মার্কিন অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী যে প্রশ্নগুলির অবতারণা করেছেন, তা নিছক দলীয় আক্রমণ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ বিষয়টি জড়িত দেশের কৃষি, কৃষক এবং খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে। আর এ ধরনের চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব।
রবিবার রাহুল গান্ধী পাঁচটি ‘সহজ প্রশ্ন’ তুলেছেন। তাঁর মূল উদ্বেগ— এই অন্তর্বর্তী চুক্তির আড়ালে ভারত কি ধীরে ধীরে কৃষিক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য বড় দরজা খুলে দিচ্ছে? যৌথ বিবৃতিতে ‘অতিরিক্ত পণ্য’, ‘শুল্ক হ্রাস বা বিলোপ’, ‘শুল্কহীন বাধা অপসারণ’ ইত্যাদি শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এই শব্দগুলির সুনির্দিষ্ট অর্থ কী? কোন কোন পণ্যের কথা বলা হচ্ছে? এগুলি কি ভবিষ্যতে ডাল, শস্য বা সংবেদনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে? দেশের কৃষকদের কাছে এই প্রশ্নগুলির উত্তর স্পষ্ট নয়।
Advertisement
বিশেষ করে সয়াবিন চাষিদের উদ্বেগ উপেক্ষা করা যায় না। মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান-সহ একাধিক রাজ্যে সয়াবিন বড় ফসল। যদি আমেরিকা থেকে জিএম সয়া তেলের আমদানি বাড়ে, তাহলে দেশীয় উৎপাদকরা কি নতুন করে মূল্যহ্রাসের মুখে পড়বেন? গত কয়েক বছরে বাজারদরের ওঠানামা, আমদানি নীতি এবং আন্তর্জাতিক দামের প্রভাবে কৃষকরা বারবার চাপে পড়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আশঙ্কা— আরও একটি মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কি তাঁদের সহ্যের বাইরে চলে যাবে?
Advertisement
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে ডিডিজি (Distillers Dried Grains) আমদানিকে ঘিরে। এটি মূলত জিএম আমেরিকান ভুট্টা থেকে তৈরি পশুখাদ্য। যদি তা বৃহৎ পরিসরে আমদানি হয়, তাহলে কি ভারতের দুগ্ধশৃঙ্খল কার্যত মার্কিন কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়বে? এ প্রশ্ন কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি খাদ্যস্বাধীনতা ও কৃষিনীতি সম্পর্কিত মৌলিক প্রশ্ন।
রাহুল গান্ধীর সমালোচনার জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বলিউডি রসিকতার ভঙ্গিতে ‘ঝুঠ পে ঝুঠ’ মন্তব্য করেছেন। রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু কৌতুক বা কটাক্ষ দিয়ে কি প্রকৃত উদ্বেগের উত্তর মেলে? দেশের মানুষ জানতে চান— চুক্তির নথিতে ‘শুল্কহীন বাধা অপসারণ’ বলতে কি ভারতকে জিএম ফসল সম্পর্কে নিজের সতর্ক অবস্থান নরম করতে হবে? ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) ও সরকারি ক্রয়নীতি কি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে দুর্বল হবে?
ভারতের কৃষি শুধুই অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নয়, এটি কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ও সামাজিক স্থিতির ভিত্তি। যে কোনও বাণিজ্যচুক্তি করতে গেলে শিল্প, পরিষেবা ও প্রযুক্তির পাশাপাশি কৃষির স্বার্থও সমানভাবে বিবেচ্য। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশ নেওয়া প্রয়োজন— ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সম্পর্কের শর্ত কী হবে, তার স্পষ্টতা থাকা জরুরি।
সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, এই চুক্তি ভারতীয় রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি করবে এবং কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও পারস্পরিক সুবিধা দেবে।
যদি তা-ই হয়, তবে বিশদ তথ্য সামনে আনতে দ্বিধা কোথায়? কোন পণ্যে কত শুল্ক কমবে, কোন পণ্য বাদ থাকবে, সংবেদনশীল খাতের সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত হবে— এসব প্রশ্নের উত্তর সংসদে ও জনসমক্ষে তুলে ধরা উচিত।
গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজ প্রশ্ন তোলা, সরকারের কাজ তার জবাব দেওয়া। প্রশ্ন তোলা মানেই দেশবিরোধিতা নয়, আবার সরকারপক্ষের প্রত্যুত্তর মানেই কৃষিবিরোধী অবস্থানও নয়। কিন্তু স্বচ্ছতা ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা ছাড়া আস্থা তৈরি হয় না।
কৃষকরা ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজার অনিশ্চয়তার চাপে আছেন। তাঁদের মনে যদি আশঙ্কা জন্মায় যে, আন্তর্জাতিক চুক্তির ফলে ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হবে, তবে সেই উদ্বেগ প্রশমিত করা সরকারের কর্তব্য।ভারত-মার্কিন বাণিজ্যসম্পর্ক আগামী দিনে আরও গভীর হতে পারে। কিন্তু সেই পথ চলায় দেশের কৃষক, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের স্বার্থ সুরক্ষিত আছে কি না— এই প্রশ্নের জবাব স্পষ্ট ভাষায় জানানো জরুরি।
রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ সাময়িক, কিন্তু নীতিনির্ধারণের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি।
সুতরাং এই বিতর্কে মূল প্রশ্নটি সরল– দেশের কৃষিনীতি ও খাদ্যসুরক্ষা কি কোনও অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে ঝুঁকির মুখে পড়ছে? যদি না পড়ে, তবে সরকার তা তথ্য-প্রমাণসহ জানাক। আর যদি কিছু শর্তাধীন পরিবর্তন থেকে থাকে, তবে তার কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাবও খোলাখুলি ব্যাখ্যা করা হোক। গণতন্ত্রে জনগণের জানার অধিকারই শেষ কথা।
Advertisement



