রূপম ইসলাম, বাংলা গানের জগতে যে নাম সকলের মুখে মুখে ফেরে। বিশেষ করে বাংলা ব্যান্ড মিউজিক কালচারে আজও যিনি ‘নেমেসিস’। যাঁর ‘হাসনুহানা’র জন্য আজও মাতাল হয় বাংলার সকল সংগীত প্রেমীরা, সেই রূপম অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত চৈতি ঘোষাল পরিচালিত ‘নেভারমাইন্ড’ সিনেমাটি নিয়ে। নিজের খুশি তিনি শেয়ারও করেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। অভিনেত্রী চৈতি ঘোষালের প্রথম পরিচালিত ছবি ‘নেভারমাইন্ড’ (Open Till Midnight)। ছবির সঙ্গীতকার রূপম ইসলাম। তিনিই গীতিকার এবং গায়কও বটে। প্রযোজক ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। পরিচালক মূলত নাট্যজগতের পরিচিত মুখ চৈতী ঘোষাল। বড় বা ছোট পর্দায় তাঁকে নিয়মিত দেখা যায়। মঞ্চেও দাপিয়ে বেড়ান। তাঁর এই নাট্যঐতিহ্য এসেছে তাঁর পিতা শ্যামল ঘোষালের সূত্রে।
চৈতীর নাট্যজীবন যেমন বাণিজ্যিক পরিধির বাইরে, তেমনই আশা ছিল তাঁর প্রথম ছবিও নিশ্চয়ই এক স্বাধীন পরিচালকের স্বতন্ত্র ছাপ নিয়ে হাজির হবে। সেটাই হয়েছে। ছবির প্রধান পুরুষ চরিত্রে অমর্ত্য রায়— চৈতীর আবিষ্কার। তাঁর হিমোগ্লোবিনেও যেন অভিনয় মিশে রয়েছে। যদিও তিনি পুনের ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে পরিচালনা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন।
ছবির ভাবনা ও প্রস্তুতি যখন এমন কয়েকজন সংস্কৃতিমনস্ক ও শিল্পমনের মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত, তখন বাংলা ছবির ইংরেজি নামকরণ হলেও বিশ্বাস ছিল— ছবিতে বাংলার সংস্কৃতি ও নিখাদ বাঙালিয়ানার কোনও অপপ্রয়োগ ঘটবে না। সত্যিই ঘটেনি।
ছবির তরুণ নায়ক ‘ভায়োলেট হাউস’ নামের এক খ্রিস্টান অনাথ আশ্রমে মানুষ। নিয়মমাফিক তাঁর পুরনো নাম হারিয়ে গেছে। জুড সেবাস্টিয়ান তাঁর নতুন নাম। অথচ ইংরেজি বা হিন্দি গান নয়, সে গায় বাংলা রক। কলকাতার পরিচিত কসমোপলিটান এলাকা পার্ক স্ট্রিটের এক বার-রেস্তোরাঁয় বুক ভরে গিটার বাজিয়ে গেয়ে ওঠে— ‘এখন তুমি একা পথ বিভাজিকা…’। মদ্যপ তরুণ-তরুণীরাও জুডের গান ভীষণ পছন্দ করে।
এক বিকেলে সেখানে হাজির হয় ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ত্রিশোর্ধ্ব, প্রায় চৌত্রিশ বছরের এক নারী— তৃণা। তিনি বিলেতপ্রবাসী। তাঁর চোখ খুঁজছে ‘লোহিত’ নামে এক মানুষকে। বার-রেস্তোরাঁর কোনও কর্মীই লোহিতের খোঁজ দিতে পারে না। তবুও তিনি দামি পানীয় ‘মস্কো মিউল’ অর্ডার দিয়ে বসে থাকেন। সন্ধ্যা নামলে গিটার হাতে মঞ্চে ওঠে জুড। তাঁর বাংলা রক গানের ভাষা ও অন্তর্নিহিত অর্থ তৃণার মনে অনুরণন তোলে, স্মৃতি জাগায়, ভালো লাগা তৈরি করে। এরপর জুডের সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় থেকে পারস্পরিক ভালো-মন্দ লাগা মিলিয়ে এক বিশেষ রসায়নের জন্ম হয়।
অনাথ জুড বেঁচে থাকার জন্য এই শহরের তলদেশের অন্ধকার জগতেরও অংশীদার। সেই প্রসঙ্গ নিয়েও চিত্রনাট্যে রয়েছে মৃদু অ্যাকশনধর্মী নাটকীয়তা। অমর্ত্য, মিতালি ও সায়ন্ত— তিনজন মিলে চিত্রনাট্যে আরও দুটি উপকাহিনি জুড়েছেন। দুই দাদা-ভাই— রবি (দেবাশিস) ও ববি (ব্রাত্যজিৎ)— পৈতৃক বাড়ি বিক্রি করে ফ্ল্যাট তৈরির সমস্যায় জর্জরিত। তারাও সন্ধ্যায় একই বারে আসে। অন্যদিকে রয়েছে একটি কর্পোরেট সংস্থার তিন মাঝারি স্তরের কর্মীকে ঘিরে অফিস বস রয়দা (সুজয় প্রসাদ) এবং বার-মালিক সান্যালদা (সুশীল চক্রবর্তী)। তবে এঁরা মূলত উপকাহিনির চরিত্র।
