ভারতীয় সঙ্গীতের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আশা ভোঁসলে । যাঁর কণ্ঠের জাদু প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মোহিত করে রেখেছে। ‘দম মারো দম’-এর মাদকতা, ‘পিয়া তু আব তো আজা’-র প্রাণোচ্ছলতা কিংবা ‘ইন আঁখো কি মস্তি’-র গভীর আবেদন—প্রতিটি গানেই তিনি দেখিয়েছেন নিজের স্বকীয়তা।
১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলিতে জন্ম তাঁর। বাবা দীনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন বিশিষ্ট শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী। অল্প বয়সেই বাবাকে হারানোর পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। মাত্র ৯ বছর বয়সে দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে গান ও অভিনয়ের মাধ্যমে পেশাদার জীবনে প্রবেশ করেন।
১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি ‘মাজহা বাল’-এ প্রথম গান রেকর্ড করে তাঁর সঙ্গীতজীবনের সূচনা। শুরুটা ছিল সংগ্রামের, কিন্তু অদম্য পরিশ্রম ও প্রতিভার জোরে ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৪৭ সালের পর থেকে ২০টিরও বেশি ভাষায় প্রায় ১১ হাজারেরও বেশি গান গেয়ে তিনি গড়েছেন এক অনন্য রেকর্ড, যার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১১ সালে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁর নাম ওঠে।
ভারতীয় গায়িকাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্তরে সফল হওয়ার নজির আশার ঝুলিতেই প্রথম জমা হয়। ১৯৯৭ সালে আলি আকবর খানের সঙ্গে তাঁর ‘লিগ্যাসি’ অ্যালবামটি এবং ২০০৬ সালে ক্রোনোস কোয়ার্টেটের সঙ্গে ‘ইউ হ্যাভ স্টোলেন মাই হার্ট’ অ্যালবামটি বিশ্ববিখ্যাত গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছিল।
গানের জগতে সীমানা মানেননি তিনি। অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন ফাস্ট বোলার ব্রেট লি-র সঙ্গেও গলা মিলিয়েছেন আশা। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সময় ব্রেট লি-র লেখা ‘ইউ আর দ্য ওয়ান ফর মি’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই জুটি ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে সাড় ফেলে দেয়।
‘উমরাও জান’ ও ‘ইজাজত’ ছবির গানে তাঁর অনবদ্য কণ্ঠস্বর তাঁকে জাতীয় পুরস্কার এনে দেয়। ২০০০ সালে ভারত সরকার তাঁকে চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে ভূষিত করে। এর ঠিক আট বছর পর ২০০৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাটিলের হাত থেকে তিনি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ গ্রহণ করেন।
সঙ্গীতের পাশাপাশি রান্নার প্রতিও তাঁর টান ছিল। সেই ভালোবাসার টানেই তিনি রেস্তরাঁ খোলেন। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত, বাহারিনের পাশাপাশি বিলেতের বার্মিংহাম বা ম্যাঞ্চেস্টারের মতো শহরেও রমরমিয়ে চলছে তাঁর রেস্তরাঁ ‘আশা’স’। মূলত উত্তর ভারতীয় খাবারের সঙ্গে ঘরোয়া স্বাদ মিশিয়েই ভোজনরসিকদের মন জয় করছে এই রেস্তরাঁগুলি। কণ্ঠের বৈচিত্র্য এবং জাদুতে বিশ্ব সঙ্গীতের ইতিহাসে আশা ভোঁসলের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই হয়ে থাকবে। আশা ভোঁসলে। ভারত তথা আন্তর্জাতিক সংগীত জগতে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।