হীরক কর
যে যাই বলুন না কেন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ময়দানকে বিজেপি কিন্তু এখনও চিনে উঠতে পারছে না। এখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যেমন সংখ্যালঘু আছে, পাশাপাশি তেমনই ১৫-১৬ শতাংশ এমন ভোটার আছেন যাঁরা গোড়া থেকেই উদারবাদী বামপন্থায় বিশ্বাসী। এছাড়া বড় একটা ভোটব্যাঙ্ক যা জ্যোতি বসুর হাত ধরে তৈরি হয়েছিল; জমিদারি উচ্ছেদ এবং অপারেশন বর্গার ফসল বৃহত্তর গরিব কৃষক সম্প্রদায়। এরা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মূলত অর্থনৈতিক শ্রেণির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি বড় ভোটব্যাঙ্ক, যা ছিল বামেদের অচলায়তন তৈরির বুনিয়াদ। মূলত, জ্যোতি বসু এই ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করেছিলেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হাতে যার গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটে।
Advertisement
তার বাইরে আরও একটি বড় ভোটব্যাঙ্ক দক্ষিণবঙ্গের বিস্তৃত জঙ্গলমহলের আদিবাসী। তার সঙ্গে বাউড়ি-বাগদি সম্প্রদায়। ঝাড়খণ্ডের ভোটের মুখে হেমন্ত সোরেনকে জেলে পুরে দেওয়ার পর থেকে যাঁরা রাষ্ট্রীয় শাসকদের ওপর ক্ষুব্ধ। আরও একটা সংখ্যাগুরু ভোটব্যাঙ্ক বঙ্গে উল্লেখযোগ্য, ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় শরণার্থী হয়ে আসা নমঃশূদ্র বা মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্যের অন্তত ৪০টি বিধানসভা আসনে মতুয়া ভোট নিয়ন্ত্রক-শক্তি। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে অবশ্য ৩০টি আসনকে মতুয়া-প্রভাবিত হিসাবে ধরা হয়েছিল। কিন্তু ছাব্বিশের নির্বাচনের ময়দানে এই সংখ্যাটা বেড়ে ৩৯ হয়ে গেছে। আর যদি পরোক্ষ এফেক্ট ধরা হয়, তা হলে ৬০ থেকে ৭০টি আসনে মতুয়া ভোট অনেক পাশা পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা ধরে।
Advertisement
চব্বিশের লোকসভা ভোটে বাংলার হিন্দু ভোটের প্রায় ৭০ শতাংশ পেয়েছিল বিজেপি। এর মধ্যে মতুয়ারা এ দেশের স্থায়ী নাগরিকত্বের আশায় দু’হাত উপুড় করে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু অন্যদিকে ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ যে মুসলিম ভোট, তার সিংহভাগ পড়েছিল জোড়াফুলে। ১২০ থেকে ১২৫টি আসনে মুসলিম ভোট বঙ্গে এক্স ফ্যাক্টর। এই ১২০ থেকে ২৫ আসনে মুসলিম ভোট ২০ শতাংশ বা তারও বেশি। বাংলায় এমন ৪৬টি আসন আছে, যেখানে মুসলিম ভোটার ৫০ শতাংশের বেশি। এর বাইরে ১৬টি এমন আসন আছে যেখানে সংখ্যালঘু ভোট ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। আবার এর বাইরে ৩৩টি এমন আসন আছে যেখানে এই ভোটব্যাঙ্ক ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। মুর্শিদাবাদ জেলার ২৬ আসন, মালদার ১২ আসন, উত্তর দিনাজপুরের ৭ আসন সমেত ১০টি জেলার ১৫০টি আসনে মুসলিম ভোটের প্রভাব রয়েছে। ফলে, বিজেপিকে নবান্নের গদিতে বসতে হলে সর্বাগ্রে মমতার মুসলিম ভোট ভাঙতে হবে। সেটা হুমায়ুন কবীরের মতো নেতাকে দিয়ে কতদূর সম্ভব হবে, সেটা লাখ টাকার প্রশ্ন। কারণ হুমায়ুন মূলত দলবদলু হিসাবেই তাঁর জেলা মুর্শিদাবাদে পরিচিত। কখনও কংগ্রেস, কখনও বিজেপি, আবার কখনও তৃণমূলের টিকিটে তিনি ভোটে লড়েছেন। এছাড়া রইল আইএসএফের নওশাদ সিদ্দিকি। নির্দিষ্ট কিছু পকেট-ভিত্তিক ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে নওশাদের।
