• facebook
  • twitter
Wednesday, 20 May, 2026

অনিশ্চয়তার শহরে শ্রমের দিনলিপি

উন্নয়নের সুফল শ্রমিকের জীবনে না পৌঁছয়, যদি তার জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, তাহলে সেই উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানের খেলাই হয়ে থাকে।

প্রতীকী চিত্র

উজ্জ্বলকুমার দত্ত

সকালটা এখনও একই রকম রয়ে গেছে। সূর্য ওঠে, আলো এসে পড়ে শহরের গলিতে, চায়ের দোকানে প্রথম কাপে ধোঁয়া ওঠে, বাসস্ট্যান্ডে ভিড় জমতে শুরু করে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, জীবন যেন নিজের ছন্দেই চলছে। কিন্তু এই দৃশ্যের অন্তরালে কোথাও একটা নিঃশব্দ ভাঙন তৈরি হয়েছে— যার শব্দ আমরা শুনতে পাই না— কিন্তু অভিঘাত প্রতিদিন অনুভব করি। সেই ভাঙনের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল শ্রমজীবী সমাজ— যারা কাজ করে, উৎপাদন করে, দেশ চালায়— অথচ নিজেদের জীবনের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

Advertisement

এই গল্প শুধু শ্রমজীবী মানুষের নয়— এটি আজকের ভারতের গণতন্ত্রের গল্প।
একসময় শ্রমিক মানেই ছিল সংগ্রামের প্রতীক। ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যায়, শিকাগোর সেই রক্তাক্ত হে মার্কেটের চত্বর— যেখানে শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে প্রাণ দিয়েছিল। সে আন্দোলন ছিল মানুষের মর্যাদার জন্য এক ঐতিহাসিক লড়াই। সেই লড়াইয়ের ঢেউ এসে পৌঁছেছিল ভারতেও। কলকাতার জুট মিল, আসানসোল-দুর্গাপুরের ইস্পাত কারখানা, মাদ্রাজের বন্দর— সব জায়গাতেই শ্রমিকেরা লড়াই করে অধিকার আদায় করেছিল।

Advertisement

কিন্তু আজ সেই ইতিহাস যেন কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া এক দূরবর্তী প্রতিধ্বনি— শোনা যায়, অথচ স্পর্শ করা যায় না। মে দিবস এখনও আসে, ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখ বদলায়, লাল পতাকা উড়ে, মাইকে স্লোগান ওঠে— কিন্তু তার ভেতরের আগুন, সেই তীব্র স্পর্ধা, অস্তিত্ব রক্ষার জেদ যেন কোথাও নিঃশব্দে নিভে গেছে। যেন একদিন যে দিন ছিল প্রতিবাদের, আজ তা পরিণত হয়েছে আনুষ্ঠানিকতার এক ক্লান্ত, যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তিতে।

এই রূপান্তর কোনও আকস্মিক ঝড়ের মতো এসে সবকিছু ভেঙে দেয়নি। বরং তা এসেছে নিঃশব্দে, ধাপে-ধাপে— যেন নদীর পাড় ভাঙে অদৃশ্য স্রোতের চাপে। রাষ্ট্রের নীতিতে সূক্ষ্ম পরিবর্তন, অর্থনীতির দিকনির্দেশে অদলবদল এবং সমাজের ভেতরে ভেতরে মানসিকতার ক্রমশ বদলে যাওয়া— এই তিনের মিলিত স্রোতেই আজকের এই বাস্তবতা গড়ে উঠেছে। মানুষ লড়াই ভুলে যায়নি, কিন্তু লড়াইয়ের ভাষা বদলে গেছে; প্রতিবাদ থেমে যায়নি, কিন্তু তার ধার ভোঁতা হয়ে এসেছে। এই নিঃশব্দ পরিবর্তনের মধ্যেই ইতিহাসের সেই জ্বলন্ত অধ্যায় আজ ক্রমশ ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।

গত এক দশকে ভারতে যে বেসরকারিকরণের ঢেউ উঠেছে, তা শুধু শিল্পের মালিকানা বদলায়নি— বদলে দিয়েছে শ্রমিকের অস্তিত্বের ভিত্তি। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর নিরাপত্তা একে-একে ভেঙে পড়েছে। তার পরিবর্তে জায়গা নিয়েছে চুক্তিভিত্তিক অনিশ্চয়তা। একসময় একটি চাকরি মানেই ছিল জীবনের ভিত মজবুত হয়ে ওঠা— মাসের শেষে নির্ভরযোগ্য আয়। পরিবারের নিরাপত্তা, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত স্বপ্ন দেখার অধিকার। সেই চাকরি মানুষকে শুধু রুটি দিত না— তারও বেশি দিত আত্মমর্যাদা ও স্থিরতার অনুভব। কিন্তু আজ সেই ছবিটা বদলে গেছে। এখন চাকরি আর কোনও নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি দেয় না, বড়জোর একটি অস্থায়ী আশ্রয় দিতে পারে। আজ আছে, কাল থাকবে কি না তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। কাজ এখন কেবল একটি চুক্তি— যার মেয়াদ অনিশ্চিত কিন্তু ভাঙন অনিবার্য।

নোটবন্দি, জিএসটি— এই সব অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের অভিঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকেরা। তারা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হয়েও রাষ্ট্রের নীতিতে প্রায় অদৃশ্য। তারপর এলো কোভিড— লকডাউনের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে আমরা দেখলাম, হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক রাস্তায় হেঁটে বাড়ি ফিরছে। সেই দৃশ্য শুধু মানবিক বিপর্যয় ছিল না— তা ছিল রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার সম্পর্কে এক নির্মম প্রশ্ন।

