প্রশ্ন: প্রথম ছবি আপনাকে ভেনিসে সেরা পরিচালক এবং দ্বিতীয় ছবি নেটপ্যাক দিল। পরিচালক হিসেবে কী মনে হয়, জীবনে কী বদলেছে? আপনার সিনেমা, নাকি সিনেমা দেখার চোখ?
অনুপর্ণা: পরপর দুটো পুরস্কার আমার কাছে সত্যিই একটা স্বপ্নযাত্রা। প্রথম বছরটাই এখনও একটা স্বপ্নের মতো, তার মধ্যে এটা হয়ে গেল! আমার পুরো টিমের জন্য দারুণ আনন্দের…খুব খুশি আমরা।
হ্যাঁ, পরিবর্তন হয়েছে। সিনেমাকে আরেকটু নতুন করে জানার ও বোঝার ইচ্ছেটা বেড়েছে। গত বছর বা দু’বছর আগে আমি যেরকম সিনেমা দেখতাম আর যে ধরণের বইপত্র পড়তাম, সেগুলোতেও খানিকটা পরিবর্তন তো এসেছেই। এখনও অনেক জানতে বাকি, অনেককিছু বোঝার বাকি। আমি সিনেমার একজন স্টুডেন্ট…আস্তে আস্তে সবকিছুই শিখব, বুঝব। সবই ভাল হবে।
প্রশ্ন: অনুপর্ণার কাছে চরিত্র আগে আসে, নাকি সেই চরিত্রকে তৈরি করা শহর?
অনুপর্ণা: এই বিষয়টা আসলে সময়ের ওপর নির্ভর করে। কখনও চরিত্র আগে মাথায় আসে, কখনও কোনও একটা দৃশ্য বা ইমেজ আগে আসে, আবার কখনও কোনও স্মৃতি আগে আসে…ইট ডিপেন্ডস্। যেমন ‘সংস অব ফরগটন ট্রিজ’-এর ক্ষেত্রে ইমেজটা আগে এসেছিল। ‘লাভার্স ইন দ্য ব্লু নাইট’-এ চরিত্র আগে এসেছে, আবার চরিত্রের সাথে সাথে ইমেজও এসেছে। এখন যেটা তৃতীয় চিত্রনাট্য লিখছি, সেটার ইমেজ বারবার ভেসে আসছে। তাই আমার মতে, পুরোটাই পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
প্রশ্ন: একজন পরিচালক হিসেবে কীভাবে ঠিক করেন, কখন কোনও চরিত্রের হয়ে কথা বলতে হবে, আর কখন তাকে শুধু নিজের মতো থাকতে দিতে হবে?
অনুপর্ণা: পরিচালক নিশ্চিতভাবেই ডিসিশন-মেকার, কিন্তু চরিত্রের ওপর নিজের স্বার্থপরতা চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার পরিচালকের আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে বিষয়টা খুবই সাবজেক্টিভ। একজন পরিচালকের মনে হতেই পারে যে তাঁর ছবির নায়ক কখনও মরবে না, বা শেষ দৃশ্যে নায়ককে তিনি অমর রাখবেন, মার খেতে দেবেন না। এগুলো অনেকটাই নার্সিসিস্টিক দৃষ্টিভঙ্গি। আমি চিত্রনাট্য লেখার পর চরিত্রটাকে শ্বাস নিতে দিই। তারপর চরিত্রটা নিজের মতো করে পথ খুঁজে নেয়। পরিচালকের নিজস্ব সিদ্ধান্ত তো থাকবেই, কিন্তু আমি আমার টিম এবং আমার অভিনেতার সঙ্গে আলোচনায় বিশ্বাসী। কারণ তারাও শিল্পী, তারাও বোঝে তারা কী করছে। শুধু বুদ্ধি দিয়ে সবটা হয় না; আমি সবসময়ই ইন্টেলেক্ট-এর চেয়ে ইন্সটিঙ্কট-কে বেশি প্রাধান্য দিই। নিজের ভাবনা জোর করে না চাপিয়ে নিজের গতিতে ছেড়ে দিলে চরিত্র নিজেই পথ তৈরি করে নেয়। আমার দুটো সিনেমাতেই এই অভিজ্ঞতা হয়েছে।
প্রশ্ন: ভাষা কি আপনার কাছে সংলাপের মাধ্যম, নাকি চরিত্রের সোশ্যাল ও ইমোশনাল আইডেন্টিটিরও অংশ?