রাজনীতিকে দৃশ্যপট তৈরি, অপটিক্স পলিটিক্স, পোস্টারিং পলিটিক্স খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। একজন নেতা ভোটের ময়দানে যত ভাল দৃশ্যপট তৈরি করতে পারেন, তাঁর তত সাফল্য। বিশ্লেষকরা বলেন, এই অপটিক্স তৈরির জন্য আসল পরীক্ষা হলো টাইমিং, নিখুঁত সময়জ্ঞান। ভুল সময়ে শত ভাল পোস্টার তৈরি করতে চাইলেও, তা বিফল হতে বাধ্য। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, দৃশ্যপট তৈরির রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদী আধুনিক ভারতের মসিহা। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও যে কম যান না, অন্তত এই প্রশ্নে মোদীকে সমানে টক্কর দিতে পারেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সেই দৃষ্টান্ত তৈরি করে ফেললেন।
প্রায় সমস্ত বিরোধী দলই সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর নিয়ে মামলা করেছেন। কিন্তু মমতার মতো কোনও দলের নেতা-নেত্রী আদালতে হাজির হয়ে সওয়াল করেননি। মমতাকে এই অবতারে দেখে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব টুইট করে বলেন, লড়াই যখন অবিচারের বিরুদ্ধে তখন নতুন ভূমিকায় নামতে হয়।
শাসকের ভূমিকায় চেয়ে মমতা এখনও বিরোধী নেত্রীর ভূমিকাতেই বেশি উজ্জ্বল। তা ইডির হাত থেকে ফাইল ছিনিয়ে নেওয়া হোক, কিংবা জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে মাঝপথে বৈঠক বয়কট করে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের সামনে ক্ষোভ উগরে দেওয়া হোক। অথবা সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল; মমতা বোঝাতে চাইছেন, আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে তিনি যেমন স্ট্রিট ফাইটার ছিলেন, আজও ঠিক তাই আছেন। পনেরো বছর ধরে একটানা পশ্চিমবঙ্গের মতো বড় রাজ্য শাসনের পরেও তাঁর মধ্যে ক্ষমতার মেদ জমেনি।
ক্ষমতার মেদ জমেছে কি জমেনি, সে তর্কসাপেক্ষ প্রশ্ন। রাজনীতিক হিসাবে তাঁর কাজ একটাই, যেমন দেশ তেমন বেশ। পাঁচ বছর আগে মমতার সামনে বিজেপিরই তৈরি করে দেওয়া ইস্যু ছিল এনআরসি, সিএএ, এনপিআর। মমতার রাজনৈতিক ইউএসপি হচ্ছে, তিনি কখনও বাউন্সারে মাথা নীচু করে বলকে সমীহ করেন না, বরং স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় হুক করার ঝুঁকি নেন। তাই, এনআরসি নামক নিরীহ বাউন্সার মমতা সপাটে হুক করে গ্যালারির বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
এসআইআর নিয়ে বিজেপি কতদূর কী বাসর রচনা করেছে আমাদের জানা নেই, জানার রাস্তাও নেই। এর মাল্টিপ্লাই ইমপ্লিকেশন কী হতে চলেছে সেটাও এখনই বলা মুশকিল। কিন্তু এসআইআরের প্রথম দশ ওভারে আউট হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও মমতা যেভাবে আগ্রাসী মেজাজে ব্যাট চালিয়ে খেলছেন, রাজনীতির বাইশ গজে তা বিরল।
এরপর, নরেন্দ্র মোদী গতবারের মতো রবি ঠাকুরের অনুকরণে লম্বা দাড়ি রেখে, গলায় শাল জড়িয়ে বাংলায় প্রচারে এসে ব্যঙ্গের ছলে, সুর করে ‘দিদি, ও দিদি’ বলার ঝুঁকি নেবেন কি বলা সম্ভব নয়।
বিজেপির টার্গেট কী ? পশ্চিমবঙ্গের ভোটটাকে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বদলে দেওয়া। অথচ বাস্তব বলছে, ভোটের ময়দান দ্বিমুখী। খেলা মূলত দুই দলের মধ্যে। কংগ্রেস-সিপিএম যদি ফের জোট হয়ে লড়ে, স্বাভাবিকভাবেই তারা যে ভোটটা পাবে, সেটা মূলত বিজেপি-মুখী ভোট। মমতার ক্ষেত্রে বিজেপির মুশকিল হচ্ছে, তারা বুঝে উঠতে পারছে না, তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গে সরাসরি টক্করের রাজনীতিতে নামবে, নাকি মমতাকে ছাড় দিয়ে বাকি মাঠটা দখল করতে নামবে?
