আয়ুষ্মান ভারত

Image: IANS

স্বাস্থ্য মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কিন্তু অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে চিকিৎসার বিপুল খরচ অনেক সময় একটি পরিবারকে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে গুরুতর রোগের চিকিৎসা দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। এই পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চালু হওয়া ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্প গত আট বছরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রকল্পটির আট বছর পূর্তি তাই দেশের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানিয়েছেন, বর্তমানে ৬০ কোটিরও বেশি মানুষ বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যসুরক্ষার আওতায় রয়েছেন। ২০১৮ সালে চালু হওয়া এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের সাধারণ মানুষকে উন্নত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসার সুযোগ করে দেওয়া। আট বছরে প্রকল্পটির যে বিস্তার ঘটেছে, তা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। স্বাস্থ্য পরিষেবাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ৪৮.৫৪ কোটি আয়ুষ্মান কার্ড তৈরি হয়েছে। ১৩ কোটিরও বেশি মানুষ ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের মাধ্যমে চিকিৎসার সুবিধা নিয়েছেন। দেশের ৩৯ হাজারেরও বেশি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই হাসপাতালগুলির মাধ্যমে ২ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের চিকিৎসা ও হাসপাতাল পরিষেবা গ্রহণ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে প্রকল্পটি শুধু একটি সরকারি ঘোষণা হয়ে থাকেনি, বাস্তব জীবনেও বহু মানুষের উপকারে এসেছে।
আয়ুষ্মান ভারতের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলির একটি হল চিকিৎসার খরচের কারণে পরিবারের সঞ্চয় নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো। একটি বড় অস্ত্রোপচার, ক্যান্সার, হৃদ্‌রোগ বা অন্য কোনও গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসা একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয় শেষ করে দিতে পারে। অনেক পরিবারকে ঋণও নিতে হয়। সেই জায়গায় স্বাস্থ্যসুরক্ষার ব্যবস্থা থাকলে বিপদের সময় পরিবার কিছুটা আর্থিক নিশ্চয়তা পায়। দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছেও এই নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রকল্পের আর একটি ইতিবাচক দিক হল প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর জোর দেওয়া। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দিরগুলিতে ইতিমধ্যে ৫০০ কোটিরও বেশি মানুষ পরিষেবা নিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। এর ফলে শুধু বড় শহরের হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসা নয়, গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এত বড় প্রকল্পকে আরও সফল করতে নিয়মিত নজরদারি জরুরি। হাসপাতালের পরিষেবার মান, উপভোক্তাদের সহজে চিকিৎসা পাওয়া, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে প্রকল্পের সুযোগ পৌঁছানো এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার ও স্বচ্ছতা বাড়ানো গেলে ব্যবস্থাটি আরও কার্যকর হতে পারে।
আয়ুষ্মান ভারত গত আট বছরে দেশের স্বাস্থ্যসুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। চিকিৎসা যাতে অর্থের অভাবে থেমে না যায় এবং দেশের সাধারণ মানুষ যাতে সম্মানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করা দরকার। আগামী দিনে আরও বেশি মানুষকে স্বাস্থ্যসুরক্ষার আওতায় এনে পরিষেবার মান উন্নত করা গেলে আয়ুষ্মান ভারত শুধু একটি সরকারি প্রকল্প নয়, একটি সুস্থ ও নিরাপদ ভারতের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।