নির্মল ধর
নাম: জন জোস্ট। আক্ষরিক নাগরিকত্বে—আমেরিকান। মানসিকতায় বিশ্বনাগরিক। বয়স: তিরাশি ছুঁয়েছে। রাজনীতি: বামপন্থা ও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ: পুরোমাত্রায় দূষিত, নষ্ট, বিকৃত, দুর্নীতিবাজ আমেরিকান সমাজের প্রোডাক্ট! তিনি আর ‘ভালো মানুষ’ হবেন কেমনে! পেশা: স্বাধীন চিন্তায়, নিজস্ব ভাবনায় এবং সিনেমা তৈরির কোনও ব্যাকরণ না জেনে এবং মেনে একান্ত খোলা মনে ছবি বানিয়ে যাওয়া। এ পর্যন্ত তাঁর তৈরি ছোট-বড় দৈর্ঘের ছবির সংখ্যা প্রায় একশো। (ফিচার ছবি: ৪৪, শর্ট ফিল্ম: ৫২)। এহেন দুষ্ট আমেরিকা বিরোধী মানুষটি এই মুহূর্তে কলকাতায়। এসেছেন ছবি বানাতে। কিন্তু অসুস্থ হয়ে হাসপাতাল আর বাড়ি যাতায়াত চলছে গত দু-সপ্তাহ ধরে। পায়ে অপারেশন হয়েছে, স্টেন্ট বসেছে। কিন্তু দমে যাবার মানুষ নন জন। যথেষ্ট ‘জোশ’ রয়েছে তাঁর মাথায় এবং মনে।
Advertisement
দক্ষিণ কলকাতার এক প্রান্তিক এলাকায় জন জোস্টকে পাওয়া গেল রোববারের বিকেলে। প্রথম পরিচয়। কিন্তু পরের দু-ঘণ্টা কাটল যেন ‘দীর্ঘ চেনা-জানা ও বন্ধুত্বের পরিবেশে। প্রথম প্রশ্ন ছিল, ‘আপনাকে তো আমেরিকান সিনেমা ‘আউটকাস্ট’ করেছে— কেন এমনটা হল?’ জবাব পেলাম বিরাশির তরুণের কাছ থেকে, ‘‘আমাকে ‘আউটকাস্ট’ বললে খুবই নরম শব্দ হবে। বলতে পারো ‘আউটসাইডার’, ‘বহিরাগত’! কেন জানো, আমেরিকান সমাজ ও রাজনীতির সম্পূর্ণ বিরোধী আমি। নিজের মতো চলি। টাকা-পয়সার তোয়াক্কা করি না! হলিউড বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট কোনও প্রযোজকের দরজায়ও আমি যাই না ছবির জন্য অর্থ ভিক্ষা করতে!’’
Advertisement
জন জোস্টের তোলা অধিকাংশ ছবির বাজেট দুই থেকে পাঁচ হাজার ডলার মাত্র। ডিজিট্যাল টেকনোলজি আসার পর খরচ আরও কম। তাঁর তৈরি সবচাইতে কম বাজেটের ছবিটি হল ইতালিতে ২০০৮-এ তোলা ‘দ্য লং শ্যাডো!’ খরচ মাত্র ৫০ ডলার। একজনের ব্রেকফাস্টের খরচেরও কম। আর সবচাইতে দামি ছবিটি হচ্ছে ‘অল দ্য ভার্মিয়ার্স ইন নিউইয়র্ক’। বাজেট মাত্র চব্বিশ হাজার ডলার। ১৯৯১-তে বার্লিন ফিল্ম উৎসবে সেরা এক্সপেরিমেন্টাল ছবি হিসেবে ‘ক্যালিগারি’ সম্মান জিতেছিল ছবিটি। তবে এখনও পর্যন্ত জনের সেরা ছবি বলা হয় ১৯৯৭-এ তোলা ‘লাস্ট চ্যান্টস ফর এ স্লো ডান্স’। ওঁর বেশির ভাগ ছবির বিষয় আমেরিকার সাধারণ মানুষের জীবন। তাঁদের অস্তিত্বের সংকট। তিনি ‘বাজার-নির্ভর খেলো যুক্তি’কে প্রত্যাখ্যান