প্রখ্যাত নাট্যকার বাদল সরকারের কালজয়ী নাটক ‘পাগলা ঘোড়া’। ১৯৬৭ সালে রচিত এই মনস্তাত্ত্বিক নাটক আজও বাংলা থিয়েটারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। সেই নাটক অবলম্বনে পরিচালক শেখর দাশের তৈরি সিনেমা এবার পাড়ি দিল আন্তর্জাতিক মঞ্চে। প্যারিসের ‘গ্যাঞ্জ সুর সেন’ চলচ্চিত্র উৎসবে উদ্বোধনী ছবি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে ‘পাগলা ঘোড়া’। উৎসবের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব দ্য লেতোয়াল প্রেক্ষাগৃহে ছবিটির প্রদর্শনী হবে।
বাদল সরকারের জন্মশতবর্ষের বছরে এই স্বীকৃতি ছবিটির সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পরিচালক শেখর দাশ থেকে শুরু করে অভিনেত্রী গার্গী রায়চৌধুরী, সুজন মুখোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত এবং ঋত্বব্রত মুখোপাধ্যায়—সকলেই এই সম্মানে উচ্ছ্বসিত।
‘এ যেন ঘরে ফেরার মতো’
পরিচালক শেখর দাশের কথায়, ‘‘এটি নিছক আর একটি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনী নয়। বরং আমার কাছে এটি অনেকটা ঘরে ফেরার মতো অনুভূতি।’’ তাঁর বক্তব্য, বাদল সরকারের কালজয়ী নাটককে সিনেমার ভাষায় নতুন করে তুলে ধরার পর তাঁরই জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি শহর প্যারিসে ছবিটির প্রদর্শন বিশেষ আবেগের।
বাদল সরকার পেশাগত কারণে জীবনের একটি সময় প্যারিসে কাটিয়েছিলেন। সেই শহরেই তাঁর সৃষ্টিকে নিয়ে এমন আয়োজনকে তাই কাব্যিক প্রত্যাবর্তন হিসেবেই দেখছেন পরিচালক। প্যারিসে বসবাসকারী বহু ফরাসি ও বাঙালি দর্শক, বিশেষত ফরাসিভাষী সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন ছবিটি দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন গার্গী রায়চৌধুরী, সুজন মুখোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত, জয়ন্ত হোর, ঋত্বব্রত মুখোপাধ্যায়, চান্দ্রেয়ী ঘোষ, সৃজিতা সাহা ও দীর্ঘায়ু পাল। প্রযোজনা করেছেন ড. প্রবীর ভৌমিক। নির্বাহী প্রযোজক বিপাশা ঘোষাল।
মঞ্চ থেকে পর্দায় বদলে গেল ভাষা
ছবিতে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে গার্গী রায়চৌধুরী জানান, সিনেমায় কাজের আগে তিনি বাদল সরকারের মূল নাটকটি পড়েছিলেন। তাঁর মতে, ‘পাগলা ঘোড়া’ মূলত মঞ্চের জন্য লেখা হলেও পরিচালক শেখর দাশ তাঁকে চরিত্র ও গল্পকে মঞ্চের সীমার মধ্যে আটকে না রেখে সিনেমার নিজস্ব ভাষায় ভাবতে সাহায্য করেছেন।
গার্গীর কথায়, পর্দায় মঞ্চাভিনয়কে হুবহু তুলে ধরাই উদ্দেশ্য ছিল না। বরং চরিত্রের নীরবতা, সম্পর্ক, না-বলা কথা এবং অন্তর্জগতকে ক্যামেরার ভাষায় নতুন করে আবিষ্কার করাই ছিল এই ছবির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
চার পুরুষ, এক অস্বস্তিকর সত্য
‘পাগলা ঘোড়া’র গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে এক গভীর রাত। পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত জঙ্গলের মধ্যে একটি নির্জন শ্মশানঘাটে শেষকৃত্যের জন্য জড়ো হয়েছে ভিন্ন পেশা ও সামাজিক অবস্থানের চার পুরুষ। চিতায় দাহ করা হচ্ছে আত্মহত্যা করা এক তরুণীর দেহ।
শুরুতে পরিবেশটা নিছক আড্ডার মতো। চারজন তাস খেলছে, মদ্যপান করছে, কথাবার্তা বলছে। কিন্তু রাত যত গভীর হয়, জীবিত ও মৃতের মধ্যেকার সীমারেখা ততই অস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নামহীন মৃত তরুণীর আত্মা নীরবে প্রবেশ করে তাদের জগতে। তাকে কেউ দেখতে বা শুনতে পায় না। অথচ তার অদৃশ্য উপস্থিতিই চার পুরুষের চাপা পড়ে থাকা স্মৃতি, সম্পর্ক এবং অপরাধবোধকে একে একে সামনে নিয়ে আসে।