অন্য রাজ্যের ক্ষেত্রে কী হয়, বিরোধী শিবিরে খুব শক্তি প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলে, তাঁরা তাঁদের চির-পরিচিত আর্টিফিশিয়াল ইলেক্টোরাল হিন্দুত্বে ফিরে যায় এবং তাতেই বাজিমাত করে।
পশ্চিমবঙ্গের মেরুকরণের হাওয়া জোরালো হয়েছে এটা ঠিক। এই কাজে বিজেপি ইতিমধ্যে একশোতে আশি পেয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সঙ্গে কথা বললেও মেরুকরণের প্রভাব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু, হলে কী হবে, গো-বলয়ের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান পলিটিক্সের মতো সহজ কৌশল এই রাজ্যে এখনও পরীক্ষিত নয়।
আসামেও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা মুসলিম। কিন্তু সেখানে বিজেপির সুবিধা, পশ্চিমবঙ্গের মতো আসামে ১৫-১৬ শতাংশ উদারবাদী বহুত্ববাদে বিশ্বাসী ভোটার নেই। আসামের হিন্দুরা বিজেপির আদি ভোটব্যাঙ্ক। তাই আসামে মুসলিম-ভীতি, অনুপ্রবেশকারী-জুজু ইত্যাদি তৈরি করে, হিন্দুরা বিপন্ন স্লোগান তুলে ৭০ শতাংশ হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে এক ছাতার তলায় জড়ো করার কাজটা বিজেপি যত সহজে করতে পেরেছে, পশ্চিমবঙ্গে তত সহজে তা সম্ভবই নয়।
এটাও সত্যি, পশ্চিমবঙ্গে দুটি দল থাকুক, কিংবা কুড়িটি দল, নেতা একজনই— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর মূল ইস্যুটা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গকে শাসন করবে বাঙালি, নাকি গুজরাতি লবি? এই বাইনারি তৈরির কৃতিত্বও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তৃণমূলের আরও একটি ইস্যু, বিজেপি জিতলে ঝোলা থেকে নতুন মুখ্যমন্ত্রী বের করতে পারে, যেমনটা তারা করেছে ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান আর ওড়িশায়। ধরুন, আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশায় বিজেপি যাকে মুখ্যমন্ত্রী করেছে, তিনি এই প্রথম বিধায়ক হয়েছেন। অর্থাৎ, একটা বিষয় বোঝা যাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় শাসকদল সাম্প্রতিক-অতীতে তাঁদেরই মুখ্যমন্ত্রী, কিংবা দলের শীর্ষপদে বসিয়েছে, যাঁদের ক্যারিশমা কম, রাজনৈতিক ওজন কম, পরিচিতির বৃত্তটাও ছোট।
সামনে এখন অনেকগুলো প্রশ্ন, পশ্চিমবঙ্গের ভোটের অঙ্ক বুঝতে না পেরে কি বিজেপি এখন সিস্টেমকে অস্ত্র বানাচ্ছে? আর সেই সিস্টেমকে ধ্বংস করতেই কি মমতা আজ এতটা আগ্রাসী মেজাজে? মাঠে মমতার সঙ্গে টক্কর দিতে না পেরে এই লড়াইটা কি সত্যিই দল বনাম দল, নাকি বাঙালি বনাম বহিরাগত ক্ষমতার লবি?
Advertisement



