ঋতুর উদ্যোগে বৈশাখী বরণ

অতনু রায়:  বাঙালি আর সংস্কৃতি প্রায় সমার্থক। আর বাঙালির আলোচনাচক্র মানেই সেখানে এসে যায় শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা। আর আরেকটা ব্যাপার না বললে ভুল হবে, চিরকালই একটা অংশের বাঙালি শিল্পী কিন্তু বৈঠক পছন্দ করেছেন। তেমনই এক বৈঠকপ্রিয় মানুষ পাঁচের দশকে হঠাৎ করেই বাঙালির পয়লা বৈশাখটা পাল্টে দিয়েছিলেন। হ্যাঁ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তাঁর উদ্যোগে বসুশ্রী সিনেমা হলে শুরু হয়েছিল বর্ষবরণের জলসা।

কে না এসেছেন সেই অনুষ্ঠানে! উত্তমকুমার থেকে সুচিত্রা সেন, লতা মঙ্গেশকর থেকে মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় থেকে কিশোর কুমার, শ্যামল মিত্র থেকে হেমন্তবাবু নিজে…সবাই এসেছেন পয়লা বৈশাখের জলসায়। বসুশ্রীর সেই বর্ষবরণের অনুষ্ঠান বাঙালির আবেগের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল অঙ্গাঙ্গীভাবে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় চলে যাওয়ার পরে অনুষ্ঠান চালাতে মন্টু বসুর মন সায় দেয়নি। তবু বারবার বিভিন্নভাবে ধাক্কা খেয়ে জৌলুস হারিয়েও রয়ে গেছে বসুশ্রীর উৎসব।

বাঙালির নববর্ষের বৈঠকে এবার নতুন সংযোজন হল আরেক ঠেকের। এই উদ্যোগ শিল্পীকেই নিতে হয়, বাকিরা হয়ত বয়ে নিয়ে যেতে পারে। একটা সময় যেমন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় উদ্যোগ নিয়েছিলেন, এবার তেমনই ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। বাঙালির বৈশাখী বিনোদনের মজা ফিকে হয়ে যাচ্ছে, এই ব্যাপারটাই হয়ত নাড়া দিয়েছিল অভিনেত্রীকে! তাই তাঁর উদ্যোগেই পয়লা সকালেই ফিরল বৈশাখী বরণ।


হেমন্তবাবু যেভাবে পাশে পেয়েছিলেন বসুশ্রীর মন্টু বসুকে, ঋতুপর্ণা সেভাবে পাশে পেলেন প্রিয়া সিনেমার কর্ণধার অরিজিৎ (দাদুল) দত্ত এবং পূর্ণিমা দত্তকে। ওঁদের সঙ্গে সমস্ত কিছু সামলে নেওয়ার জন্য যুক্ত হয়ে গেল ভাবনা আজ ও কাল এবং পিকাসো আর্ট এন্ড কালচার। শুরু হল বর্ষবরণ।

ঋতুপর্ণা বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই পয়লা বৈশাখের জলসার কথা শুনেছি, পরে দেখেছি, থেকেছি। যে দর্শকরা সারাবছর আমাদের ভালবাসায় ভরিয়ে রাখেন, তাঁদের সঙ্গে এই দিনে একটা নির্ভেজাল বৈঠকের পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু দেখলাম, আস্তে আস্তে এই কালচারটাই খুব থিতিয়ে পড়ছে। আমার মনে হল, বাঙালির নস্ট্যালজিয়ার এরকম একটা অংশকে আমরা বন্ধ করে দেব? এটা তো হতে পারে না।তাই আমার যে সীমিত সামর্থ্য, তাতেই আমি এটা করতে চেয়েছি। সম্প্রতি সারা পৃথিবী এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি খারাপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, একের পর এক বিপর্যয় আমাদের ভেতর থেকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছে। আমরা আমাদের এক সম্পদকে অকালে হারিয়েছি। এই অনিশ্চিত সময়ে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল, আরো বেঁধে বেঁধে থাকতে হবে। জীবনটাকে বাঁচার মতো করে বাঁচতে হবে। তাই এই বছরটা পজিটিভিটির মধ্যে দিয়ে শুরু করতে চাইছিলাম। আজকে যখন সাবু আন্টির পাশে ওঁর কাঁধে মাথা রেখে বসে ছিলাম, সত্যিই মনে হচ্ছিল যে এই পরিতৃপ্তি হাজার ফ্ল্যাশবাল্বের ঝলকানিতে নেই। সেজন্যই আমি চেয়েছিলাম যে এই অনুষ্ঠানে কোনও প্রবেশমূল্য রাখা হবে না, যাঁরা চাইবেন এসে দেখতে পারবেন। দাদুল, পূর্ণিমা মাসি সহযোগিতা না করলে অবশ্য আমি পারতাম না। হাজার শরীর খারাপ নিয়েও সাবু আন্টি বৈশাখের এই নির্ভেজাল এক বিনোদনে আসার ডাক ফেরাতে পারেননি, আমার আবদার রেখে এসেছেন। উনি কিংবদন্তি। ওঁর আশীর্বাদ থাকলেই হবে। আমি নিজেও মুম্বইতে ছিলাম, একবেলার জন্য ছুটে এলাম। এভাবেই কিন্তু আগে শিল্পীরা ছুটে আসতেন। আমার বিশ্বাস, আগামী দিনে আরও অনেক মানুষ এসে প্রিয়া সিনেমা ভরিয়ে তুলবেন। গানে, নাচে, কথায় মেতে উঠবে আগামী সব পয়লা বৈশাখ।’

এবারের বর্ষবরণ বৈঠকে ঋতুপর্ণার ডাকে উপস্থিত হলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় ছাড়াও চৈতি ঘোষাল, শ্যামল দত্ত, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, দেবাশিস কুমার, রেশমী মিত্র, অরিন্দম শীল, ফিরদৌসুল হাসান, অভিরূপ সেনগুপ্ত, শ্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায় সহ অনেকেই।