সৈকত মিত্র
আশা ভোঁসলে এমন একজন শিল্পী, যে তাঁর প্রয়াণ মানুষের মনে বিষাদগ্রস্ততা আনবে সেটাই স্বাভাবিক। আমি একজন খুব সাধারণ শিল্পী, আমার কোনও যোগ্যতা নেই তাঁর সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা করার। শুধু একটাই কথা মনে হয়, ভারতবর্ষে লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে– এই দুই বোনের আগেও কিছু ছিল না, পরেও কিছু হবে না। আমার সৌভাগ্য হয়েছে, তাঁর সঙ্গে সরাসরি দুটো কাজ করার। একটা হচ্ছে, ‘পুরুষোত্তম’ সিনেমায় পঞ্চমদার সুরে ‘তুমি এলে অনুপমা’ ডুয়েট গানটি গেয়েছিলাম। আর একটি হচ্ছে, ‘মিষ্টি মধুর’ সিনেমায় আমার সুরে আশাজি গেয়েছিলেন, ‘আমার পূজার ফুল রয়ে গেছে আজও’।
এছাড়াও আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। তিনি বালিগঞ্জ অ্যাসোসিয়েশনের পুজো দেখতে এসেছিলেন। সেখানেই বাবা গিয়ে আশাজি’কে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। অনেকক্ষণ ধরেই চা খাওয়া ও আড্ডা হয়। ওটাই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ। অর্থাৎ আশা জি’কে আমার প্রথম চাক্ষুস দেখা।
বাবার সঙ্গে আশাজি’র সম্পর্ক পুরো ভাই-বোনের মতো ছিল। দু’জনই দু’জনকে খুব সমাদর করতেন। আশাজি’র একটা ইচ্ছে ছিল, আমার বাবা যাতে বম্বেতে গিয়ে নিজেকে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু সেটা হয়নি।
আশাজি আমার বৌভাতেও এসেছিলেন। তখন তিনি কলকাতাতেই ছিলেন। তারপরে বাবার মৃত্যুর পরে, হেমন্ত জেঠুর সুরে তরুণ মজুমদারের ‘আগমন’ সিনেমায় আমি গান গাই। সেই গানটা মূলত আশাজি’রই গাওয়া। তাতে আমার ছোট একটা অংশ ছিল। তিনি আমার অংশটা শুনে বলছিলেন, তিনি কলকাতায় একটা শো করবেন, সেখানে সুদেশ ভোঁসলে এবং আমাকে সঙ্গে নিয়ে শো’টা করবেন। যদিও সেটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
এরপরেও কলকাতায় এলে তিনি দেখা করেছেন আমার সঙ্গে। আমিও বম্বে গিয়ে দেখা করেছি। লতাজি এবং আশাজি’র একে অপরের প্রতি একটা সাংঘাতিক শ্রদ্ধা ছিল। আমরা অনেক সময় বিদ্রুপ করি এবং মন্তব্য করি যে, দুই বোনের মধ্যে সমস্যা ছিল। কিন্তু সেটা একদমই সত্যি নয়। ৯০-৯১ সালের ঘটনা, আমাদের সঙ্গে একদিন আশাজি তাঁর বাড়িতে প্রায় ঘন্টা খানেক গল্প করলেন। হঠাৎ একটা ফোন এল। তিনি বললেন, আমাকে একটু দাঁড়াতে। দেখলাম উনি শাড়ি পাল্টে নিচে নামলেন। নেমে নিচে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। সামনে দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে, লোকজন যাচ্ছে, তবুও কোনও পরোয়া নেই তাঁর। তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, একটা গাড়ি থেকে লতা মঙ্গেস্কর নামলেন। আশাজি আমার সঙ্গে লতাজি’র আলাপ করিয়ে দিলেন। লতাজি কলকাতার খবরাখবর আমার থেকে নিলেন। আমাকে আশীর্বাদ করলেন। তারপর দু’জনেই একই গাড়িতে করে ভোট দিতে গেলেন। বম্বে কর্পোরেশনের ভোট ছিল তখন। এর থেকেই বোঝা যায়, কতটা শ্রদ্ধাশীল তাঁরা একে অপরের প্রতি।
পঞ্চমদার এক বন্ধু বাদল ভট্টাচাৰ্য তাঁর স্ত্রী মিলিদির কাছেও আশাজি’র ব্যাপারে অনেক কথা শুনেছি। বাংলা এবং বাঙালিদের তিনি প্রচন্ড ভালোবাসতেন। স্পষ্ট বাংলা উচ্চারণ করার চেষ্টা তিনি সব সময়ই করতেন। সব মিলিয়ে বাঙালি তাঁদের প্রিয় একজন কণ্ঠ শিল্পীকে হারালো।