বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম কর্মসূচির একটা গাল ভরা নাম রয়েছে ‘গৃহ সম্পর্ক অভিযান’। কিন্তু ঘর কেন, পাড়ামুখো হতেও দেখা যাচ্ছে না বিজেপির কোনও নেতা বা প্রার্থীকে। কিন্তু চৈত্রের চাঁদিফাটা রোদে একটা তোয়ালে কাঁধে ফেলে সবং বিধানসভার বুথে বুথে, বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এক সত্তরোর্ধ্ব যুবক। এই যুবকের সংসদীয় রাজনীতির সাড়ে চার দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো সেই শুরুর দিনগুলোর মতোই তিনি চনমনে। যাঁর স্পর্শ পেতে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন সবংয়ের মা-বোন, দিদি, দাদা, কাকারা। অঞ্চল নয়, প্রতিটি বুথ ধরে ধরে ছোট ছোট সভা করে নিজের বার্তা তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দিচ্ছেন ডা. মানসরঞ্জন ভুঁইয়া। সেই সঙ্গে গ্রামের রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটে, কখনো সাইকেলে চেপে, আবার কখনো বাইকের পিছনে চেপে পৌঁছে যাচ্ছেন গ্রামীণ সবং বিধানসভার ঘরে ঘরে। সংগঠক মানসের এই পরিশ্রম ক্ষমতা সবংয়ের মাটিতে তাঁর জয় নিশ্চিত করেছে।
গত সাড়ে চার দশকে সবং আর মানস ভুঁইয়া রাজ্য রাজনীতিতে সমার্থক হয়ে উঠেছে। সবংয়ের উন্নয়ন ছাড়া মানস ভুঁইয়াকে কোনোমতেই ভাবা যায় না। শুক্রবার সারতা অঞ্চলের সরিষা বুথে পদযাত্রা শেষ করে ছোট্ট মঞ্চে দাঁড়িয়ে মানস বলছিলেন, গত পাঁচ বছরে সবংয়ে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার রাস্তা ১৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কংক্রিট বা পিচের তৈরি হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে আরও ৪৮১টি রাস্তা তৈরি হওয়ার অনুমোদন পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধরাধরি করে সবংয়ের আরও ৪২টি রাস্তা তৈরির অনুমোদন আদায় করে নিয়েছেন মানসবাবু। মানস বলেন যে, সবং ব্লকে আর ৭২টি রাস্তা কাঁচা থাকবে। রাজ্যের ৩৪৭টি ব্লকের মধ্যে রাস্তা তৈরিতে সবংয়ের স্থান এক নম্বরে। সবংয়ের মধ্যে সারতা, বুড়াল এবং ভেমুয়া অঞ্চল রাস্তা তৈরিতে সবার আগে রয়েছে। এছাড়াও সবংয়েই প্রথম রাজ্যের মধ্যে গ্রামীণ দমকল কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। ৫২টি জল প্রকল্পর মধ্যে দিয়ে সবংয়ের ষাট শতাংশ এলাকা জল সরবরাহের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু পাইপ বসানোর কাজে কেন্দ্র সরকার অর্থ বরাদ্দ না করায় চল্লিশ শতাংশ জায়গায় এখনো জল পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
৩২ হাজার যুবক ইতিমধ্যেই যুবসাথীর ভাতা পেয়েছে। উন্নয়নের এই খতিয়ান নিয়ে তিনি বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত। মানস বলেন, ‘আমি বড় মিটিং করি না। আমরা সারা বছর কাজ করি। আমাদের ত্রুটি বিচ্যুতি থাকতে পারে। কিন্তু সংশোধন করে নেওয়ার মনও আছে। আমরা ঘুরে ঘুরে মানুষকে ডেকে পাড়ায় বৈঠক করি। আমি নিজে বিডিও অফিসে মাসে দু-বার বৈঠক করি। কোন জায়গায় আমাদের ফাঁক রয়েছে, কোন জায়গায় গলদ রয়েছে, তা জানার চেষ্টা করি। পর্যালোচনা করে আমরা কাজ করি। সবংয়ের ভোটার ২ লক্ষ ৭৫ হাজার। পায়ে হাঁটা ছাড়া সবার কাছে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তাদের সঙ্গে মেলামেশা করা যায় না। তাই আমি হেঁটে হেঁটে যাই। সকাল থেকে রাত আটটা নটা পর্যন্ত একইভাবে কর্মসূচি পালন করার চেষ্টা করি।’
সবংয়ে এবার বিজেপির প্রার্থী মানসবাবুর দলের একসময়ের সম্পদ অমল পন্ডা। বিরোধী প্রার্থীর নাম মুখে না এনে মানস বলেন, ‘অনেকে বলছে, ও নাকি ভোট মাস্টার। ওসব ভোট মাস্টার- ফাস্টার কিছু নয়। ১৯৮৩ সালে ও বাম সমর্থিত নির্দল প্রার্থী হয়ে সবংয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৮৪ সালের শেষের দিকে ওকে আমরা দলে নিয়ে আসি। তখন অমূল্য মাইতি, বিকাশ ভুঁইয়া, জয়ন্ত ভৌমিক, রাজকুমার দাসরা ছিলেন। ও সঙ্গে ছিল। আমরা যৌথ নেতৃত্বে বিশ্বাস করতাম। আজকে যখন মোদীর ছবির পাশে ওর ছবি দেখি বেমানান লাগে। ৩৬ বছর এই লোকটা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী ছিল। আজ বসন্তের হাওয়া বা গ্রীষ্মের রুক্ষতার মতো পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে।’ এই পরিবর্তন কি মানসকে বেগ দেবে, দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদের জবাব, ‘সবং-এর মানুষ যা চাইবে তাই হবে। সবংয়ের মানুষের কাছে আমি পরীক্ষিত কর্মী, সৈনিক। অনেকে বলে মানসদা একটু বেশি বকাবকি করে। কিন্তু সংসারের কর্তাকে হাল ধরতে গেলে মাঝে মাঝে বকাবকি করতে হয়। যে বকে সে ভালোওবাসে।’
এই ভালোবাসা বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর উপর আশীর্বাদ হয়ে ঝরে পড়বে উন্নয়ন আর
সংগঠনের দৌলতে, এটা সবংয়ের ভূমিপুত্র ডা. মানস ভুঁইয়ার আত্মবিশ্বাস।