এই প্রেক্ষাপটে যখন ২৯টি শ্রম আইনকে ভেঙে চারটি কোডে রূপান্তর করা হলো, তখন তা কেবল প্রশাসনিক সংস্কার বলে মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে, এটি এক সুপরিকল্পিত পুনর্গঠন— যেখানে শ্রমিকের সুরক্ষা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে।

এই নতুন শ্রম কোডের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো ‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’ নীতির প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। আগে যেখানে নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি শ্রমিক ছাঁটাই করতে হলে সরকারি অনুমতি লাগত; এখন সেই সীমা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে ছোট ও মাঝারি শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। আজ কাজ আছে, কাল নেই— এই অনিশ্চয়তাই তাদের একমাত্র বাস্তবতা।

শুধু তাই নয়, শ্রমিকের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র—ধর্মঘটের অধিকার— তাকেও ক্রমশ ভোঁতা করে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ নোটিশ, আইনি জটিলতা— এই সবের জালে আটকে গিয়ে শ্রমিকের প্রতিবাদ আজ অনেকটাই স্তব্ধ। গণতন্ত্রে যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার, সেখানে শ্রমিকের কণ্ঠরোধ আসলে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক সংকটেরই ইঙ্গিত। এই সংকটকে আরও গভীর করেছে ‘গিগ ইকোনমি’র উত্থান। শহরের রাস্তায় প্রতিদিন আমরা দেখি— ডেলিভারি বয়, রাইড-শেয়ারিং ড্রাইভার, অ্যাপ-নির্ভর শ্রমিকেরা। তাদের দ্রুতগামী জীবন যেন আধুনিকতার প্রতীক। কিন্তু এই চকচকে ছবির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা। এই শ্রমিকদের কোনো স্থায়ী চুক্তি নেই, নেই সামাজিক সুরক্ষা, নেই কোনও পেনশন বা স্বাস্থ্যবিমা। তারা কাজ করে, কিন্তু কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি পায় না।

কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই— সব শহরেই এই নতুন শ্রমিক শ্রেণি দ্রুত বাড়ছে। তারা শিক্ষিত, দক্ষ কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা যুবক আজ খাবার ডেলিভারি করছে। স্নাতক যুবতী চুক্তিভিত্তিক কাজের জন্য অপেক্ষা করছে। স্থায়ী চাকরি যেন এক হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন।

যদি উন্নয়নের সুফল শ্রমিকের জীবনে না পৌঁছয়, যদি তার জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, তাহলে সেই উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানের খেলাই হয়ে থাকে।

এই প্রক্রিয়াকে তাই শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সংস্কার হিসেবে দেখা যায় না। এটি এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন—মানুষের মর্যাদা বনাম মুনাফা। যখন উৎপাদনশীলতা মানুষের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন সমাজে এক ধরনের অবক্ষয় শুরু হয়। এই অবক্ষয়ের লক্ষণ আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। শ্রমিকের অধিকার সংকুচিত হচ্ছে, ট্রেড ইউনিয়নের শক্তি কমছে এবং কর্পোরেট মুনাফা বাড়ছে। এই অসমতা দীর্ঘমেয়াদে সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া জুট মিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ শ্রমিকের চোখে যে শূন্যতা, তা কেবল ব্যক্তিগত দুঃখ নয়— তা একটি যুগের অবসানের প্রতীক। আবার শহরের রাস্তায় রাতভর ডেলিভারি করা তরুণের ক্লান্ত মুখও সেই একই গল্প বলে—একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গল্প।এই দুই প্রজন্মের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তাদের অভিজ্ঞতা এক জায়গায় এসে মিলে যায়— অসুরক্ষা।

এই অসুরক্ষার বোধ আজ মধ্যবিত্ত সমাজেও ছড়িয়ে পড়েছে। আইটি সেক্টরের লে-অফ, বেসরকারি শিক্ষাক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক চাকরি, কর্পোরেট অফিসের অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে একটি বড় অংশের মানুষ আজ ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

উন্নয়ন যদি মানুষের জন্য হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের কেন্দ্রে মানুষকে ফিরিয়ে আনতে হবে। শ্রমিককে কেবল উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে দেখলে চলবে না, একজন নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে— যার অধিকার আছে, মর্যাদা আছে। এই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সামাজিক সংহতি। শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী— সবাইকে একসঙ্গে ভাবতে হবে। কারণ এই সংকট কোনো একটি শ্রেণির নয়—এটি আমাদের সবার।

শেষ পর্যন্ত, একটি সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন তার জিডিপি দিয়ে নয়— সমাজে মানুষের মর্যাদা দিয়ে মাপা হয়। যদি সেই মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, তাহলে উন্নয়ন কেবল একটি ভ্রান্ত ধারণা হয়ে দাঁড়ায়। আজ তাই প্রয়োজন সেই আদি সত্যে ফিরে যাওয়া— যেখানে মানুষই শেষ কথা। যেখানে শ্রমিক কেবল একটি সংখ্যা নয়— একটি জীবন্ত সত্তা। যেখানে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করে এবং সমাজ মানবিকতা ধরে রাখে। পথটি সহজ নয়। কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা শিখেছি যে—সংগ্রামই পরিবর্তনের একমাত্র পথ। সেই সংগ্রামকে স্মরণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে— নতুন করে, নতুন শক্তিতে, নতুন আশায়। কারণ ঘামের মূল্যে যে গণতন্ত্র তৈরি হয়, তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সকলের।

Advertisement