আর্ট ও কমার্শিয়াল ছবির মধ্যে সেতু হতে পারে ‘মায়া সত্য ভ্রম’

PIC- SNS

‘বেলাইন’-এর পর ফের মুক্তি পেতে চলেছে পরিচালক শমীক রায়চৌধুরীর দ্বিতীয় ছবি ‘মায়া সত্যভ্রম’। ছবির মূখ্য ভূমিকায় অভিনয় করছেন সোহম মজুমদার ও প্রিয়াঙ্কা সরকার । দৈনিক স্টেটসম্যানের সঙ্গে পরিচালকের সাক্ষাৎকারে উঠে এল ছবি তৈরির নানা অজানা কাহিনি। শুনলেন দেবযানী লাহা ঘোষ।

প্রশ্ন: তোমার প্রথম ছবির নাম ছিল ‘বেলাইন’। আর দ্বিতীয় ছবির নাম ‘মায়া সত্যভ্রম’। নাম দু’টি শুনলেই মনে হয়, ছবির নামের মধ্যেই যেন গল্পের একটা ইঙ্গিত রয়েছে। এই ধারণাটা কতটা সঠিক?

শমীক: আমার মনে হয়, একটা ছবির নাম দেখেই অনেকের মধ্যে ছবিটি দেখার আগ্রহ তৈরি হয়। তাই ছবির নাম এবং প্রথম তিন মিনিট এমনভাবে তৈরি করার চেষ্টা করি, যাতে দর্শকের মধ্যে পুরো ছবিটা দেখার একটা প্রবল ইচ্ছা তৈরি হয়। ‘মায়া সত্যভ্রম’-এর ক্ষেত্রেও সেই ভাবনাই কাজ করেছে।


প্রশ্ন: তোমার দ্বিতীয় ছবি ‘মায়া সত্যভ্রম’-এর গল্প বা ভাবনা নিয়ে কিছু বলো?

শমীক: ‘মায়া সত্যভ্রম’ মূলত আমাদের সমাজ এবং সামাজিক জীবনের ছবি। আমরা কীভাবে বাঁচি, আমাদের জীবন কীভাবে এগিয়ে চলে—সেই ভাবনাকে কেন্দ্র করেই গল্প তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি, যে কোনও ধরনের ছবিতেই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এই ছবিতেও তার প্রভাব রয়েছে। পাশাপাশি চারটি ভিন্ন ধারার মিশেল রয়েছে—আধ্যাত্মিকতা, অপরাধ, দর্শন এবং কল্পবিজ্ঞান। এই চারটি বিষয়কে ঘিরেই ছবির গল্প এগিয়েছে।

প্রশ্ন: ইতিমধ্যেই ছবিটি বেশ কিছু চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। কয়েক দিন আগে বিদেশেও ছবিটি নিয়ে গিয়েছিলে। সেখানে দর্শকদের কেমন প্রতিক্রিয়া পেয়েছ?

শমীক: চলচ্চিত্র উৎসবের অভিজ্ঞতাটা সব সময়ই একটু অন্য রকম। এর আগে আমার প্রথম ছবি নিয়েও ওই উৎসবে গিয়েছি এবং দর্শকদের ভালো সাড়া পেয়েছি। ‘মায়া সত্যভ্রম’ নিয়েও একই রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। তবে এই ছবিকে ঘিরে একটি মন্তব্য আমাকে বিশেষভাবে উৎসাহ দিয়েছে। মুম্বই এবং নিউইয়র্ক—দুই জায়গাতেই শুনেছি, ‘আর্ট ফিল্ম এবং কমার্শিয়াল ফিল্মের মধ্যে যদি কোনও সেতু থেকে থাকে, তা হল ‘মায়া সত্যভ্রম’।’ এই মন্তব্যটা আমাকে আরও কাজ করার উৎসাহ দিয়েছে এবং আগামী দিনে নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

প্রশ্ন: তোমার প্রথম ছবি ‘বেলাইন’-এর জন্য প্রযোজক পেতে তোমাকে অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেই লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

