝোতা, যার অভাব এখনও প্রকট।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বেজিংয়ের এই বৈঠক কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবিক অর্থে খুব বড় কোনও পরিবর্তন আনতে পারেনি।
সম্পর্কের টানাপোড়েন যেমন ছিল, তেমনই রয়ে গিয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই দুই দেশের উপর। তাই শুধু হাসি-আড্ডা বা আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তব সমস্যাগুলির সমাধানেই এখন গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।এই মুহূর্তে বিশ্ব এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে আমেরিকা ও চিনের সম্পর্ক যদি আরও স্থিতিশীল না হয়, তাহলে তার প্রভাব গোটা বিশ্বের উপর পড়বে। তাই এই বৈঠককে শেষ কথা হিসেবে নয়, বরং একটি দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনার সূচনা হিসেবে দেখা উচিত।

Advertisement

Advertisement