নির্মল ধর
এখন অনেকেই আফসোস করে বলে থাকেন এই কলকাতা শহরে ফিল্ম ক্লাব-সোসাইটিগুলো ‘অকেজো’ হয়ে গেছে। ষাট-সত্তরের দশকে যেভাবে সুস্থ সোশ্যাল রেলিভ্যান্ট ছবি দেখিয়ে এই ক্লাব-সোসাইটিগুলো ফিল্ম আন্দোলনকে বহতা রেখেছিল, আজ সেখানে তিতাসের চর! সত্যিই কি তাই? বিদেশি ফিল্ম এখন নেটফ্লিক্স, মুবি-ইত্যাকার-ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দৌলতে ঘরের আরামে দেখা যাচ্ছে। কথাটি অসত্য নয়। কিন্তু পাশাপাশি বেগবান না হলেও তিস্তার ক্ষীণ ধারার মতো ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন (নাকি ছবির প্রদর্শনী শুধুমাত্র!) এই শহরে এখনও বহতা। এই দেশের সবচাইতে বড় মাপের ফিল্ম ক্লাব— ‘সিনে সেন্ট্রাল’ এখনও প্রতিমাসে তিন-চারটে শো করেই। ভবানীপুর ফিল্ম সোসাইটি যথেষ্ট সক্রিয়। এবং সর্বোপরি ফিল্ম সোসাইটিগুলোর সর্বভারতীয় সংস্থার কলকাতা অফিস ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজ অফ ইন্ডিয়াও সারা বছর ধরে বিদেশি ছবির উৎসব, প্রদর্শনী, আলোচনা, দেশি ছবির প্রতিযোগিতা, আলোচনা অনুষ্ঠান প্রায় নিয়মিতভাবেই করে চলেছে। খুব পুরনো না হলেও ফোরাম ফর ফিল্ম স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যালায়েড আর্টস নামের তরুণ সংস্থাটিও নিয়মিত বিদেশি ছবির উৎসব করছে বছরের নানা সময়ে। এই তো ক’দিন (২৩ ফেব্রুয়ারি – ১ মার্চ) আগেই ‘পাঁচ মহাদেশের সিনেমা’ নিয়ে ১৪তম উৎসব শেষ করল। পরিচালক গৌতম ঘোষ সংস্থার সভাপতি। তাঁরই উদ্যোগে এবং প্রবীণ এই ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের কর্মী রবীন বন্দ্যোপাধ্যায় ও বরুণ রায়ের চেষ্টায় এই উৎসব। এবারেও দেখানো হল সাতদিনে প্রায় তিরিশটি ছবি এই শহরে আইসিসিআর প্রেক্ষাগৃহে।
এবারের ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিভাগে ছিল ছয়টি ছবি। বাংলায় দু’টি, তামিল, মালায়ালম, মারাঠি ও অহমিয়ায় একটি করে। বাকি চারটি মহাদেশের মধ্যে ছিল দক্ষিণ আমেরিকার উরুগুয়ে, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলা, ডোমিনিকান রিপাবলিক, উত্তর আমেরিকার কানাডা, ইউরোপের সুইৎজারল্যান্ড, ইতালি, গ্রীস, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, পোল্যান্ড, স্পেন এবং এশিয়া থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি করে ছবি। এছাড়াও ছিল জাপানি মায়েস্ত্রো নাগিশা ওসিমার দু’টি অ-দেখা প্রায় অ-জানা ছবি ‘প্লেজার্স অফ দ্য ফ্লেশ’! এবং ‘সিং এ সঙ্ অফ সেক্স’। এই উৎসবের আরও একটি বড় আকর্ষণ ছিল পরিচালক গৌতম ঘোষের ‘পার’ থেকে ‘রাহগী’র পর্যন্ত বাছাই করা সাতটি ছবি। এই স্বল্প পরিসরে সব ছবির আলোচনা সম্ভব নয়। তাই বাছাই তিন-চারটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় আটকে থাকতেই হচ্ছে। তবে এটাও মনে হয়েছে, কিছু ছবি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগুরু দর্শকের রুচি ও পছন্দকে আয়োজকরা প্রাধান্য দিয়েছেন— বিশেষ করে বিদেশি ছবির ক্ষেত্রে। তুলনায় ভারতীয় ছবির নির্বাচনে স্বাধীন ছবি করিয়েদের প্রাধান্য দেওয়াটাও লক্ষ্যণীয়। প্রথমেই বলি, রুদ্ররূপ সেনগুপ্তর ‘যুদ্ধজাহাজের কবিতা’ মাত্র দুটি চরিত্র মেঘনা ও আর্য তাদের নিরুদ্দিষ্ট স্বামী ও ভাইকে খুঁজতে গিয়ে পরস্পরের পরিচিত হয়। একই সরকার বিরোধী মিছিল থেকে দু’জনেই নিখোঁজ! ওঁদের পারস্পরিক সংলাপের মধ্য দিয়ে বোঝানো হয় নিরুদ্দিষ্ট দু’জনই কোনও বিপ্লবী দলের সমর্থক। এই ছবির গঠন ও কৃৎকৌশলে আর্ট সিনেমার উপকরণটাই বেশি।
