কেমন হল নোলানের ওডিসি?

PIC SOURCE- SOCIAL MEDIA

গ্রীক মহাকবি হোমারের দুটি মহাকাব্য ‘ইলিয়ড’ ও ‘ওডিসি’। খানিকটা আমাদের ‘রামায়ণ’ ও মহাভারতের মতো! পার্থক্য একটাই, হোমারের দু’টি রচনার মধ্যেই গ্রীসের ইতিহাস শুধু নয়, পুরনো (পুরাণ) কথাও জড়িয়ে। যোদ্ধার দেশ ছিল গ্রীস। আবার দেবতাদেরও। পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান ‘ওডিসি’ মহাকাব্যের কাহিনী থেকে বহু উপ ও শাখা কাহিনী বাদ দিয়ে ইথাকার রাজা ওডিসিউস ট্রোজান যুদ্ধের পর বাড়ি ফিরে
আসার চেষ্টা করলে একের পর এক বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
অন্যদিকে ইথাকায় রানি পেনিলোপের সঙ্গে থাকেন ওডিসিউসের সদ্য তরুণ সন্তান টেলামেকাস। পেনিলোপের বিশ্বাস, ট্রোজান যুদ্ধের পর দীর্ঘ দশ বছর স্বামী ফিরে না এলেও সে বেঁচে আছে এবং এরপরেই চিত্রনাট্য ফিরে যায় ট্রোজান ঘোড়ার ঘটনায় চলে যায় চিত্রনাট্য। সমুদ্রের পাড়ে ফেলে রাখা বিশাল কাঠের ঘোড়াটিকে পাড়ে তুলে আনার পর ওডিসিউসের নেতৃত্বে আক্রমণ শুরু হয় রাতের অন্ধকারে। প্রায় পুরো ছবি জুড়েই ওডিসিউসের পরাক্রম, যুদ্ধ ও জেদের নানা কাহিনী এবং ধারাবাহিকভাবে তাঁর জয় ও পরাজয়ও এসেছে। হোমারের কাব্য নোলানের চিত্রনাট্যের উৎস হলেও তিনি এমিলি উইলসনের লেখার উপরেই জোর দিয়েছেন। যেমনটা ঘটে শেকসপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’, ‘কিং লিয়র’ বা ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’ নিয়ে। তাই এই ছবি হচ্ছে নোলানের নিজস্ব। সিনেমার একজন প্রতিষ্ঠ ‘অথর’ হিসেবে তিনি ওডিসিউসকে নিয়ে অতীত ইলিয়াডের ঘটনাও এনেছেন। ট্রয়ের যুদ্ধের পর তাঁর দুই সেনাপতি আগামেনন ও মেনেলাউস ফিরে গেলেও নিজের রণতরী নিয়ে ভূমধ্যসাগরে ভাসতে ভাসতে ঝড়ের মুখে পথভ্রষ্ট হয়ে অন্য দ্বীপে পৌঁছন। মায়াবী ক্যালিপসোর কাছে প্রায় সাত বছর কাটিয়ে প্রায় সব ভুলে থাকেন।
এদিকে রাজধানী ইথাকায় স্ত্রী পেনিলোপ স্বামীর প্রত্যাগমন অপেক্ষায়। অন্যান্য রাজাদের ‘রানি’ হওয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে সারাদিন একটি পোশাক বুনছেন, আর রাতের বেলা সেই বুনন খুলছেন! পোশাক আর তৈরি হচ্ছে না! ছেলে টেলামেকাস বাবাকে খুঁজতে তরী ভাসায় সমুদ্রে।
তবে শেষ পর্যন্ত ওসিসিয়াস নিজের রাজ্যে ফেরেন ভিখারির ছদ্মবেশে। দেবী অ্যাথেনাই তাঁকে সাহায্য করেন। যেমন তিনি বেঁচে যান একচোখা সাইক্লপস, অসুর চেহারার লেস্ট্রিগোনিয়ামদের সঙ্গে লড়াইতে। মহাকাব্য যখন, যুদ্ধ তো থাকতেই হবে। নোলানের এই ছবির প্রায় ষাট ভাগ ধরে যুদ্ধের ঝনঝনানি। লুডভিগ গোরানসনের অসাধারণ আবহ যুদ্ধের দৃশ্যগুলিকে সত্যিই এক এপিক চেহারা দেয়। তিনি গ্রীস বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি চিনা ‘গং’কেও ব্যবহার করেছেন। এই ছবি যতটা নোলানের, ততটাই কিন্তু ডাচ ক্যামেরাম্যান হোয়েত ফন হোয়েতেমার। পুরো ছবিটাই আইম্যাক্স ক্যামেরায় তোলা। মাত্র তিন মিনিট পরপর ক্যামেরার ম্যাগাজিন বদলানোর ঝক্কি নিয়েই তিন ঘণ্টার ছবিটি নোলান শুট করেছেন। এবং ‘ওডিসি’ই প্রথম ছবি যার পুরোটাই আইম্যাক্স ক্যামেরায় তোলা। এবং সারা পৃথিবীর মাত্র চোদ্দটি শহরে আইম্যাক্স ছবিঘরেই এই ছবি দেখার প্রকৃত মজা ও আনন্দ মিলবে। অন্য সাধারণ হলে নয়। কলকাতায় একমাত্র সাউথ সিটি মলের আইম্যাক্স (৪ নং পর্দায়) ছবিটি দেখানো হচ্ছে। জেনিফার লামের সম্পাদনার কাজও চোখ ও মন দিয়ে দেখতে হয় বইকি!