অনুপর্ণা: ভাষা কখনোই শুধু সংলাপের মাধ্যম নয়। আমাদের দেশে অজস্র আঞ্চলিক ভাষা আছে, যেগুলো বড় প্ল্যাটফর্মে গুরুত্ব পায় না। আমার জেলা পুরুলিয়ার বাংলা প্রচলিত ‘এলিট’ বাংলার সাথে মেলে না, আবার পুরুলিয়ার ভাষায় কোনো সিনেমা হয় না। তাই এই বৈচিত্র্য চরিত্রের মধ্যে দিয়ে পর্দায় আসা উচিত, কারণ এই সমাজটাই আমি দেখেছি।
সোশ্যাল ও ইমোশনাল আইডেন্টিটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ…এটাই বলে দেয় আপনি ভারতের কোন অংশ থেকে এসেছেন। ‘থার্ড ওয়র্ল্ড সিনেমা’ নিয়ে পড়াশোনার সময় শিক্ষকরা আমাকে এর তাৎপর্য বুঝিয়েছিলেন। আমি প্রিটেনশন পছন্দ করি না; যা দেখি-বুঝি, তাই দেখাই। কাউকে ইম্প্রেস করার জন্য সিনেমা বানাই না। আমার শিল্পও কিন্তু প্রচন্ড নার্সিসিস্টিক। মাইগ্র্যান্টদের নিয়ে সিনেমা করার পর অনেকে বলেছে আমি ‘মহান কাজ’ করেছি। কিন্তু এটা কোনো মহত্ত্ব নয়, স্বাভাবিক মনুষ্যত্ব। তারাও তো মানুষ। যে এতে অবাক হয়, বোঝা যায় সে আগে তাদের মানুষ হিসেবেই গণ্য করেনি। আমি সমাজসেবা করিনি, শুধু নিজের চোখে দেখা সমাজটাকে প্রতিফলিত করেছি। আমি ভূতের গল্প লিখতে পারব না, কারণ ভূত দেখিনি। আমার কাছে একটা সরকার যে ইনজাস্টিস করছে, সে সবথেকে বড় ভূত।
সোশ্যাল, ইমোশনাল, ভৌগলিক, অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত সবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দারিদ্র্যকে আমি অতিরঞ্জিত করি না, করবও না। আমার দর্শক বোকা নয়, তারা জানে তারা কারা। আমি তাদের দারিদ্র্যকে বিক্রি করতে পারব না। আমি আমার বাড়িতে সেই শিক্ষা পাইনি।
৫. একজন মহিলা পরিচালকের ছবিকে gender lens দিয়ে দেখার অভ্যাসটা কি এই সময়ে দাঁড়িয়ে বদলেছে?
