অতনু রায়: সিনেমার কি দায় আছে সমাজকে বার্তা দেওয়ার? তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু ধুলো পড়ে যাওয়া চশমার কাচ সে বারবার ঝেড়ে পরিষ্কার করেছে যাতে দেখাটা পরিষ্কার হয়। সৌকর্য ঘোষালের ‘ওসিডি’ ঠিক সেই কাজটাই করে। সমাজের প্রায় আলোচনা না হওয়া একটা দিকে এমন আলো ফেলে এ ছবি, অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহেও অস্বস্তিগুলো টের পাওয়া যায়!
‘পেডোফিলিয়া’, সমকামিতা সহ এমন কিছু বিষয় নিয়ে কথা হল ছবি জুড়ে যেটা প্রতিবাদ করতে ভুলে যাওয়া সমাজের কাছে অস্বস্তির কিন্তু আখেরে ‘রিলিভিং’। সিনেমা ‘ওসিডি’ বোঝাল অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার মানে শুধুই শুচিবাইগ্রস্ততা নয়, বরং তার শেকড় আরও গভীরে থাকতে পারে। এই ছবি না বলা কথা, বলতে বলে।
পরিবারে বা পরিজন পরিসরে শিশুদের উপর যৌন অপরাধ নতুন নয় কিন্তু তা প্রকাশ্যে আসে না নানারকম কারণে। তবে তা যে সেই শিশুর মননকে কতটা ধ্বস্ত করে সেটা আমরা অনেকসময় টের পাই মনোবিদের চেম্বারে।এই ছবি শ্বেতার কথা বলে। শ্বেতাকে কোনো না কোনোভাবে ছুঁয়ে থাকে বাকি চরিত্ররা। শ্বেতা পরিচ্ছন্নতায় ঈশ্বর খোঁজে। শরীর আর মনের পরিচ্ছন্নতার সংজ্ঞা আলাদা হলেও তারা ঠিক কোন বিন্দুতে মিলে যায়, জীবন তাকে শিখিয়ে দিয়েছে। এই নিয়েই আবর্তিত হয় গল্প।
এই ছবি প্রায় পুরোটাই জয়ার। নিজের অভিনয়ের প্রায় সবগুলো পরত খুলেছেন তিনি। এই ছবির জয়া মায়াবী, স্নিগ্ধ, পেলব, তীক্ষ্ণ এবং একইসঙ্গে ভালনারেবল। বহুস্তরীয় এই চরিত্রের মননে তিনি সম্পূর্ণ ঢুকেছেন। ছবি জুড়ে জয়া চোখ-নাক-ঠোঁটের যে ব্যবহার করেছেন তা সমসাময়িক বাংলা ছবিতে বিরল। তিনি এই ছবি শুরু হওয়ার পরে ধীরে ধীরে শ্বেতা হয়ে ওঠেননি, শ্বেতা হয়েই পর্দায় এসেছেন। তর্কযোগ্যভাবে ‘ওসিডি’ জয়া আহসানের ফিল্মোগ্রাফির অন্যতম সেরা অভিনয়। এই ছবির জয়া আসলে বিজয়া, সর্বজয়া।
জয়ার ছোটবেলার চরিত্রে আর্শিয়া মুখোপাধ্যায়ও খুব ভাল। ছোট শ্বেতা আর্শিয়ার অভিনয় কখনও বড় শ্বেতা জয়ার অংশকে খাপছাড়া হতে দেয়নি। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে শ্রেয়া ভট্টাচার্য, ফজলুর রহমান বাবু, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, কার্তিকেয় ত্রিপাঠি বেশ ভাল। তবে আলাদা করে উল্লেখ করতেই হবে লোকাল কাউন্সিলরের চরিত্রে কৌশিক সেন এবং ঠাকুমার চরিত্রে অনসূয়া মজুমদারের কথা। কৌশিক তো ছক ভাঙা শরীরী অভিনয়ের কপিবুক হয়ে উঠেছেন।
শিক্ষিত পরিচালক দু’ধরনের হয়ে থাকেন। এক, যাঁদের সঙ্গে কথা বলে সমৃদ্ধ হওয়া যায় কিন্তু তাঁদের ছবিতে সেটা প্রতিফলিত হয় না। দুই, যাঁদের সঙ্গে কথা বলে সমৃদ্ধ হওয়া যায় আর পাশাপাশি তাঁদের ছবিতেও সেটা প্রতিফলিত হয়। সৌকর্য দ্বিতীয় দলে। সৌকর্য যে চিত্রনাট্য খুব যত্ন নিয়ে লিখেছেন তা ছবিতে পরিষ্কার। ক্যারেক্টার আর্ক নিখুঁত এবং গল্পের চলন থ্রিলিং। দৃশ্য ভাবনায় যথেষ্ট আধুনিকতার ছোঁয়া রেখেও সাবেকি। এই গল্প সাধারণত যে কেউ টানটান ‘হু-ডান-ইট’ হিসেবেই রাখতে চাইতেন।
সৌকর্য এই সুযোগ স্যাক্রিফাইস করেও টানটান রেখেছেন ছবি। তিনি গল্পটা ‘হাউ-ডান-ইট’ ও ‘হোয়াই-ডান-ইট’-এর মিশেলে ছেড়ে খেলেছেন। একটা ভাল ন্যারেটিভের যা যা গুণ থাকতে হয়, সব আছে। চরিত্রগুলোকে ঠিকঠাক স্পেস দেওয়া হয়েছে ফলে যার যা প্রাপ্য ভালবাসা-ঘৃণা সবটা অর্জন করার সুযোগ পেয়ে যান অভিনেতারা। মনের ক্যানভাসে সময়ের লাল আঁচড়ে ভীষণ রক্ত ঝরায় ‘ওসিডি’। ‘ওসিডি’ এখনও পর্যন্ত সৌকর্য ঘোষালের বানানো সেরা ছবি কিনা তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে।
এই ছবির আলোকচিত্রে আলোক মাইতি অনবদ্য। চরিত্রের অস্থিরতা আলো-আঁধারিতে খুব সুন্দর ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। আনন্দ আঢ্য চরিত্রের প্রয়োজনীয় ঘর-দুয়ার-বারান্দা-চেম্বার নিখুঁত করে তুলেছেন তাঁর জাদুতে। অর্ঘ্যকমল মিত্রের ছোঁয়ায় এই থ্রিলার এক মুহূর্তের জন্যও গতি হারায়নি। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বেশ ভাল।
এই ছবি সাইকোলজিকাল থ্রিলার। ছবি দেখে কেউ আবার ক্রাইম থ্রিলারও ভাববেন হয়ত। তবে এ ছবির ক্রাইমকে আদৌ ক্রাইম বলা যাবে কিনা সৌকর্য সেই তর্কের জায়গা রেখেছেন। তাই সেটা দর্শকের উপরেই ছাড়া থাকুক না হয়। কিন্তু এ ছবি অন্তত এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজের অভিভাবকদের এক না-পড়া অভিভাবকত্বের পাঠ পড়াবে। ওসিডি শুধু মানুষের, নাকি সমাজেরও হয়? এই প্রশ্নের উত্তর দর্শক খুঁজে পেলেই নিশ্চিত তাঁরা মনে শপথে জপবেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের:
‘তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ,
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল।
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি।
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’
— আর সংবেদনশীল মনে অস্বস্তির চাষ করে একটা মনেও কাঙ্খিত বদল আনতে পারলেই এই ছবি হবে ইতিহাস!