মূল গল্প আবর্তিত হয়েছে তৃণা এবং জুডকে কেন্দ্র করে। দু’জনের পারস্পরিক আকর্ষণের কারণ কী— সেই প্রশ্ন নিয়েই ছবির বিস্তার। জুড কি তাঁর শিকড়হীনতার যন্ত্রণা কাটিয়ে উঠতে পারে? তৃণা কি খুঁজে পায় তাঁর লোহিতকে? লোহিতই বা কে? চিত্রনাট্য এই দুই চরিত্রের ব্যক্তিগত অনুসন্ধানকে দীর্ঘ সময় ধরে রহস্যের মোড়কে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। পরিচয় প্রকাশের পরেও বাণিজ্যিক ফর্মুলা এড়িয়ে ‘যে যেখানে দাঁড়িয়ে’— সেই অবস্থানকেই গ্রহণ করেছে, কোনও কৃত্রিম পরিণতি চাপিয়ে দেয়নি। এখানেই চিত্রনাট্যকার এবং পরিচালকের মুন্সিয়ানা। শেষ দৃশ্য পর্যন্ত ‘কী হয়’— এই কৌতূহল দর্শকের মনে বজায় থাকে।
ছবির সময়কাল দুপুর থেকে শুরু হয়ে গড়িয়েছে গভীর রাত পর্যন্ত। কিন্তু চৈতীর চিত্রনাট্য ও নির্মাণশৈলীর বৈচিত্র্যে দর্শকের আগ্রহ কখনও একঘেয়েমিতে পরিণত হয় না।
সবচেয়ে বড় সম্পদ— নিউ মার্কেট, পার্ক স্ট্রিট এবং চৌরঙ্গি অঞ্চলের অলিগলি জুড়ে গোপী ভগতের ক্যামেরার ভ্রমণ। পার্ক স্ট্রিট, রাস্তার উল্টোদিকের ঐতিহাসিক স্টিফেন হাউস, রেস্তোরাঁর ভেতর ও পিছনের অচেনা চেহারা— সবই সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে। চেনা পার্ক স্ট্রিটকেও যেন নতুন করে আবিষ্কার করা যায় এই ছবিতে। রাতের পার্ক স্ট্রিটে ভিখারি, ভবঘুরে ও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের উপস্থিতিও ছবির বাস্তবতাকে আরও গভীর করেছে। মাঝরাতে অমর্ত্য ও ঋতুপর্ণাকে নিয়ে সরু গলিতে নেওয়া ৩৬০ ডিগ্রি শটটি বিশেষভাবে মনে থেকে যায়।
তেমনই মনে থাকবে রূপম ইসলামের সুপরিকল্পিত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং দুটি গান— ‘নির্জনের নৌকা বেয়ে সাগর খুঁজতে যাব’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ছবির শেষ পর্বে রূপম নিজেই ক্যামেরার সামনে এসে অমর্ত্যের সঙ্গে গান গেয়েছেন— অনেকটা আলফ্রেড হিচককের চমকপ্রদ ক্যামিও উপস্থিতির মতো।
তবে ছবির সবচেয়ে বড় চমক অমর্ত্য রায়। অনাথ জুডের চরিত্রে তাঁর যন্ত্রণা, হতাশা এবং পরোয়াহীন মনোভাব যেমন শারীরিক অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে, তেমনই নীরব বেদনার মুহূর্তগুলিও তিনি অসাধারণ সংযমে জীবন্ত করে তুলেছেন।
তৃণার চরিত্রে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। তিনি বরাবরের মতোই অভিজ্ঞ শিল্পী। তাঁর চোখ ও মুখের অভিব্যক্তি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বিশেষ করে ভেঙে পড়ার দৃশ্যে তিনি অনবদ্য। এমন একটি ব্যতিক্রমী প্রয়াসে চৈতী ঘোষালের পাশে থেকে প্রযোজক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার জন্য ঋতুপর্ণাকে আলাদা ধন্যবাদ প্রাপ্য।
দুই ভাইয়ের চরিত্রে দেবাশিস ও ব্রাত্যজিৎকে একেবারেই অন্যরকম রূপে পাওয়া গেল, যা বেশ ভালো লেগেছে। অনেক দিন পর বড় পর্দায় সুশীল চক্রবর্তীকেও স্বাভাবিক ও সংযত অভিনয়ে দেখতে ভালো লাগল।
পরিচালক হিসেবে অভিনেত্রী চৈতী ঘোষালের সাফল্য দেখার পর এখন অপেক্ষা— অভিনেতা অমর্ত্য রায়ের পরিচালনায় নতুন ছবি দেখার।
নেভারমাইন্ড নিয়ে উচ্ছ্বসিত রূপম, সোশ্যাল মিডিয়ায় দিলেন প্রতিক্রিয়া
Photo Source-SNS