নির্মল ধর
ভারতবর্ষের অন্য কোনও শহরে আছে কিনা জানি না। তবে কলকাতায় আছে। আন্তর্জাতিক মানের একটি ফিল্ম উৎসব গত এগারো বছর ধরে চলছে এই শহরে। অবশ্য মাত্র চারটে দিন। শুধু ভারত নয়, দক্ষিণ এশিয়া সংলগ্ন দেশের চৌত্রিশটি ছবি নিয়ে এবারের (দ্বাদশ) উৎসব বুধবার শেষ করল আয়োজক সংস্থা পিপলস ফিল্ম কালেক্টিভ। উৎসবের নাম ‘কলকাতা পিপলস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’। উপযুক্ত নামই বটে! এঁরা বলছেন, ‘মানুষের সাহায্যে মানুষের সিনেমা।’ ব্যাপারটা সত্যিই তাই— সাধারণ দর্শকের কাছ থেকে ‘ডোনেশন’ নিয়ে চলে এই উৎসব। উৎসবের অন্যতম দুই উদ্যোগী কস্তুরী বসু ও দ্বৈপায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েই বলেন— ‘আমরা সরকারি বা কোনও কর্পোরেট অনুদান গ্রহণ করি না।’ স্পষ্ট কারণ— ‘আমাদের মতে সেটা করলে আমাদের স্বতন্ত্রতা তাহলে রক্ষা করা যাবে না!’
এই উৎসব অন্য কথায় বললে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ ফিল্ম নির্মাতাদের ছবির উৎসব। এই উৎসব দেখায় প্রতিবাদের ছবি। প্রতিরোধের সিনেমা— হয়তো বা কিছুটা প্রতিশোধের সিনেমা — যাকে প্রকারান্তরে ‘সাবভার্সিভ’! সিনেমাও বলতে পারি। অন্তিম দিন বুধবার সকালেই দেখা হল রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের এক মর্মন্তুদ জীবন কাহিনী নিয়ে ‘এ ড্রিম কল্ড খুশি’। প্রায় সাত/আট বছর আগে থেকেই মায়ানমার দেশটির শাসক গোষ্ঠী এবং সেনাবাহিনীর অকথ্য অত্যাচারে প্রাণ বাঁচাতে লাখে লাখে উদ্বাস্তু ঢুকে পড়তে থাকে সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশে। তৎকালীন বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিকতার কারণেই কক্সবাজারের কাছেই উখিয়া নামের একটি জায়গায় কুতপালং নামের একটি উদ্বাস্তু ক্যাম্পে থাকার জায়গা করে দেন। মাত্র তেরো বর্গ কিলোমিটার জায়গায় দশ লক্ষ লোকের অস্থায়ী বাস সেখানে।
এই মুহূর্তে জনসংখ্যা আরও বেড়েছে। খোলা আকাশের তলায় তাঁবুর ঘর। অতীব অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এ-পি’র সাংবাদিক ঋষভ রাজ ২০১৮ সালে প্রথম যান ওই উদ্বাস্তু ক্যাম্পে। তখনই দেখা হয় ‘খুশি’ নামের রোহিঙ্গা কিশোরীর সঙ্গে (নাম পরিবর্তিত)। কারণ বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য শুধুমাত্র ওই জায়গাটুকুই বরাদ্দ করেছে। মূল ভূখণ্ডে ঢোকার কোনও অনুমতি নেই তাদের। ঋষভ ছয় বছর পর গিয়ে আবারও দেখা পান ‘খুশি’র। ততদিনে সে কোনও স্কুলে যেতে না পারলেও ক্যাম্পের এডুকেশন সেন্টার থেকেই পড়াশুনো করে অতি কষ্টে নাম ভাঁড়িয়ে কক্সবাজার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার পর খুশি বিতাড়িত। আবার ক্যাম্পে! এখন সে ক্যাম্পেই ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের পড়াশুনোর দায়িত্ব নিয়েছে। ‘সচেতন’! করে তুলতে চাইছে নতুন প্রজন্মকে। ঋষভ মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিটের এই ছবিতে ‘খুশি’র স্বপ্নকে তুলে ধরার প্রয়াসী। খানিকটা যেন পাকিস্তানি নোবেলজয়ী কিশোরী মালালা ইউসুফযাইয়ের মতো। রোহিঙ্গা খুশিও যেন বলতে চায়— ‘যদি একজন মানুষ একটা দেশ ধ্বংস করতে পারে, তাহলে একটা মেয়ে কেন সেই ধ্বংস রোধ করতে পারবে না!’ ঋষভরাজ জৈনের এই ছবি তো আমরা এই উৎসব ছাড়া দেখতেই পেতাম না।
যেমন দেখা গেল প্যালেস্টাইনের পরিচালিক হান্নান মজিদের তোলা ‘টু কিল এ ওয়ার মেশিন’। গাজায় নয়, লন্ডনে তৈরি ছবিটি। কারণ ইজরায়েল কে অত্যাধুনিক ড্রোন এবং অস্ত্র সরবরাহ করে ব্রিটেনের কিছু অস্ত্র ব্যবসায়ী। প্যালেস্টিনিয় সমর্থনকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ওইসব অস্ত্র কারখানার কর্মীরাই কেমনভাবে সাবোটাজ করে অস্ত্র নির্মাণ ও পাচার বন্ধ করার চেষ্টা করছেন সেই ঘটনা নিয়েই এই ছবি।
ভারতের নিজের মাটিতে চোখ ফেরালে দেখতে পাচ্ছি কলকাতার রাণু ঘোষের নাম! মনে পড়ছে ২০০০ সালে তাঁর একটি তথ্যচিত্র (কার্টেন কল ) বি-এফ-জে-এ-এর পুরস্কার জিতেছিল। অভিনেত্রী কেতকী দত্তকে নিয়ে তোলা ছবির নাম— ‘কার্টেন কল’! এখন তিনি সর্বভারতীয় মুখ! তাঁর নতুন ছবি ‘ডেয়ার টু ড্রিম’ — রাজস্থানের এক কিশোরীর অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে পুরুষ শাসনের জাঁতাকলে তাঁর যেমন পরিস্থিতি হয়, সেটাই তুলে এনেছেন রাণু। কোন ছবি ছেড়ে কোন ছবির কথা লিখব!
