কানাইলাল জানা
‘উমর দরাজ মাঙ্গকে লায়ে থে চার দিন / দো আরজুমে কাট গয়ে, দো ইন্তেজার মেঁ।’ ‘চার দিনের জন্য আয়ু নিয়ে এসেছিলাম / দু’দিন কাটলো আকাঙ্ক্ষায় আর দু’দিন অপেক্ষায়’— মানব জীবন সম্পর্কে যে আত্মোপলব্ধি শেষ মোগল সম্রাট ও অনন্যসাধারণ কবি দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের। সেই তাঁকে, সঙ্গে দু’জন পত্নী দুই ছেলে ও এক নাতিকে গরুর গাড়িতে চাপিয়ে চলল বল্লমধারী অশ্বারোহীর দল। পেছনে আরও কিছু খাজা-খোজা পরিচারক-পরিচারিকা। তারিখটা ৭ অক্টোবর ১৮৫৮।
৭ অক্টোবর ১৫২৬ বাবর ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করার ৩৩২ বছর পর এই নির্বাসন। গন্তব্য যমুনা নদীতে নৌকোর সেতু পেরিয়ে কানপুর। চোখের জল ফেলা দূরের কথা, সামান্য হা-হুতাশ পর্যন্ত করেনি কোনো দিল্লিবাসী। কারণ ভোর চারটের সময় অন্ধকারে ছেয়ে আছে যমুনাকূল। এভাবে গার্ড করে স্লো মোশনে গাড়িগুলিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কানপুর। পথে বন্দি সম্রাটের মনে পড়ছে কত কথা, কত স্মৃতি! ১১ মে ১৮৫৭, যখন সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হয় দিল্লির তখ্ত-ই-তৌসে আসীন থেকে তিনি ২০টি বছর (১৮৩৭- ১৮৫৭ খ্রিঃ) রাজত্ব সম্পূর্ণ করেন। পূর্বপুরুষদের মতো যথানিয়মে দেওয়ান-ই-আমে বসত দরবার, দেওয়ান-ই-খাসে হতো আলোচনা, ঝরোকা থেকে দর্শন দিতেন প্রজাদের। তাঁরও ছিল হারেম। কিন্তু প্রাসাদ ঝলমল করত না হাজার রঙিন আলোয়, শাহজাদা শাহজাদিদের পোশাক পরিচ্ছদ ছিল অতিসাধারণ, কারণ সামান্য রাজস্বও ঢুকত না মোগল কোষাগারে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভাতা বাবদ দেওয়া মাত্র সওয়া লক্ষ টাকায় তাঁকে চালাতে হত মোগল প্রশাসন, দরবার ও হারেম সহ সমস্ত ধরনের খরচ। তা হলেও দরবার ছিল জমজমাট। কবিতা ও গজল পাঠের আসর বসত প্রতিদিন। দরবার আলো করে বসতেন মির্জা গালিব, উর্দু কবি জওক-সহ দিল্লির সেরা উর্দু ও ফারসি কবি ও লেখকরা এবং তাঁদের মধ্যমণি ছিলেন বাদশাহ স্বয়ং। সম্রাট নিজে ছিলেন বড় কবি। কবিতা ও গজল লিখতেন গাইতেন। তাঁর লেখা গজল: ‘কারও চোখের আলো নই কারও মনের শান্তি নই/ আমি এক মুঠো ধূলি যে কারও কাজে আসেনি।/ আমার রং রূপ বিগড়ে গেছে, বন্ধু আমার বিছিন্ন হয়ে গেছে/ হেমন্তে যে বাগান উজাড়, আমি তারই বসন্তের ফসল’। লিখেছেন শের: ‘আমাকে যদি রাজকীয় অফিসার পদে নিয়োগ করা হতো/ অথবা আমার মাথার মুকুট ফকিরের মতো তৈরি না হতো/ জীবনে যে স্বপ্ন ছিল তা কেটেছে জাঁকজমকে/ অন্যথায় আমার সারা জীবন কেটেছে দুঃখ বেদনায়।’ কবিতা: ‘বাগানে শীত এল, সব বৃক্ষ বিলীন হয়ে যাচ্ছে/ শান্তি আর আমার হৃদয়ের ধৈর্যও গেল মিলিয়ে/ সবাই ছিল আনন্দে আর করছিল প্রার্থনা/ ঢুকল ইংরেজ সেনা হারিয়ে গেল সব/ হুমা পাখি কেন ছটফট করবে শিকারীর হাতে/ দু-দুটি প্রহর তখ্তে বসেছি, এখন হারিয়েছি/ সন্ধ্যায় গোলাপের কলি ফুটেছিল নগর বাজারে/ হায় খোদা, লক্ষ মানুষের মস্তক ছিন্ন হচ্ছে এখন সেখানে।’ বাদশাহ সমাদর করতেন চিত্রশিল্পেরও। কখনো আবার তরুণ শাহজাদাদের নিয়ে মহাসুখে ঘুড়ি ওড়াতেন যমুনার তীরে। সেই তাঁকেই কিনা লুকিয়ে থাকতে হল পূর্বপুরুষ হুমায়ুনের সমাধিস্থলে! সম্রাটের নিষেধ সত্বেও যেভাবে বিদ্রোহীরা দলে দলে ইংরেজ পুরুষ নারী ও শিশুদের হত্যা করল, তাতে তো ইংরেজ প্রশাসকদের ক্ষেপে যাওয়া স্বাভাবিক। হাডসন ১৮ জন শাহজাদাকে গাছের ডালে ফাঁসিতে ঝোলালেন, তিনজন শাহজাদাকে নগ্ন করে কাছ থেকে গুলি করে মারলেন শুধু নয়, কয়েক দিন ফেলে রাখলেন অন্যান্য