সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে কাকবাবু চরিত্র ফেলুদাকে প্রায় ধরে ফেলেছে। মগজাস্ত্রতো বটেই, উপস্থিত বুদ্ধি, অবজারভেশন, ভ্রমণ কুশলীতেও ফেলুদার প্রায় সমান, আর পাঁচ ডিগ্রি বেশি চটকদার অ্যাকশন দৃশ্যে! খোঁড়া পা আর লাঠি নিয়েও মুশকো পালোয়ানদেরও এক এক ঝটকায় ডিগবাজি খাওয়াতে কাকাবাবু সত্যিই দড়! তিন-তিনটে ছবি বানানোর ফাঁকে কাকাবাবু ওরফে প্রসেনজিৎ-এর বয়স তেরো বছর অন্তত বেড়েছে। কিন্তু ‘বয়স্ক’ বুম্বার এখনও চলনে বলনে এবং অ্যাকশন ক্রিয়ায় ‘এতটুকু’ও বয়সের ছাপ নেই! শুধু চুলের কিছু অংশে বয়সের আভাস ছাড়া!
এই চার নম্বর কাকাবাবু সিরিজে প্রসেনজিৎ অনেক বেশি চনমনে, সপ্রতিভ, প্রয়োজনে ক্ষিপ্রগতিময় এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে বেশ চটকদার! অভিনেতা প্রসেনজিতের জন্যই চন্দ্রাশিস রায়ের প্রথম কাকাবাবু সিরিজের ছবি দেখতে কিশোর-শিশুদের নিয়ে বাবা-মায়েরাও কম মজা পাবেন না! চিত্রনাট্যকার জুটি রোহিত-সৌম্য মূল গল্পের কিছু কিছু ঘটনার কাটছাঁট ও রদবদল করায় ছবির গতি একই সঙ্গে মসৃণ এবং উপভোগ্য হয়েছে। কিন্তু গল্পের মূল ভিলেন মোহন সিং-এর নামটা ঠিক রেখেও তাঁকে কন্নরভাষী না করলেও চলতো! আবার মূল গল্প থেকে রিংকু (শ্রেয়া)-রঞ্জনের (সত্যম) উধাও ব্যাপারটা ‘উধাও’ করে দিয়ে নতুন সাসপেন্স তৈরি হয়েছে।
বিজয়নগরের রাজা কৃষ্ণদেবের জিম্মায় সত্যিই ডিম্বাকৃতির হীরে ছিল কিনা, তা নিয়ে ‘রহস্য’ রেখেও শেষ পর্যন্ত হাম্পির মন্দিরেই গর্ভগৃহের কোনও চোরাকোঠায় ‘হীরকখণ্ড’র প্রাপ্তি দেখিয়ে সেই রহস্য ভেদ হল ঠিকই, কিন্তু দর্শকরা কিন্তু একটু ধাঁধায় থেকেই যাবেন!
Advertisement
তবে পরিচালক হিসেবে চন্দ্রাশিস তাঁর— প্রথম গোয়েন্দা ছবির কৃৎকৌশলে যথেষ্ট পরিণত চোখ ও প্রয়োগনৈপুণ্যের পরিচয় রেখেছেন। আর হাম্পির লোকেশন অবশ্যই এই ছবির দর্শকের কাছে বাড়তি প্রাপ্তি। বিজয়নগর রাজ্যের ইতিহাসের সঙ্গে ফিকশন ভ্রমণপিপাসু দর্শকের জন্য ওই জায়গাটির আকর্ষণীয় স্থাপত্য, ট্যুরিস্ট স্পটগুলোকেও সুন্দর ব্যবহার করা হয়েছে। ছোট-বড় সব অ্যাকশনগুলোই হয়েছে আউটডোরে। আর ছবির শুরুতেই পাহাড়ি রাস্তায় প্রায় দু’মিনিটের উত্তেজক কার-চেজিং-এর দৃশ্যটাই যেন ছবির প্রিল্যুড হিসেবে কাজ করে। দর্শক এই প্রথম জানতে পারেন— কেন এবং কীভাবে কাকাবাবুর পায়ে আঘাত লেগেছিল! এই ছবিতেই দেখানো হল কাকাবাবুর অবাঙালি গুরু মহাবীর প্রসাদকে (চিরঞ্জিৎ)। এই স্বল্প পরিসরে চিরঞ্জিৎ তাঁর দড় দেখিয়ে দিয়েছেন! গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের রসায়নটি সুন্দর মানবিকতার সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে ছবিতে। বিজয়নগরের হীরের অস্তিত্ব রহস্যের জাল ছেঁড়ার কাজটি তো মহাবীর প্রসাদের হাত দিয়েই মহরত হয়েছিল।
Advertisement
মাধিকা ভাষায় লেখা ধাঁধাঁ তো তিনিই জানিয়েছিলেন শিষ্য কাকাবাবুকে। আবার বিজয়নগর রাজ্যের কনিষ্ঠা রাজকন্যা রায়ার (রাজনন্দিনী) চরিত্রটি ঘিরে যে ফিকশানাল রহস্যের আভাস— সেটাও বেশ জমিয়ে করা গেছে চিত্রনাট্যে। পাসওয়ার্ড উদ্ধারের খেলায় জোজো (পূষণ) উপস্থিত বুদ্ধির ব্যাপারটাও কাকাবাবু-সন্তু-জোজো এই তিন মাস্কোটিয়ার্সের পারস্পরিক আস্থা-বিশ্বাস ও সমঝোতার বড় উদাহরণ। আর অ্যাকশন দৃশ্য তো আরিয়ান যেন কাকাবাবুর অনুগত ছাত্র! তবে গল্পে রিংকু ও রঞ্জনের বড় ভূমিকা থাকলেও ছবিতে তেমন নেই। কিন্তু একেবারে শেষ দৃশ্যে পুলিশ নিয়ে এসে হাম্পি পাহাড়ে ভিলেন পাকড়াওতে তুরুপরে তাসটি ফেলেছে ওঁরা দু’জনই!
আবার এটাও বলতে হচ্ছে হীরের সন্ধান করতে মন্দির চত্বরে একটার পর একটা বাধা ও ধাঁধাঁর খেলা রাখা হয়েছে— সেটা একটু দীর্ঘই বটে!
তবে হ্যাঁ, বড়দিন, নতুন বছর পৌষপার্বণের লম্বা ছুটির পরিচ্ছন্ন বিনোদন এই ছবি— শুধু ছোটদের নয়, ছোটবড় সব্বার। বাঙালি সাহিত্য পাঠক এবং সিনেমা দর্শক গোয়েন্দা কাহিনীর ফ্যান! সুতরাং কাকাবাবুর এই কাহিনী রহস্যের মোড়ক দিয়েই ভিস্যুয়াল ভ্রমণের এক ট্রাভেলগও হয়ে উঠেছে। তা হোক না কেন ইতিহাসের সঙ্গে কল্পনার রঙ মেশানো! আর সেই রঙে নায়ক প্রসেনজিৎ একাই নিজেকে রাঙিয়ে নিয়েছেন যোগ্য গাইড ও গোয়েন্দার ভূমিকায়। — নি.ধ.
Advertisement