এই উৎসবের বাড়তি আকর্ষণ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিচার ছবিও। দুটো ছবির কথা বলতেই হচ্ছে। সিকিমে তোলা নেপালি ভাষার ছবি ‘শেপ অফ মোমো’। পরিচালক ত্রিবেণী রাই-এর প্রথম ছবি এটি। বিষ্ণু নামে এক তরুণী দিল্লির কাজ ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে মায়ের সঙ্গে থাকার ইচ্ছে নিয়ে ফেরা। কিন্তু ছোট্ট গ্রামেরও পারিবারিক ও সামাজিক রাজনীতির ঘুর্ণাবর্ত বিষ্ণুকে ফিরে যেতে বাধ্য করল আবার দিল্লিতেই। রোজকার দিনলিপির মধ্যেই ত্রিবেণী বুঝিয়ে দিলেন মানসিকতায় অমিলটা কোথায়! এবং শেষ দৃশ্যে একটি পাহাড়ি পাথরের উপর বিষ্ণুর ক্লান্ত শরীর যেন শুইয়ে থাকে মোমো’র আকার নিয়ে। অসাধারণ সমাপ্তি। অন্যটি বাংলাদেশি পরিচালক শেখ মামুনের ‘ড্রেইনড বাই ড্রিসি’!। কোরিয়ার কোনও এক শহরে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে সেলিম নামের এক বাংলাদেশী তরুণ প্রায় দশ বছর পর নিজের দেশে ফেরার উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত পারে না। দেশের বাড়ি থেকে আরও অর্থের জন্য চাপ আসতেই থাকে। আবার বেআইনি পথে কাজে যোগ দিতে হয় তাকে এবং পরিণতি অবশ্যই দুঃখজনক।
আবার পাশাপাশি এবারের উৎসবে পাওয়া গেল ভারত-পাক সীমান্তের রাজস্থানে ‘মির’ নামের প্রায় অবলুপ্ত এক মুসলিম সঙ্গীতকারদের জীবন নিয়ে সুরভি শর্মার ‘মিউজিক ইন এ ভিলেজ নেমড 1PB’। সুফি গানের এক অপূর্ব সংকলন এই ছবি! আবার ঝাড়খণ্ডে রাঁচির এক ডিস্কো গায়ককে নিয়ে শ্রীপ্রকাশ নামের একজন একটি তথ্যচিত্র বানাতে গিয়ে সত্যিই একটা সিনে-ভেরিতে স্টাইলে ‘ম্যাড ওভার ডিস্কো’ নামের একটি নন-সিনেমাটিক সিনেমা বাড়িয়ে ফেলল! রীতিমতো সাহসী এক্সপেরিমেন্ট। এই উৎসবেই দেখা ছোট ও মাঝারি মাপের ‘দ্যাট পারফেক্ট ডে’ (অনুপ আব্রাহাম পারাক্কাল), ‘রোজেস আর…’ (দ্বিগ্বিজয় আন্ধরিকর), ‘আইডেনটিটি’ (সুহাস্য তেলাং), ‘নিপানিয়া’ (অনামিকা পাল), ‘ডেলিভারি বয়’ (দেবারুণ দত্ত), ‘পানকৌড়ি’ (জাফর মুহম্মদ), ‘ল্যান্ড অফ ড্রিমস’ (আম্বেরিয়ন আলকাদর)। ‘ইন সার্চ অফ বেঙ্গলি হার্লেম’ (আলাউদিন উলাহ) জানিয়ে দিল প্রকৃত মানুষের ‘ছবি’ দেখার জন্য মানুষের ‘সাহায্য’টা সত্যিই কতটা জরুরি!’