করে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নান্দনিক ও নৈতিক অবস্থান থেকে নিজের শিল্পকর্মকে দর্শকের সামনে প্রতিষ্ঠিত করেন। সচেতনভাবেই অত্যন্ত সীমিত উপকরণ নিয়ে ছবি বানান জন। ভারতীয় এক পরীক্ষামনস্ক পরিচালক প্রভাষ চন্দ্র (যাঁর— ‘আই অ্যাম নট দ্য রিভার ঝিলম’ দেশে-বিদেশে প্রশংসিত) জনের একজন গুণমুগ্ধ দর্শক। তিনি স্পষ্ট করেই লিখেছেন— ‘(জনের) এই মিতব্যয়িতা কোনও ভিস্যুয়াল এস্থেটিক্সে পৌঁছনোর ব্যর্থ চেষ্টা নয়; বরং বহু দিনের অভিজ্ঞতা, সাধনা ও দীর্ঘ রেওয়াজের ফসল।’
জন নগরকেন্দ্রিক ছবি করেন। লস এঞ্জেলেস শহরের বাইরের জৌলুস-চাকচিক্যের তলায় ঢাকা পড়ে থাকা নিচুতলার মানুষদের কথা সোচ্চারে তিনি জানিয়েছেন তাঁর ‘অ্যাঞ্জেল সিটি’ ছবিতে। সেই সত্তর দশক থেকেই তিনি তরুণ ও মার্কিন সমাজব্যবস্থার প্রতি গভীরভাবে ক্ষুব্ধ। জন নিজে মিলিটারি পরিবারের সন্তান হয়েও ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় সৈন্য বিভাগে নাম লেখানোর বিরোধিতা করেছিলেন। ফল সাতাশ মাস ফেডারেল প্রিজনে বন্দী! চিরটাকাল জন আপসহীন! জঁ লুক গোদার জন জোস্ট প্রসঙ্গে বলেছিলেন— ‘তিনি অন্যপ্রায় সব মার্কিন পরিচালকদের মতো চলচ্চিত্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি।’
নিজের প্রতি বিশ্বাস থেকেই ছবি করার ডাক পেয়েছেন পর্তুগাল, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে। এই মানুষটির খোঁজ পেয়েছিলাম উত্তরপাড়া সিনে ক্লাব আয়োজিত একটি ফিল্ম শোয়ে। সিনে ক্লাবটি শুধু জনের দু’টি ছবিই দেখায়নি, ওঁকে নিয়ে একটি আলোচনা সভারও আয়োজন করেছিল। অবশ্য ভারতে তিনি প্রথম আসেন ১৯৯৯ সালে দিল্লিতে এক ডিজিট্যাল ফিল্ম উৎসবের জুরি হয়ে। আয়োজকদের রাজসিক পাঁচতারা আপ্যায়ন তাঁর একেবারেই পছন্দ হয়নি। বলেছিলেন— ‘রাস্তায় বেরোলেই ভিখারি দেখছি, ছবি তৈরির খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে ডিজিট্যাল টেকনোলজির কথা ভাবা হচ্ছে। অথচ সেই উৎসবে এমন অর্থের অপচয় আমার একেবারেই ভালো লাগেনি।’ তারপরেও উদয়পুরে গিয়েছিলেন একবার ট্রাইব্যাল ও প্রান্তিক পরিবারের কিছু তরুণকে ফিল্ম ওয়ার্কশপে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে। ছাত্রদের প্রথমেই বলেছিলেন, ‘আই অ্যাম জাস্ট জন, ইওর ফ্রেন্ড, নট এ প্রফেসর! ফাক্ টিচিং!’ সিনেমা-নাবালক ওই সব ছাত্রদের সঙ্গে ছয় সপ্তাহ কাটানোটা তাঁর কাছে ‘বেস্ট অ্যান্ড মোস্ট জয়াস এক্সপিরিয়েন্স অফ মাই লাইফ!’
