প্রিয় সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে কিউবার পরিচালক

নিজস্ব চিত্র

নির্মল ধর

‘আমি ইটালিয়ান নিওরিয়্যালিজম-এর ছবি ভিসকন্তি, জাভাত্তিনি, ডিসিকা দেখেছি। ফরাসি ন্যুভেল ভগ-এর ত্রুফো, গদার, রিভেৎ দেখেছি। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তবতা দেখতে বসে সত্যজিৎ রায়ের ‘অপু ট্রিলজি’ আমার কাছে সেরা পাঠক্রম।’— কথাগুলো বলেছেন স্পেনের ভ্যালেন্সিয়াতে জন্মানো মধ্য চৌত্রিশ বছরের তরুণ ফিল্মমেকার ডেভিড বিম। যাঁর প্রথম ডকুফিচার ‘টু দ্য ওয়েস্ট ইন জাপাটা’ গত নভেম্বর মাসে এই কলকাতার ফিল্ম উৎসব থেকে সেরা ছবির পুরস্কার গোল্ডেন রয়্যালবেঙ্গল টাইগার জিতেছিল। ওই সময় ডেভিড শহরে আসতে পারেননি। এলেন গত সপ্তাহে মাত্র সাত দিনের ছুটিতে। তখন স্পেনের জিলিন ফিল্ম উৎসবে ওই একই ছবি দেখিয়ে সেখান থেকেও সেরা ছবির পুরস্কার নিতে ব্যস্ত ছিলেন।

ডেভিড বললেন, ‘কলকাতা শহর মানেই আমার কাছে সত্যজিৎ রায়ের শহর। সেখানে আমার ছবি ‘সেরা’ হয়েছে ভেবেই আমি আনন্দে আত্মহারা। ক্রিসমাসে মায়ের কাছে মাত্র দু’দিন ছুটি কাটিয়ে কলকাতায় চলে এসেছি। পুরস্কারের টানে যতটা নয়, তার চাইতে অনেক বেশি টান আমার গুরুপ্রতিম সত্যজিৎ রায়ের শহরে যাব এবং তাঁর পবিত্র বাড়ি আমার কাছে এক তীর্থস্থান— সেখানেও একবার যেতেই হবে।’


সেই ঘটনাই ঘটল গত শনিবারের বারবেলায় ডেভিডের জীবনে। তাঁকে কলকাতা শহরে নিয়ে আসার কিঞ্চিৎ কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন সস্ত্রীক উত্তম মুখোপাধ্যায় এবং তাঁর দিদি সুতপা। এঁরা তিনজনই প্রবাসী বাঙালি। ডেভিডের সঙ্গে এঁদের দেখা হয়েছিল মেক্সিকোর গুয়ানাহুয়াতো ফিল্ম উৎসবে। উত্তমবাবুই ডেভিডকে খবর দেন সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউটের এবং সেখানে ওঁর ছবিটা পাঠানোর উৎসাহ দেন। কলকাতার এই সফরে তাই ডেভিড বিন এসেছিলেন এসআরএফটিআই-এর অতিথি হয়ে। ওই মুখোপাধ্যায় পরিবারটি ডেভিডকে নিয়ে শান্তিনিকেতন দেখিয়ে এনেছেন। রবিবার ওঁর ছবিটা দেখানো হয়েছে এসআরএফটিআইতে।

মাস্টারক্লাস নিয়েছেন ডেভিড এবং ছবির প্রদর্শনীর পর যথারীতি প্রশ্নোত্তর পর্বেও তাঁ কণ্ঠে নিজের ছবির চাইতে সত্যজিৎ-প্রশংসা ছিল একজন ছাত্রের বিনীত ও বিনয়ের সুরে। শুরু থেকেই ডেভিডের ইচ্ছা ছিল সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি দেখার। শনিবার সন্ধ্যাবেলাতেই সন্দীপ রায়ের সঙ্গে দীর্ঘ এক ঘণ্টা সত্যজিৎ রায়ের ছবির সারল্য, গভীর মানবিক বোধ এবং তাঁর নির্মাণশৈলীর সহজতা নিয়ে ভাঙা-ভাঙা ইংরেজিতে একান্তে আলাপ চালিয়ে গেলেন ডেভিড। সত্যজিৎ রায়ের ছবির প্রধান যে জিনিসটি ডেভিডের পছন্দ হল— সহজতা ও সারল্য। বলছিলেন— ‘ওঁর ছবি দেখে আমি বুঝেছি— কম কথা বলে বা দেখিয়ে কতবেশি বলা ও দেখানো যায়।’
ডেভিডের ছবি কিউবার উত্তর-পশ্চিমের এক নোংরা জলাভূমি এলাকায় বাস করা তিনজনের একটি পরিবার নিয়ে। অল্পবয়সী পুরুষ স্যান্ডি, স্ত্রী মার্সেদিস ও তাঁদেরই একটি পঙ্গু সন্তান ডেনিস, ওঁরা জীবিকা নির্বাহ করে কুমীর ছানা শিকার করে, যা আইনত বেআইনি। কিন্তু ওই জলাভূমিতে বেঁচে থাকার অন্য কোনও উপায়ও নেই। এই ছবিটি বানাতে ডেভিড সময় নিয়েছেন প্রায় দশ বছর। জীবনকে রীতিমত পর্যবেক্ষণ করেছেন। ডেভিড বলছিলেন, আমি একা একা নির্জন শান্ত জায়গায় ঘুরতে ভালোবাসি। সেভাবে ঘুরতে ঘুরতেই একদিন বাইশের তরুণ ডেভিড দেখা পেয়েছিল মার্সেদিসের। এক কাপ কফি খেতে খেতে কখন যেন বন্ধু হয়ে যায় দু’জন। ল্যান্ডি তখন শিকারে বেরিয়েছে। অনেকদিন ঘরে ফিরছে না। ক’দিন ওখানে কাটিয়ে ডেভিড হয়ে ওঠে মা-ছেলের কাছের মানুষ। মার্সেদিসের ভাই, ডেনিসের মামা। আর ল্যান্ডি ফিরে এলে ওঁর বন্ধু। একবার ওঁর সঙ্গে কুমির শিকারে গিয়ে নিজের চোখে দেখে এসেছেন কী দুঃসাহস আর কষ্টকে সঙ্গী করে বাঁচতে হচ্ছে পরিবারটিকে এবং তারপরই সিদ্ধান্ত নেন এঁদের নিয়ে তাঁর প্রথম ডকু-ফিচার ধাঁচের ছবি হবে।

