পাপিয়া চৌধুরী
ভারতের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট বিপ্লবী ও নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের নেতা ছিলেন চারু মজুমদার। সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম। বাবা বীরেশ্বর মজুমদার গান্ধীবাদী। নাট্যকার চন্দন সেন চারু মজুমদারের রাজনৈতিক জীবন ও পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত জীবন স্রোত তুলে ধরেছেন ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ স্বপ্ন দেখার মহড়ায়। প্রাচ্য নিউ আলিপুর নাট্যগোষ্ঠীর নবতম প্রযোজনা। পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়। হিরণ মিত্রের শৈল্পিক উপদেশে, মঞ্চাভরণ ছিল ছিমছাম। পিছনে নেট, লাল কালিতে কিছু স্লোগান লেখা, ‘নকশাল বাড়ি জিয়ালকুটে’ একশ বছর পার করা কম. চারু মজুমদারের মূর্তি, আবার একটি ধামসাও রাখা। মঞ্চটি বেশ যত্নে, সুচারুভাবে সাজিয়েছেন রঞ্জিত দেব। নাটকের সামগ্রিক পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়। শিলিগুড়ি বয়েজ হাইস্কুল থেকে উচ্চ নম্বরের সঙ্গে ফার্স্ট ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাশ করেন চারু মজুমদার। স্কুলের হেডমাস্টার (শুভাশিস চক্রবর্তী) এবং সহকারী মাস্টারমশাই অবনী স্যার (শোভন রায় চৌধুরী)-এর সংলাপে জানা যায়, পরীক্ষার আগে রেলবস্তির ছেলে কানাইকে সব বই দিয়ে দেয়। বাবা ও ছেলের কথোপকথনে উঠে আসে নানা পরশ।
কংগ্রেসী বাবা (অর্ঘ্য মুখার্জি) চারু মজুমদারকে (শতদল চক্রবর্তী) বলেন, ‘যতদিন বাঁচব, তুমি আমার বিরোধী আমিও তোমার বিরোধী। বাবা ছেলের দ্বৈরথ, স্নেহ, ভালবাসা, প্রশ্রয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মান খুব সুন্দর পরিস্ফুট হয়েছে। কমরেড চারু মজুমদারের রাজনীতির পেছনে প্রশ্রয়ের উৎস ছিল বাবা ও স্ত্রী লীলা সেনগুপ্ত/ মজুমদার (দীপান্বিতা চক্রবর্তী)। পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী ছিলেন কম. লীলা সেনগুপ্ত, পরে বিয়ে করে মজুমদার। তেইশ বছরে প্রথম জেল খাটে চারু, লীলা পঁচিশ বছরে। বিভিন্ন পারিবারিক কথার বিনিময়ে এগিয়ে পরে তাঁদের প্রেমের ও পরিণয়ের সোপান। এক অলৌকিক সাহসে বিয়ের কথা পাড়লেন লীলা, আর অপার উদারতায় মেনে নিলেন চারু মজুমদার। ১৯৫২-তে বিবাহ বন্ধন, তিন সন্তান (উপহার), অর্থকষ্ট, অসুস্থ শ্বশুর নিয়ে কুড়ি বছরের দাম্পত্য জীবন শুধুই সংসারের ঘেরাটোপে বন্দি ছিলেন লীলা।
সহধর্মিণী হতে যেন বাধা ছিল স্বামীর নতুন দল সিপিআইএমএল দলের কর্মী হতে। সহযোদ্ধা বা সহকর্মী করে ডেকে নেননি চারু মজুমদার। যতই নারীবাদ ও নারী স্বাধীনতা নিয়ে শোরগোল হোক, পরিণামের সুর একই অবস্থানে রয়েছে সর্বত্র। লীলার ট্র্যাজেডির কথা উঠে আসে শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে সংলাপে। বড় সুন্দর বাঁধনে নাটকোর ও পরিচালক হাজির করেছেন অল্প জানা কথাগুলি। অভিনয়েও সাবলীল, অনুচ্চ, পেলব মুহূর্তগুলি ধরা পড়ে। জলপাইগুড়ি জেল থেকে জেলার সাহেব (রাজদীপ ব্যানার্জি) রিটায়ার করে এখন বই লিখছেন চারু মজুমদারের উপর। তিনিই কথক, তিনিই সূত্রধর।
নকশালবাড়ি, তেভাগা আন্দোলন, কম. সুশীতল রায়চৌধুরী (আনন্দ ভট্টাচার্য), সরোজ দত্ত (রণিত দে), শান্তি দাশগুপ্ত (ঝুমুর সাহা), সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, জ্যোতি বসু, উৎপল দত্তর নাটক ‘তীর’ সবকিছুই গ্রথিত হয়েছে, তখনকার পুলিশমন্ত্রী সুব্রত মুখার্জির (প্রকাশ সিংহ রায়) সঙ্গে তর্ক ইত্যাদি নিয়ে অতীত ও বর্তমানের প্রতিবিম্ব। ইতিহাসকে নতুন করে দেখা, জানা ও চেনার এক সুন্দর সমাহার। গরিবদের নিয়ে লড়াই, রক্ত গরম করা স্লোগান— ‘আধিনাই তেভাগা চাই’, ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’, ‘জান দিব তবু ধান দিব না’, নেটের পিছনে আন্দোলনকারীরা পতাকা নিয়ে দৃশ্য বেশ লাগে।
জেলার সাহেব যখন বই লিখছেন, তখন প্রকাশকও দরকার। বইয়ের প্রকাশক সুপ্রিয় দত্ত। অভিজ্ঞ নাট্যব্যক্তিত্ব। তাঁর উপস্থিতি, হালকা কৌতুকে বর্তমান রাজনীতি, চারু, মারু, ঝাড়ু, হরিওম উচ্চারণে ও সংলাপে পরিস্থিতির দুর্বিপাক এবং দর্শকচিত্ত সহজেই হরণ করেন।
কম. চারু মজুমদারের কথায়— যে স্বপ্ন দেখে না, অন্যকেও দেখাতে পারে না, সে বিপ্লবী হতে পারে না। তাঁর গান, নাটক, কবিতার প্রতি আগ্রহ, অনুরাগ এবং রোম্যান্টিকতার ছোঁয়া এবং স্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি সহযোদ্ধার মণি ও অক্ষমতা, কষ্ট, ক্ষোভ হাজার হাজার নারীর কণ্ঠ হয়ে বেরিয়ে এসেছে। অনেক গান, অনেক নাচের সমাহার, কিছুটা কম প্রয়োগ হলে আরও নির্মেদ লাগত। সঙ্গীত পরিচালনায় অভিজিৎ আচার্য এবং নৃত্য পরিকল্পনায় সোমদত্তা ঘোষ, আলোকবিন্যাসে সোমেন চক্রবর্তী যথাযথ। কমরেডের অকালমৃত্যু না মার্ডার! ‘আমি খুঁজছি, আমি খুঁজছি, তোমার ঠিকানা’— গানটির প্রয়োগ যথার্থ।