শমীক: ‘বেলাইন’-এর যাত্রাটা আমার কাছে একেবারেই অন্য রকম। এই ছবি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে, বিশেষ করে ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে। আমি যে ধরনের ছবি তৈরি করি বা যে ধরনের গল্প লিখি, সেটা শুধু মুখে বলে বোঝানো খুব কঠিন। ছবি না দেখলে বা অনুভব না করলে অনেক সময় সেই গল্পের ভাবনাটা বোঝানো যায় না। বহু প্রযোজককে গল্প শুনিয়েও হয়তো ঠিকভাবে বোঝাতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত আট বছর পর একজন প্রযোজক আমার গল্প শুনে রাজি হন এবং বলেন, আমার গল্প অনুযায়ীই তিনি ছবিটি প্রযোজনা করবেন।

তার পর নবম বছরে ‘বেলাইন’ মুক্তি পায়। সেই সময় আমি পাহাড়ে গিয়ে ‘মায়া সত্যভ্রম’-এর গল্প লিখি। ফিরে এসে দেখি, তখনও ‘বেলাইন’ প্রেক্ষাগৃহে চলছে। প্রায় দশ সপ্তাহ ধরে ছবিটি চলেছিল। সব মিলিয়ে আমার কাছে এটা সত্যিই একটা অদ্ভুত এবং শিক্ষণীয় যাত্রা।

প্রশ্ন: তুমি প্রথম থেকেই প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে ভিএফএক্স নিয়ে দীর্ঘদিন কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা পরিচালক হিসেবে কতটা কাজে এসেছে?

শমীক: আমি বহু বছর ভিএফএক্স নিয়ে কাজ করেছি। ১১টি হলিউড ছবিতেও এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সেটাই ছিল আমার আগের পেশা। আমি ভিএফএক্স প্রযুক্তিগত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে ছবিকে ফ্রেম ধরে বুঝতে অনেক সাহায্য করেছে। কোথায় কতটা দেখাতে হবে, কোথায় কিছুটা আড়াল করতে হবে, কীভাবে একটি দৃশ্যকে দর্শকের সামনে তুলে ধরতে হবে—এই বিষয়গুলো সেই কাজ থেকেই শিখেছি।

‘মায়া সত্যভ্রম’-এ সেই শিক্ষা অনেকটাই কাজে লেগেছে। ছবিটা নিয়ে আমি বেশ কিছুটা প্রযুক্তিগতভাবে ভেবেছি। তবে শুধু আমার নয়, গোটা দলেরই প্রচুর পরিশ্রম রয়েছে। প্রত্যেকেই খুব ভালো কাজ করেছেন।

প্রশ্ন: ছবির গোটা টিম এবং অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

শমীক: আমাদের প্রযোজক সনৎ চট্টোপাধ্যায়ের বয়স ৬৬ বছর। তিনি এই ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করছেন। তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং প্রবল ইচ্ছাশক্তি সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। ছবির জন্য আমার সঙ্গে বেশ কিছু দিন কর্মশালা করেছেন। চরিত্রের জন্য নিজেকে প্রায় পুরোপুরি তৈরি করেছেন।

এ ছাড়া ছবির প্রধান চরিত্রে রয়েছেন অভিনেতা সোহম এবং অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা। দু’জনেই প্রচুর সময় দিয়েছেন এবং খুব নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। এই ছবিতে ৫৬টি চরিত্র রয়েছে। প্রত্যেকেই নিজেদের জায়গা থেকে খুব ভালো কাজ করেছেন। তাঁদের প্রত্যেকের কাজই প্রশংসনীয়।

প্রশ্ন: ছবিটির শুটিং কোথায় হয়েছে?

শমীক: ছবিটির অধিকাংশ শুটিং হয়েছে কলকাতায়। এ ছাড়া সামান্য কিছু অংশের শুটিং হয়েছে ওড়িশার চন্দ্রভাগা সেতুর কাছে।

প্রশ্ন: সব শেষে দর্শকদের উদ্দেশে ‘মায়া সত্যভ্রম’ নিয়ে কী বলবে?

শমীক: দর্শকদের একটাই কথা বলতে চাই—‘মায়া সত্যভ্রম’-এর গল্প আপনাদের হতাশ করবে না। আমরা প্রত্যেকে খুব পরিশ্রম করে ছবিটি তৈরি করেছি। তাই ওটিটিতে আসার অপেক্ষা না করে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবিটি দেখলে আমার মনে হয়, অভিজ্ঞতাটা আরও ভালো হবে। সকলকে ছবিটি দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি। ধন্যবাদ।