ডেভিড বিম ‘ওয়ান ম্যান ফিল্ম ইউনিট’। বৃষ্টি এড়াতে কোমরে ছাতা বেঁধে তিনি একা ক্যামেরা চালিয়েছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সাদা-কালোয় ছবির শুটিং শেষ করে ভেবেছেন এই ছবির রঙ হবে ছবির বি-জি-এম। কীভাবে! ডেভিড আবার একাই চলে গিয়েছেন সেই জলাভূমি এলাকায়। দিন ও রাতের বিভিন্ন সময়ে ওখানকার পাখ-পাখালির ডাক, বৃষ্টির শব্দ, ডিঙি নৌকো চলাচলের আওয়াজ, পতঙ্গের ওড়ার শব্দ, সব টেপ করে এনে জুড়ে দিয়েছেন ছবির সঙ্গে।

স্প্যানিশভাষী ডেভিড ছবি এডিট করার পর অর্থ আর যোগাড় করতে পারছিলেন না। প্যারিস ডক-এর আন্তর্জাতিক ওয়ার্কশপে যোগ দিয়ে অর্থ যোগাড় করে ছবির কাজ শেষ হয়। সুইজারল্যান্ডের ছোট্ট শহর লিঁয়তে ‘ভিশন দ্য রীল’ নামের এক আন্তর্জাতিক ফিল্ম উৎসবে প্রথম ফিপ্রেস্কির পুরস্কার জেতে ছবিটি। সবার নজর কাড়েন ডেভিড ছবির বিষয়ের জন্য তো বটেই, তার চাইতেও বেশি ছবির এ টু জেড সব কাজ নিজের হাতে করার জন্য। অবশ্য ছবি বানানোর জন্য প্রথমে স্পেনে এবং পরে কিউবার বিখ্যাত ফিল্ম স্কুল (গেব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের তৈরি) থেকে পাশ করেছেন তিনি। এখন সেখানেই মাঝেমধ্যে ‘মাস্টারি’ও করেন।

সত্যজিতের নিজস্ব ঘরটিতে ঢুকে চমকে যান ডেভিড। বই-পত্র-পত্রিকার পাহাড় দেখে অবাক। পিয়ানো দেখে প্রশ্ন— ‘নিজে বাজাতেন?’ সন্দীপ বললেন, ‘বাবা তো এই পিয়ানোতে বসেই তাঁর অনেক ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর লিখেছেন! বাখ্‌-বিঠোফেন-মোৎজার্ট ছিলেন বাবার প্রিয় সঙ্গীতকার। বিড়বিড়িয়ে ডেভিড বললেন, ‘বিঠোফেন আমার খুব প্রিয়।’ জানিয়ে দিলেন, ‘কলকাতা ফিল্ম উৎসব থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে পরের ছবির কাজটা অন্তত শুরু করতে পারব।’ বিষয় কী, প্রশ্ন করায় জবাব এল, ‘আজকের কিউবার তিন তরুণকে নিয়ে চিত্রনাট্য ভেবেছি। সেটাই করব হয়তো।’

ঘর থেকে বেরোনোর আগে নিজের মনেই গুনগুনিয়ে বলে উঠলেন, ‘দিস ইভনিং আই-উইল নেভার ফরগেট। ইটস ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট এপিসোড ইন মাই লাইফ। বেটার দ্যান গেটিং এ প্রাইজ ইন এনি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল!’