চারজন নিজেদের জীবনের নারীদের কথা বলতে শুরু করে। আলাদা চারটি গল্পের ভিতরে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে একই অস্বস্তিকর বাস্তবতা—পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, অধিকারবোধ, সামাজিক ভণ্ডামি, আবেগের শোষণ এবং নিজেদের অন্যায়ের মুখোমুখি হওয়ার অনীহা। প্রতিটি গল্পেই শেষ পর্যন্ত মূল্য দিতে হয় একজন নারীকে।
কিন্তু মৃত তরুণীর যন্ত্রণা আরও নিঃশব্দ। তার জীবনে কোনও মহান প্রেমকাহিনি নেই, নেই কোনও নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষার স্মৃতি। বরং তার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ—সে কোনও দিন সত্যিকারের প্রেম বা আবেগ অনুভব করতে পারেনি। তার আত্মহত্যা তাই শুধু যন্ত্রণা থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং এমন এক জীবনের করুণ পরিণতি, যেখানে নিজেকে সে কখনও সত্যিকারের দেখা বা অনুভব করা হয়েছে বলে মনে করেনি।
এই জায়গাতেই ‘পাগলা ঘোড়া’ শুধু মৃত্যুর গল্প হয়ে থাকে না। হয়ে ওঠে আকাঙ্ক্ষা, দমন, পুরুষতন্ত্র এবং নারীর নীরব যন্ত্রণার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান।
‘মানুষের ভিতরের পাগলা ঘোড়া’
অভিনেতা সুজন মুখোপাধ্যায়ের মতে, বাদল সরকারের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য মানুষের সম্পর্ক, দুর্বলতা এবং জীবনের জটিলতাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা। তাঁর বক্তব্য, একজন নারীকে অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করে নাট্যকার আসলে মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা প্রবৃত্তি, আকাঙ্ক্ষা, হতাশা, স্মৃতি ও দ্বন্দ্বকে সামনে এনেছেন।
কার্তিক কম্পাউন্ডারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুজন। তাঁর মতে, শেখর দাশের থিয়েটারের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা নাটকটিকে বড় পর্দায় রূপান্তরের প্রক্রিয়াটিকে আরও আকর্ষণীয় করেছে।
অন্যদিকে রজতাভ দত্তের কথায়, ‘‘পাগলা ঘোড়া বহু দূর ছুটে এসেছে। আর এবার সেই ছুটে চলা পেরিয়ে গেল আন্তর্জাতিক সীমানা।’’ তাঁর বিশ্বাস, বিশ্বের নানা প্রান্তের দর্শক, বিশেষ করে বাদল সরকারের থিয়েটারে যাঁরা অনুপ্রাণিত, তাঁরা ছবিটির সঙ্গে নিজেদের মতো করে সংযোগ খুঁজে পাবেন।
ঋত্বব্রত মুখোপাধ্যায়ের মতে, মূল নাটকের একাধিক উপস্থাপনা দেখলেও শেখর দাশ যেভাবে নাটকের মূল পাঠকে সিনেমার ভাষায় রূপ দিয়েছেন, তা আলাদা করে প্রশংসনীয়। ছবিতে তাঁর চরিত্র হিমাদ্রি—চার পুরুষের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সি। একটি ছোট শহর বা গ্রামের শিক্ষক হিমাদ্রি আদর্শবাদী, জেদি এবং নিজের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের ব্যাপারে অনমনীয়।
ছবিটির সম্পাদনা করেছেন অর্ঘ্যকমল মিত্র। সংগীত পরিচালনায় ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত। শিল্প নির্দেশনায় মানস রায়। শব্দ পরিকল্পনার দায়িত্বে অনিন্দিত রায় ও আদীপ সিং মানকি। পোশাক পরিকল্পনায় বিপাশা ঘোষাল।
প্যারিসে ‘পাগলা ঘোড়া’র এই যাত্রা তাই শুধু একটি সিনেমার আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী নয়। বাদল সরকারের নাট্যভাবনা, বাংলা থিয়েটারের ঐতিহ্য এবং ভারতীয় সিনেমার সঙ্গে প্যারিসের সাংস্কৃতিক পরিসরের এক বিশেষ সংযোগও বটে। জন্মশতবর্ষে তাঁরই এক সৃষ্টির এমন প্রত্যাবর্তন যেন বহু বছর পর নিজের শহরকে নতুন করে চিনে নেওয়ার মতো।