ক্রিস্টোফার নোলানের এই ছবি দেখতে বসে কিছু থ্রিডি ছবির কথা মনে আসছিল। বিশেষ করে ‘অবতার’-এর কথা। তবে নোলানের এই ছবির সঙ্গে স্পেক্টাক্যুলার ছবি কুরোশাওয়ার ‘কাগেমুশা’র দর্শনীয় যুদ্ধের দৃশ্যগুলির সাদৃশ্য চোখে পড়ে। আর যুদ্ধবাজ ওডিসিয়াসকে তিনি আজকের ‘ট্রাম্প’-এর সঙ্গে সমান্তরাল করলেন কিনা, তা নোলানই বলতে পারেন! হোমার বা এমিলির ‘ওডিসি’ নয় এই ছবি, এটা নোলানের নিজস্ব ভার্সান। জাঁকজমকে যেমন দর্শনী, তেমনই বক্তব্যেও। আজকের পৃথিবীতে ওডিসিয়াস না থাকলেও ট্রাম্প, নেতানিয়াহু, পুতিনরা রয়েছেন। যাঁরা ‘জেনিয়া’ অর্থাৎ অতিথিপরায়ণতার উল্টো পিঠে দাঁড়িয়ে থাকেন। আমাদের শাস্ত্রেও বলা আছে ‘অতিথি দেব ভবঃ’— অতিথি নারায়ণ। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে সেই মানসিকতা কোথায়! ক্রিস্টোফার নোলান প্রকারান্তরে এই ছবির মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানবিকতার সেই বার্তাটিই দিতে চান।
এই প্রচেষ্টায় বড় সহযোগী তাঁর শিল্পীরা। ওডিসিয়াসের ম্যাট ডামন চরিত্রের ক্রূরতা, দৃঢ়তা, স্নেহ, ভালবাসা এবং চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব শুধু মুখের মধ্য দিয়েই ফুটিয়ে তুলেছেন। আগামী ‘অস্কার’ পুরস্কারে সেরা অভিনেতার দাবিদার তিনি হবেনই। দুই যমজ বোন হেলেন ও ফ্লাইটেলেস্ট্রা কৃষ্ণাঙ্গ কেন? তবে ছোট্ট পরিসরে লুপিটা নিয়ঙ্গ আর কীই বা করবেন! নম্র-শান্ত টেলমাকাস চরিত্রে টম হল্যান্ড মানানসই। কিন্তু যে সময়ের ছবি তখন কি ‘ড্যাড’, ‘মম’ শব্দগুলো ছিল? ‘ফাদার’, ‘মাদার’ হলেই ঠিক হতো। এই প্রথম নোলানের ছবিতে পেনিলোপ (অ্যান হ্যাথওয়ে), ক্যালিপসো (শার্লিজ থেরন) ও সার্সির মতো নারী চরিত্র গুরুত্ব পেলো। অভিনয়ে অবশ্য প্রথম নাম অ্যানের।
যিশুকে নিয়ে তো বটেই, খ্রিস্টপূর্ব সময়ের গল্প নিয়েও ‘কোয়েস্ট অফ ফায়ার’, ‘আইসম্যান’ বা ‘ক্ল্যান অফ কেপ বিয়ার’ ছবি হয়েছে। তবে ক্রিস্টোফার নোলানের এই ছবি ‘দ্য ওডিসি’ এখনও পর্যন্ত এই জঁর-এর সেরা।