লালন বৃতিতে ধৃতিতে বদলে দিল মানুষ প্রসেনজিৎকে

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

কাকে দিয়েছে রাজার পার্ট: ১৯৬৮
তুমি কীসের পার্ট করছ?
—রাজার পার্ট।
‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’ ছবির এই সংলাপ বলা শিশুশিল্পী বুম্বা যে একদিন সত্যিই বাংলা ছবির রাজা হবে তা কে জানত!

কাট টু ২০২৬:
ঘোষণা হল, চলচ্চিত্র শিল্পে অসামান্য অবদানের জন্য ‘পদ্মশ্রী’ পাবেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। বড় পর্দায় চলছে তাঁর নতুন ছবি। সেখানেও তাঁর ‘রাজা’র পার্ট! রাজা রায়চৌধুরী। সমাপতন!

পদ্মপথে গোলাপ ছিল না কোনো:
বহুল ব্যবহৃত প্রবচন, ‘লাইফ ইজ নট আ বেড অব রোজেস’। চার দশকের বেশি সময়টাও নির্মমভাবে ঝরিয়েছে রক্ত। দমদম থেকে বালিগঞ্জ স্টেশন রোডের স্যাঁতস্যাঁতে এক-কামরার অন্ধকার ছুঁয়ে বালিগঞ্জ ফাঁড়ির বিলাসবহুল উৎসবের রাস্তা— অপমান আর অবহেলার কষ্টিপাথরে ঘষা খেয়ে নগ্ন ব্লেডের মতো ধারালো। গাড়িতে ভালো সিট না পাওয়া, আউটডোরে আলাদা ঘর না পাওয়া যে নায়ক সব ক্ষত থেকে ঝরে পড়া রক্তকে রক্তগোলাপ করে নিতে পারেন, তিনিই তো আসলে কিংবদন্তি।


শ্রীবৃদ্ধিই অমরসঙ্গী:
স্ট্রাগল কথাটা ব্যক্তিগত, শ্রীবৃদ্ধি সর্বজনীন… ব্যাপক। পকেটে চায়ের পয়সা না থাকা বুম্বা মুখ বুজে সব নিজের মধ্যে চেপে রাখলেও প্রসেনজিতের জগতের আনন্দযজ্ঞে সবার নিমন্ত্রণ! আতঙ্কের চোখে চোখ রেখে ময়দানে লড়াই করা প্রসেনজিৎ আর জিৎ তো অমরসঙ্গী। আর এই জুটির ফলকে লেখা বাংলা সিনেমারই শ্রীবৃদ্ধি।

ডিও নয়, সুগন্ধী যেন স্টুডিও:
একটা ইন্ডাস্ট্রির প্রজন্মের পর প্রজন্ম, বেশিরভাগ একটা ছবি করেই বুকপকেটে গ্ল্যামার রেখে বিদেশি ডিও-র বিলাসী যাপনে উদ্ধত। সেখানে, স্বপ্নের দিন ছুঁতে চেয়ে গাড়ির ছাদে রাতঘুম সেরে নিয়েছেন নায়ক প্রসেনজিৎ। তিন শিফটের শুটিং সেরে যে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে পড়ে এনটি ওয়ান বা টেকনিশিয়ানস স্টুডিওর কোনো কোণে, সিনেমার ঈশ্বর তাঁর হিসেব রাখেন। ডিওতে নয়, স্টুডিওতে যে মানুষটা নিজের সবচেয়ে পছন্দের গন্ধটা খুঁজে পান, তিনি তো ফিনিক্স পাখির মতো!

লোভে পুণ্য, পুণ্যে অমরত্ব:
পড়তে গিয়ে খটকা লাগল! লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু ছিল যে! এই সার সত্যকে কোথাও গিয়ে পালটে ফেলেছেন প্রসেনজিৎ। তিনি লোভী। একটা ভালো চরিত্রের লোভে প্রয়োজনে নত হতে পারেন, বিক্ষত হতে পারেন। লোভ তাঁকে দিয়েছে কালজয়ী সব চরিত্র। অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কোনো শেষপাতা হতে পারে না। তাঁর জীবনে করা সব চরিত্র হয়ত কাল্পনিক, কিন্তু একমাত্র তাঁর জন্যই সিনেমার ঈশ্বরের বরে বাল্মিকী আর পুরুষোত্তম মনের দোসর। আর অভিনেতা প্রসেনজিৎ পেয়েছেন অমরত্ব।

লালন পালন:
একবিংশ শতাব্দীর শূন্যের দশক ছুঁয়ে একের দশক এসে বৃতিতে ধৃতিতে বদলে দিল প্রসেনজিতকে। দর্শনে লালনকে পালন করে হয়ে উঠলেন সমান্তরাল ছবির মনের মানুষ। প্রসেনজিৎ নামের এক সময়ের প্রায় অনুচ্চারিত র-ফলা আস্তে আস্তে প্রকট হতে শুরু করল। ‘অভিনয়ে: প্রসেনজিৎ’ বদলে গেল বিলকুল! মেইনস্ট্রিম আর প্যারালাল… দুই পৃথিবীর দায় হাসিমুখে কাঁধে নিয়ে তিনি তখন আক্ষরিক অর্থেই ইন্ডাস্ট্রির জ্যেষ্ঠপুত্র। এখন, ‘প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় অভিনীত’।

মেজাজটাই তো আসল রাজা:
১৯৬৮ সালে ছিল ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’, ২০২৫ সালে সোশ্যাল মিডিয়ার সময়ে এসে সবই বড় প্রশ্ন! ট্রোল হয়, প্রশ্ন ওঠে— প্রসেনজিতের কি আর সেই বাজার আছে?
ঠিক তখনই… পদ্মশ্রী!
আর, ঠিক তখনই যেন ভেসে আসে— ‘দূরের দিগন্তে প্রশ্ন হাজার, মাটিতে পা তাই পড়লো রাজার!’
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় উত্তমোত্তর-কালের সর্বোত্তম রাজা। যাঁর চলায় অননুকরণীয় এমন কিছু একটা আছে, যা তাঁকে আলাদা করে। সময়খণ্ডের নিরিখে তর্কাতীতভাবে কিংবদন্তি সিনেমানুষ।
গর্ব… শ্রদ্ধা… সম্মান, পদ্মশ্রী।