ফলে সাধারণ দর্শকের কাছে দুর্বোধ্য ঠেকতে পারে। কিন্তু পরিচালককে ধন্যবাদ জানাতেই হবে সংখ্যাগুরু দর্শকের জন্য তিনি তাঁর সিনেমার ভাষা ও ব্যাকরণকে সমঝোতার পর্যায়ে নামাতে চাননি। ভালো লেগেছে আরও দু’টি ছবি— তামিল ভাষায় ভিপিন রাধাকৃষ্ণণের ‘অঙ্গাম্মল’! এবং মালায়লম ছবি ‘থিয়েটার দ্য মিথ অফ রিয়্যালিটি’। ‘অঙ্গাম্মল’-এ একজন প্রৌঢ় নারীর পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে শুধু পারিবারিক সমস্যার ঘেরাটোপে আটকে থাকেননি পরিচালক, সামাজিক এক বীক্ষণও রয়েছে। ‘অঙ্গাম্মল’ নামের বয়স্কা মহিলাটির ব্লাউজ পরিহার করে শুধু শাড়িতে শরীর ঢেকে সংসারের নিয়ম ভাঙতে চায়। শুধু নিয়ম ভাঙা নয়, তাঁর হাতে যে উল্কি আঁকা আছে, সেটাও অঙ্গাম্মল সবাইকে দেখাতেও চান। মারাঠি ছবি ‘স্থল’-এ বিয়ের আগে পাত্রীকে বারবার হবু শ্বশুরবাড়ির লোকের সামনে বোকা বোকা প্রশ্ন আর শরীর দেখানোর জন্য যে অশোভন ও অপমানজনক অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়, সেটাই বাস্তব পরিবেশে দেখিয়েছেন তরুণ পরিচালক জয়ন্ত দিগম্বর সোমালকর। আবার ‘বিরিয়ানি’ খ্যাত সাজিন বাবুর নতুন ছবি ‘থিয়েটার দ্য মিথ অফ রিয়্যালিটি’তে এক প্রায় জনহীন দ্বীপে অজানা সাপের কামড়ে এক তরুণী প্রায় মরনোন্মুখ হলে এখনকার সোশ্যাল মিডিয়া, এক বহুজাতিক ব্যবসায়ী ওষুধ কোম্পানি রোগীর চিকিৎসার নামে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এবং পরে রোগী সুস্থ হয়ে দ্বীপে ফিরে গেলে মা-মেয়ে অজানা আততায়ীর হাতে খুন হয়। এবং পাঁচ বছর পর দেখা যায় পরিত্যক্ত সেই দ্বীপটি আন্তর্জাতিক ট্যুরিস্ট আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। সত্যিকার ঘটনা নিয়েই ছবিটি তুলেছেন সাজিন। অর্থগৃধ্নু ব্যবসায়ী এবং এখনকার প্রযুক্তিওয়ালারা হাতে হাত মিলিয়ে ব্যবসার জন্য কত অমানবিক হয়ে উঠছে, তারই উদাহরণ এই ছবি।
আর বিদেশি ছবির দিকে চোখ রাখলে প্রথমেই মনে পড়ে আফ্রিকার মরোক্কো থেকে আসা নাবিল আউশের ছবি ‘এভরিবডি লাভস তৌদা’। ওঁর আগের ছবি ‘কাসাব্লাংকা বিটস্’-এই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি কমার্শিয়াল কাঠামোর মধ্যে থেকেও ব্যক্তি চরিত্রের সংকট ও সংঘাতের সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতাকে সমান প্রাধান্য দেন। এই ছবিতেও নাবিলের চিত্রনাট্য (সহ লেখিকা স্ত্রী মরিয়ম তৌযানি) তুলে এনেছে এক তরুণী সিঙ্গলর মায়ের সফল গায়িকা হয়ে ওঠার সংগ্রামী কাহিনী। গত বছর কান উৎসবে দারুণ প্রশংসিত এই ছবি। তৌদা নামে মরক্কোর মফস্বল শহরে থাকা তরুণীর রাজধানী কাসাব্লাংকার নাইটক্লাবে সবচাইতে সফল গায়িকা হয়ে ওঠার বিস্তৃত বিবরণকে তুলে আনে। সে প্রথম দিকে ধর্মীয় ‘আইতা’ গান করত। কিন্তু রাজধানীর রজনী বিলাসিতায় প্রয়োজন নাচের সঙ্গেও পুরুষ উত্তেজক ইশারায় ঘেরা অঙ্গভঙ্গি। হ্যাঁ, সেই কাজেও তৌদা গ্রাম্যজীবন থেকে পারদর্শী। সুতরাং কাসাব্লাংকার বিশাল বাড়ির আলোকোজ্জ্বল ছাদে সে গানে-নাচে, বিল্লোল শরীরী ভঙ্গিতে উদ্দাম হয়ে নিজের স্বপ্নপূরণের দিকে কয়েক পা এগিয়ে যায়।
পুরুষের আদর-আক্রমণ তাকে আর বিব্রত-বিরক্ত করে না। কারণ একমাত্র সন্তানের জন্য সোনালি ভবিষ্যতের সূর্যোদয় দেখতে পাচ্ছে। নাবিলা আউশের মরমি পরিচালনার সঙ্গে তৌদার চরিত্রে নিসরিন ইরাদির চোখ জুড়ানো অভিনয় ও মন ভোলানো গান। নিজেই গেয়েছেন নিসরিন। আর্জেন্টিনার ‘ভেরা’ এবং ভেনেজুয়েলার ‘তুর্বা’ও নজর কাড়ে এই উৎসবে। প্রতি সন্ধ্যায় আইসিসিআর-এ সত্যজিৎ রায় প্রেক্ষাগৃহ জানিয়ে দিল এই শহরের কিছু মানুষ এখনও বাণিজ্য ছাড়াও সিনেমার অন্যতর ভাবনা, পরীক্ষামূলক চিন্তাকে প্রশ্রয় দেয়। তাই ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন এই শহরে এখনও বহতা।