স্থান: রবীন্দ্র সদন, হাওড়া
প্রযোজনা: হাওড়া সৃজন ও আমরা পদাতিক
তারিখ: ২৭ সেপ্টেম্বর
নাট্যসন্ধ্যা কখনও কখনও শুধু মঞ্চে অভিনয় দেখার অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে না, বরং দর্শককে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ইতিহাস, সমাজ এবং মানুষের গভীরতম আবেগের কাছে। ২৭ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্র সদন, হাওড়ায় হাওড়া সৃজন ও আমরা পদাতিকের প্রযোজনায় এমনই এক নাট্যসন্ধ্যার সাক্ষী থাকার সুযোগ হল। মঞ্চস্থ হল দুটি নাটক—‘ফাগুনীয়া’ এবং ‘মুন্নিবাই’। বিষয় ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও দু’টি নাটকই দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যাওয়ার মতো।
‘ফাগুনীয়া’: পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া এক পরিবারের গল্প
‘ফাগুনীয়া’কে শুধুমাত্র একজন আদিবাসী নারীর গল্প হিসেবে দেখলে নাটকের গভীরতাটা ধরা পড়বে না। এর কেন্দ্রে রয়েছেন দশরথ মাঝি—‘দ্য মাউন্টেন ম্যান’ নামে যাঁকে গোটা দেশ চেনে। স্ত্রী ফাগুনিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিকে বুকে নিয়ে ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে দীর্ঘ ২২ বছর ধরে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করেছিলেন তিনি।
তবে এই গল্প বলা হয়েছে ফাগুনিয়ার জবানিতে। আর সেই চরিত্রে একাই মঞ্চ দখল করে রাখলেন পাপিয়া অধিকারী। তাঁর অভিনয় ছিল সাবলীল, সংযত অথচ প্রবল আবেগময়। চরিত্রটির যন্ত্রণা, অভিমান এবং ভালোবাসা দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে নজর কাড়ে।
নাটকের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত ছোটবেলার ‘ইকির মিকির চামচিকির’ ছড়া। শরীরী ভাষা ও নৃত্যের মাধ্যমে ছড়াটির যে ব্যাখ্যা পাপিয়া অধিকারী মঞ্চে তুলে ধরেছেন, তা নিছক অভিনয়কে ছাপিয়ে এক অন্য মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে ‘খেঁকশিয়ালের মাথা’ উচ্চারণের মুহূর্তটি তৈরি করে তীব্র নাটকীয়তা।
নাটকটি একই সঙ্গে সামনে আনে এক নির্মম বাস্তবতাও। দশরথ মাঝির জীবন নিয়ে বাণিজ্যিক ছবি হয়েছে, তাঁর পাহাড় কেটে তৈরি করা রাস্তা দেখতে মানুষ ছুটে যায়। রাজনৈতিক নেতারা আসেন, প্রতিশ্রুতি দেন, আবার চলে যান। কিন্তু তাঁর পরিবারের বাস্তব জীবনে কতটা পরিবর্তন এসেছে? নাটকটি সেই প্রশ্নই ছুড়ে দেয়। দশরথ মাঝির নামকে ব্যবহার করা হলেও তাঁর পরিবারের প্রাপ্য উন্নয়ন কতটা হয়েছে, সেই বঞ্চনার কথাই ‘ফাগুনীয়া’ দর্শকের সামনে তুলে ধরে।
এই নাটকের মাধ্যমে পাপিয়া অধিকারীকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করা যায়। তাঁর অভিনয় নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
‘মুন্নিবাই’: দেহব্যবসার আড়ালে দেশপ্রেমের লড়াই
দ্বিতীয় নাটক ‘মুন্নিবাই’। স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই নাটকের কেন্দ্রে এমন এক নারী, যাঁকে সমাজ বাইরে থেকে বারবনিতা হিসেবে দেখলেও তাঁর অন্তরে ছিল গভীর দেশপ্রেম। দেহব্যবসার আড়ালকে ব্যবহার করে তিনি বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজে যুক্ত ছিলেন।
এই দ্বৈত জীবন, সমাজের চোখে এক পরিচয় এবং নিজের কাছে সম্পূর্ণ অন্য এক পরিচয়—এই টানাপড়েনই নাটকের মূল শক্তি।
মুন্নিবাই চরিত্রে তারামণি ঘোষের অভিনয় বিশেষভাবে নজর কাড়ে। চরিত্রটির আবেগ, দ্বন্দ্ব এবং দেশপ্রেমকে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মঞ্চে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর অভিনয় নাটকটির আবেগকে আরও গভীর করেছে।
আমরা পদাতিকের তিন শিল্পীর পাশাপাশি পাপিয়া অধিকারীকেও এই নাটকে দেখা যায়। ছোট ছোট চরিত্রে সুদীপ ঘোষালও অভিনয় করেছেন। তাঁর মঞ্চপরিসর তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও অভিনয়ের প্রভাব ছিল যথেষ্ট বড়। নাটকটির রচনা ও নির্দেশনার দায়িত্বও তাঁর।
সব মিলিয়ে ‘ফাগুনীয়া’ এবং ‘মুন্নিবাই’—দুটি নাটকই আলাদা বিষয় ও আঙ্গিকে দর্শককে ভাবায়। একটিতে রয়েছে ভালোবাসা, বঞ্চনা ও বিস্মৃতির ইতিহাস; অন্যটিতে দেশপ্রেম, আত্মপরিচয় ও নারীর দ্বন্দ্ব। অভিনয়ের শক্তি এবং বিষয়ের গভীরতা—দুই ক্ষেত্রেই নাটক দুটি দর্শকের মনে থেকে যাওয়ার মতো।
হাওড়া সৃজনকে এমন দুটি নাট্যপ্রযোজনার জন্য আন্তরিক শুভেচ্ছা। ভবিষ্যতে এই নাটকগুলি ফের মঞ্চস্থ হলে অবশ্যই দর্শকদের তা দেখার সুযোগ নেওয়া উচিত।