জন প্রথম কলকাতায় আসেন ২০২২ সালে। থাকতেন সন্তোষপুরে, অজয়নগরের কাছে। তারও আগে ২০১৮ সালে কলকাতার তরুণ পরিচালক ঋদ্ধি মজুমদার ‘খ্যাপা’ নামে একটি এক ঘণ্টার ছবি করেছিলেন। কত্থক নৃত্যশিল্পী তরুণী অপালা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। এসআরএফটিআই-এর এক বন্ধুর পরামর্শে ‘খ্যাপা’ ছবিটা পরের বছর পাঠানো হয় জন জোস্টের কাছে। ছবিটি পছন্দ হয় জনের। সেই পরিচয় সূত্রেই প্রথম কলকাতা ভ্রমণ। সন্তোষপুরের যে এলাকায় জন উঠেছিলেন, সেখানেই তিনি দেখতে পান বিশাল বহুতলের পাশেই রয়েছে ‘ডি-ব্লক’ নামের একটি জায়গা। যেখানে কয়েকশো মানুষ প্রায় অস্বস্তিকর-অস্বাস্থ্যকর বস্তির পরিবেশে বাস করেন। যাঁদের অনেকেই এসেছেন সুন্দরবন এলাকা থেকে ঠাঁই হারিয়ে।
প্রাত্যহিক ভ্রমণে তাঁদের রোজকার জীবনযাত্রা দেখেছেন। আর তখনই মাথায় ঢুকেছে জীবনযুদ্ধে লড়াই করা এই মানুষগুলোর কথা সবাইকে দেখানো, জানানো দরকার। প্রায় ছয় মাস থেকে ওঁদের স্টাডি করেছেন। ধীরে ধীরে বন্ধু হয়েছেন জন ওই গরিবগুর্বো মানুষগুলোর। যখন তাঁরা বুঝতে পারলেন এই সাদা চামড়ার মানুষটা অন্য পাঁচজনের মতো নন, তাঁরা রাজি হলেন জনের ক্যামরার সামনে মুখ ফুটে কথা বলতে। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অপালা-ঋদ্ধিরা। আর টেকনিশিয়ান বলতে জন জোস্ট একা ‘কুম্ভ’। তিনিই ক্যামেরাম্যান, পরিচালক, সম্পাদক— স-অ-অ-ব। এমনকি কোনও কৃত্রিম আলোরও ধার ধারেন না জন।
একটু সুস্থ হয়ে ‘ডি-ব্লক’-এর বাকি কাজটুকু শেষ করে চলে যাবেন। বললেন— ‘‘যদি বেঁচে থাকি, আগামী বছর এসে ‘ডি-ব্লক’ ছবিটা আপনাদের সব্বাইকে দেখিয়ে যাবো।’’ সাদা চামড়ার নির্মাতারা যখন থার্ড ওয়ার্ল্ডের বাস্তবতা নিয়ে ছবি বানান, তখন সেখানে আগন্তুকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ঝুঁকি থেকেই যায় নাকি? এই প্রশ্নের উত্তরে জন বললেন, ‘আমি বিভিন্ন দেশে ছবি করেছি। ইতালি, জাপান, কোরিয়া, ফ্রান্স। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে সেখানকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। সুতরাং আমার বিশ্বাস, নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছি ওঁদের সঙ্গে। তাই এসব নিয়ে আমি বিশেষ চিন্তাও করি না!’ সত্যিই তো, নিজের দেশ আমেরিকায় জন ‘বহিরাগত’ হলেও এই শহরে অপালা-ঋদ্ধিদের কাছে তিনি এখন ‘ঘরের মানুষ’। তার চাইতেও বড় কথা, সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ানো এই মানুষটার নিজেরই কোনও ঘর নেই, স্থায়ী ঠিকানা নেই! এই খোলা বিশ্বই জনের ঘর! তিনি কি মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন?
Advertisement



