বাংলা ও বাঙালির মনন, চিন্তা এবং আবেগের সঙ্গে উত্তম কুমারের সম্পর্ক যেন অবিচ্ছেদ্য। তাঁর সেই ভুবনভোলানো হাসি, মায়াময় চাহনি, অনন্য বেশভূষা কিংবা গাম্ভীর্যে মোড়া শরীরী ভাষা আজও বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক ব্যাকরণের অংশ। পর্দার সেই মহানায়ক শতবর্ষ পেরিয়েও তাই শুধুমাত্র বাংলা সিনেমার নায়ক নন, তিনি বাঙালির নস্টালজিয়া, আবেগ এবং ভালোবাসার এক চিরন্তন নাম।
মহানায়কের জন্মশতবর্ষে সেই আবেগই যেন নতুন করে ছুঁয়ে গেল গোটা দেশকে। উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে বিশেষ শ্রদ্ধা জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বৃহস্পতিবার সকালে সমাজমাধ্যমে বাংলায় পোস্ট করে ‘সপ্তপদী’র সেই কালজয়ী দৃশ্যের ঝলকে স্মরণ করলেন মহানায়ককে। জ্বলজ্বল করল উত্তম-সুচিত্রার অমর জুটির ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’।
প্রধানমন্ত্রীর বার্তায় উঠে এল উত্তম কুমারের কিংবদন্তি হয়ে ওঠার কথা। তিনি লেখেন, মহানায়ক উত্তম কুমার এমন এক কিংবদন্তি, যাঁর কালজয়ী কাজের সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষ একাত্ম হতে পেরেছেন। জন্মশতবর্ষে তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে ‘মন কি বাত’-এ উত্তম কুমারকে নিয়ে তাঁর বক্তব্যও ভাগ করে নেন প্রধানমন্ত্রী।
Mahanayak Uttam Kumar…a legend whose timeless performances connect with people across generations.
Tributes on his birth centenary.
Also sharing what I spoke about him during #MannKiBaat last Sunday.
মহানায়ক উত্তম কুমার… এক কিংবদন্তি যাঁর কালজয়ী পরিবেশনা প্রজন্মান্তরের… pic.twitter.com/GQLr48AO7o
— Narendra Modi (@narendramodi) September 3, 2026
সেখানেও উত্তম-আবেগে ভেসেছিলেন মোদী। তাঁর কথায়, অভিনয় জগতে উত্তম কুমারের অবদান কখনও ভুলতে পারবেন না সিনেমাপ্রেমীরা। তাঁদের মনের মণিকোঠায় আজও রয়েছেন মহানায়ক। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অনেকেই মনে করেন, উত্তম কুমারের অভিনয়ই ছবিটিকে এতটা উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। সত্যজিৎ রায় নিজেও মনে করতেন, অভিনয় দক্ষতার পাশাপাশি উত্তম কুমারের গভীরতাই তাঁকে এত বড় শিল্পীতে পরিণত করেছিল। যে কোনও চরিত্রকে জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তাঁর কঠোর পরিশ্রমেরও কোনও বিকল্প ছিল না।
অন্যদিকে, সকাল দশটায় টালিগঞ্জে মহানায়কের মূর্তিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে হাজির ছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, দেব, জিৎ, রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারী, গৌতম ঘোষ-সহ বাংলা চলচ্চিত্র জগতের একাধিক বিশিষ্ট শিল্পী ও কলাকুশলী।
উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষের এই বিশেষ দিনে আবেগাপ্লুত মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই দিনটি তাঁদের সকলের কাছেই অত্যন্ত স্মরণীয়। পৃথিবীতে মহানায়কের আগমনের একশো বছর পূর্তি উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গ সরকার, কলকাতা পুরসভা, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর, উপদেষ্টা কমিটি এবং চলচ্চিত্র জগতের শিল্পী-কলাকুশলীরা একসঙ্গে এই দিনটি পালন করছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “এই দিনে আমাদের সকলের মহানায়ক প্রাতঃস্মরণীয়। উত্তম কুমার মহোদয়ের এই পৃথিবীতে আসার একশো বছর। এই বিশেষ দিনটি পালন করতেই আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি।”
এই শতবর্ষ উদ্যাপন তাঁর কাছে আরও বিশেষ বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, মহানায়কের শতবর্ষে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব তাঁর হাতে তুলে দিয়েছে মানুষ—এটিও তাঁর কাছে অত্যন্ত আনন্দের। একইসঙ্গে দেশের প্রধানমন্ত্রী ‘মন কি বাত’-এর মতো জাতীয় মঞ্চে উত্তম কুমারকে নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলায় গর্ব প্রকাশ করেন তিনি।
শতবর্ষে উত্তম কুমারের নামাঙ্কিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের উদ্যোগের কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। রয়েছে একাধিক কর্মসূচি। বৃহস্পতিবার বিকেলে হবে শোভাযাত্রা, এরপর কেক কাটা ও পায়েস খাওয়ার আয়োজন। পরদিন রয়েছে ভূমিপুজো। পাশাপাশি উত্তম কুমারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাওয়া প্রবীণ শিল্পীদের সম্মানিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
একশো বছর পেরিয়েও তাই উত্তম কুমার শুধুই একটি নাম নন। তিনি বাঙালির প্রেম, বিরহ, স্বপ্ন, অভিমান আর নস্টালজিয়ার সঙ্গে মিশে থাকা এক অনন্ত অনুভূতি। পর্দা বদলেছে, সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে কিন্তু মহানায়ক থেকে গিয়েছেন একই রকম উজ্জ্বল। শতবর্ষেও তাঁর হাসিতে, তাঁর চোখের চাহনিতে, তাঁর অভিনয়ের মায়ায় বাঙালি যেন আজও খুঁজে পায় তার চিরচেনা ‘উত্তম’কে।