• facebook
  • twitter
Monday, 30 March, 2026

কেওড়াতলায় সম্পন্ন হল অভিনেতার শেষকৃত্য

ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী জলে ঢুবে মৃত্যু অভিনেতার, মৃত্যু ঘিরে ধোঁয়াশা

চোখের জলে চির বিদায় জানানো হল অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বিজয়গড় থেকে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে, যেখানে পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পরিসরে, অনাড়ম্বরভাবে অভিনেতার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। স্বামীকে শেষ বিদায় জানিয়ে শ্মশান থেকে বেরিয়ে আসেন তাঁর স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা, সঙ্গে ছিলেন তাঁদের ছেলে সহজ। পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী এবং আত্মীয়-পরিজন—সকলেই অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানান তাঁদের প্রিয় ‘বাবিন’-কে।

শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন টলিউডের এক ঝাঁক তারকা। সায়নী ঘোষ, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়, শ্রীলেখা মিত্র, অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, রুকমা রায়, অঙ্কুশ হাজরা, রুদ্রনীল ঘোষ, ইন্দ্রাশিস আচার্য-সহ আরও অনেকে। তাঁদের উপস্থিতিতে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে উপচে পড়ে ভিড়।

Advertisement

এই ভিড়ের মধ্যেই আটকে পড়েছিলেন রাহুলের স্কুলজীবনের বন্ধুরা। নিরাপত্তা বলয় পেরিয়ে যখন তাঁরা ভিতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হন, তখন শেষকৃত্যের প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ। কিছুক্ষণ পরেই তাঁকে চিরবিদায় জানানো হয়। নীরবতা, শোক আর স্মৃতির ভারে বিদায় নেন এক প্রিয় মানুষ, এক প্রিয় শিল্পী।

Advertisement

সোমবার দুপুরে তমলুকে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পরই অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মরদেহ কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। তাঁর গাড়িচালক, ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের প্রোডাকশন ম্যানেজার এবং অন্যান্য সহকর্মীরা তাঁর মরদেহ কলকাতার বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী জলে ডুবেই মৃত্যু হয়েছে অভিনেতার। তাঁর ফুসফুসে অস্বাভাবিক পরিমাণে বালি ও নোনা জল পাওয়া গিয়েছে। শুধু তাই নয়, খাদ্যনালী, শ্বাসনালী এবং পাকস্থলীতেও বালির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছে। রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ফুসফুস ফুলে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল।

চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান, অল্প সময় নয়—বরং দীর্ঘক্ষণ জলের নিচে থাকার ফলেই এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। সূত্রের খবর, অভিনেতা অন্তত এক ঘণ্টা জলের তলায় ছিলেন। বিষয়টি আরও নিশ্চিত করতে ভিসেরা পরীক্ষারও ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার অংশুমান সাহা জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত অভিনেতার পরিবারের তরফে কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। তবে পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে এবং  ওড়িশা  পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

তাঁর কথায়, দিঘা থানায় ইতিমধ্যেই অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ওড়িশা পুলিশের সহযোগিতাও নেওয়া হবে।

পুলিশের হাতে একটি শুটিংয়ের ফুটেজও এসেছে, যেখানে শেষবার রাহুলকে জলের মধ্যে দেখা গিয়েছে। যদিও সেই ফুটেজে কোনও লাইফ সেভিং ব্যবস্থার উপস্থিতি চোখে পড়েনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এসপি। তবে রাহুলকে উদ্ধারের সময় তিনি জীবিত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি তিনি।

অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকাল মৃত্যুর ঘটনায় শোকস্তব্ধ টলিপাড়া। তবে শোকের পাশাপাশি উঠে আসছে একাধিক প্রশ্ন ও ধোঁয়াশা। ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্ট নয়, আর সেই অনিশ্চয়তাই বাড়িয়ে দিচ্ছে উদ্বেগ।

তালসারিতে শুটিং চলাকালীন এই দুর্ঘটনা ঘটলেও, ওড়িশা পুলিশ সূত্রে দাবি—সেখানে শুটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। তাহলে কীভাবে শুটিং চলছিল? এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে স্বাভাবিকভাবেই। প্রথমদিকে জানা গিয়েছিল, প্যাকআপের পর এই দুর্ঘটনা ঘটে। পরে পরিচালক জানান, শুটিং চলাকালীনই ঘটনাটি ঘটে। এই পরস্পরবিরোধী তথ্য ঘিরেও তৈরি হয়েছে সংশয়।

ধারাবাহিক ‘ভোলে বাবা পার করেগা’-র প্রযোজনা সংস্থার তরফে লীনা গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, চিত্রনাট্যে জলের কোনও দৃশ্যই ছিল না। তা হলে কেন এবং কীভাবে রাহুল গভীর জলের দিকে এগোলেন? উপস্থিত এত মানুষের মধ্যেও তাঁকে থামানো গেল না কেন কিংবা তিনি তলিয়ে গেলেন কীভাবে—এই প্রশ্নগুলোও ঘুরপাক খাচ্ছে টলিপাড়ায়।

ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট সামনে আসার পর সেই প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে। জানা যাচ্ছে, জলে ডুবেই মৃত্যু হয়েছে অভিনেতার এবং দীর্ঘ সময় তিনি জলের তলায় ছিলেন। তাহলে এতক্ষণ তাঁকে উদ্ধার করা গেল না কেন? সমুদ্রসৈকতে শুটিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কেন ছিল না লাইফ জ্যাকেট, লাইফ বোট বা জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার মতো ন্যূনতম নিরাপত্তা?

এই ঘটনায় সরব হয়েছেন টলিপাড়ার একাধিক শিল্পী  শ্রীলেখা মিত্র এবং সুদীপ্তা চক্রবর্তী। তাঁদের প্রশ্ন, শুটিং সেটে কেন কোনও জরুরি চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না? অনেকেরই মত, সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে হয়তো প্রাণ বাঁচানো যেত অভিনেতাকে।

এছাড়াও পরিচালক পারমিতা মুন্সী প্রশ্ন তুলেছেন, দেশের অন্য কোনও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে শুটিং করতে গিয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটে না? এই প্রশ্ন এখন শুধু টলিপাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—দর্শক থেকে শিল্পী, সকলের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে একই সংশয়।

 

 

 

 

 

Advertisement