অনুপর্ণা: আমি সবার বিষয়টা বলতে পারব না। নিজেরটা বলতে পারি, আমার মতে লেন্সটা বদলানো উচিত। যদি কোনো মহিলা আমায় এসে বলে যে, “আপনি যে জীবনটা দেখেছেন আমরা হয়তো সেটা দেখিনি।” তারা কিরকম ছোটবেলা দেখেছেন, আমি জানিনা। এখনো দিল্লিতে দুপুরবেলায় ধর্ষণ হচ্ছে, দলিত মহিলাদের জন্য সরকার টাকা দিচ্ছে, বিয়ের, পরিকল্পনা করছে! মহিলাদের যে অবস্থা আমাদের এবং তৃতীয় বিশ্বের সব দেশে, আমি কিভাবে আমার লেন্সটা বদলে দিই? মহিলাদেরকে আইটেম সং-এ নাচানো, গায়ে মদ ঢেলে নাচানো…গোটা ভোজপুরি ইন্ডাস্ট্রি সেটাই করছে, বলিউডও করছে। আমাকে একটা কথা বলুন, ওই গানটা যদি না থাকে, সিনেমাটা কি বদলে যাচ্ছে? বড় বড় গেটকিপাররা শিল্পকে পুরুষদেরকে সার্ভ করার জন্য একটা মাধ্যম বানিয়ে দিয়েছে। সেই মাধ্যমটাকে আমি প্রচন্ড ঘেন্না করি। আমার ভাল লাগেনা। আমি নিউ-এজ ফিল্মমেকার। আমার বয়স অনেক কম, আমার মনে হয় আমাদের জেনারেশনের বাচ্চারা আগুন। আগের জেনারেশনের ভুলভাল নিয়ম আর দু’টাকার তথাকথিত অস্তিত্বকে শেষ করে দেবে। সবাই দেখলেন, এত বড় প্রটেস্ট। কে করেছে? এই জেনারেশন করেছে। তারা আগের জেনারেশনকে, তাদের বানানো ‘রুলস’কে প্রশ্ন করছে। এটাই হওয়া উচিত। এই পরিবর্তনটাই আসা উচিত। না হলে কেউ শুধরাবে না।
প্রশ্ন: আপনার কাছে ভাল সিনেমার সংজ্ঞা কী?
অনুপর্ণা: আমার কাছে ভাল সিনেমার কোনো বাঁধাধরা সংজ্ঞা নেই। তবে যে সিনেমা সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরেও নিজের মতাদর্শ দর্শকের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয় না, এবং যেখানে পরিচালকের রাজনৈতিক দর্শন গল্পের স্বাভাবিক গতিকে নষ্ট করে না…সেটাই আমার মতে ভাল সিনেমা। আমি এখনও শিখছি। সময় লাগবে আরও।
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে বোধগম্য হওয়ার চাপে নিজের লোকাল, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কতটা যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন?
অনুপর্ণা: আন্তর্জাতিক দর্শকরা অত্যন্ত সচেতন ও বুদ্ধিমান। কেন? ওরা তো তৃতীয় বিশ্বের নয়, তাই শিক্ষা থেকে শুরু করে জিওপলিটিক্যাল সিচুয়েশন সব আলাদা। আমাদের থেকে অনেক ভাল অবস্থান। আমার কখনোই ওদের বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি সন্দেহ ছিল না। আমি জানি ওরা সিনেমাটা দেখে নিজেদের রিলেটেবিলিটি খুঁজে পেয়ে যাবে। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও মানবিক অনুভূতির গল্প সবার কাছেই পৌঁছয়…সেটা বোঝার জন্য বিরাট পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন হয় না।
প্রশ্ন: দুটো ছবির পর এখন আপনার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর স্বপ্ন কী?
অনুপর্ণা: সবথেকে বড় প্রশ্ন, কতটা এগোতে পারলাম? আমার মনে হয় না আমি সেরকম ভাবে কিছু ভাল করতে পারছি। আমাদের ইন্ডি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক বড় বড় ভাল পরিচালক আছেন যাঁরা খুব ভাল করছেন। আবার অনেক ইওরোপিয়ান, কোরিয়ান, এশিয়ান পরিচালক আছেন যাঁদের কাজ দেখে আমি নিজের কাজকে প্রশ্ন করি যে আমি কেন পারছি না? ওই প্রশ্নটা থেকেই যাবে। আর স্বপ্ন একটাই…ভারতীয় সিনেমা যেন বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী জায়গা তৈরি করতে পারে। আমরা সবাই মিলে হাত মিলিয়ে কাজ করতে পারলে শীর্ষে পৌঁছনো অবশ্যই সম্ভব।