মৃতদেহের সঙ্গে। গরুর গাড়ি করে বন্দি সম্রাট, পুত্র ও পৌত্রদের নিয়ে যাওয়া হল রাজপথ দিয়ে। দিল্লিবাসী তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করল সম্রাটের পরিণতি। কতটা নিষ্ঠুর কোম্পানির এই সেনাপতি হাডসন, নাহলে এভাবে গুলি করে মারেন হাজারের বেশি মোগল রাজবংশের সদস্যদের? তবু ভালো যে হাডসন কথা দিয়েছিলেন প্রাণে মারবেন না সম্রাটকে, তাই বেঁচে আছেন। মানছেন নিজেও তো একটা বড় ভুল করেছেন প্রধান পত্নী বেগম তাজমহলের ঔরসজাত জ্যেষ্ঠ পুত্র মির্জা ফকরুকে তাঁর অবর্তমানে পরবর্তী সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে অস্বীকার করে। সবদিক দিয়ে সে-ই ছিল উপযুক্ত এবং কোম্পানি তাকে মেনেও নিয়েছিল এবং মনোনয়ন দিয়েছিল। অথচ কনিষ্ঠ পত্নী বেগম জিনাত মহল তাঁর ছেলে মির্জা জওয়ান বখ্তকে মসনদে বসানোর জন্য কী কাণ্ডকারখানাই না চালিয়ে গেলেন, আর তিনি বরাবর তাতে সায় দিয়ে গেলেন। ধার করে কী বিপুল পরিমাণ অর্থই না খরচ হল মির্জা বখ্তের শাদিতে। চোখ ধাঁধানো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জিনাত মহল জানাতে চায় প্রধান শাহজাদার শাদি হচ্ছে। বখ্তও তো আজ বন্দি, কিন্তু ফকরুর যদি ১৮৫৬ সালে রহস্যজনক মৃত্যু না হতো, মোগল মসনদ রক্ষা পেত। বুঝতে পারছেন না, ভুল হল, না ঠিক হল। যখন বিদ্রোহী সিপাহিরা শাহজাদা মির্জা মোগলকে প্রধান সেনাপতি করে দস্তখতে তাঁকে দিয়ে সই করাল। মনে হয় ঠিকই ছিল যেহেতু বিদ্রোহীরা সম্রাটের নামে ২১ বার তোপধ্বনি করে তাঁকে দেওয়ান-ই-খাস সম্মাননা জানিয়েছে। প্রথমে রাজি হননি বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে নিজের সীমিত শক্তি ও ক্ষমতার কথা ভেবে। বিদ্রোহী সেনাদের পক্ষে লোকবলের অভাব ছিল না, অভাব ছিল স্বার্থশূন্য ব্যক্তিত্বের, কারণ তারা এসেছিল বিভিন্ন সেনাশিবির থেকে। নেতা হিসেবে কেউ কাউকে মানতে চায় না। তা সত্বেও এক সময় ইংরেজদের মনে শঙ্কা ছিল হেরে যাওয়ার। তখন তারা উৎকোচ ছড়িয়ে হাত করে নেয় বিদ্রোহীদের অনেককে। যেমন বাদশাহের দরবারের হাকিম আসানুল্লা খান। বিশ্বাসঘাতকতা করে বিদ্রোহীদের যাবতীয় গোপন সংবাদ পৌঁছে দিত ইংরেজ শিবিরে। আর স্বয়ং বাদশাহকে বিপথে চালিত করত সবসময়। নিজেরই প্রয়াত পুত্র মির্জা ফকরুর শ্বশুর মির্জা ইলাহি বক্স-ই তো ইংরেজ সেনাপতি হাডসনকে খবর দেয় যে, তাঁরা সকলে পূর্বপুরুষ হুমায়ুনের সমাধিসৌধে আশ্রয় নিয়েছেন। কনিষ্ঠ পুত্র জওয়ান বখ্ত ও তাঁর মা জিনাত মহল ছিলেন লালকুঁয়া হাবেলিতে। রেহাই পেলেন না তাঁরাও। অথচ দিল্লিতে যত ইংরেজ নিধন হয়েছে ও লুটতরাজ চলেছে, তাতে না ছিল বাদশাহের সায়, না ছিল কোনো শাহজাদার। তাও বিচারসভা যদি ফৌজদারি আদালতে বসত, তিন মাস ধরে বিচারের নামে প্রহসন হতো না। লালকেল্লার কোর্ট মার্শালে হাফরের বিরুদ্ধে যে দুটো চিঠি পেশ করা হয়— যার একটি বিদ্রোহী সিপাহিদের কার্যকলাপ নিয়ে, অন্যটি আমার মক্কা যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ নিয়ে, তা ছিল নকল। কেন না দুটো চিঠিরই ভাষা ছিল উর্দু, অথচ তিনি চিঠি বরাবর লিখে আসছেন ফারসিতে। আসলে আগে থেকেই ঠিক করা ছিল প্রাণদণ্ড না হলেও নির্বাসন নিশ্চিত। বাদশার উকিল যখন প্রতিটি অভিযোগকে মিথ্যে প্রমাণ করেছে কোম্পানির উকিল প্রমাণ করেছে ঠিক বিপরীত।
গ্রেপ্তারের পর দিল্লিতে অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় কাটান বাদশাহ এবং তা সচক্ষে দেখেছেন গ্রিফিথস নামে এক ইউরোপীয়৷ তাঁর বর্ণনায় পাওয়া যায়: ‘বাড়ির আঙিনায় একটি মামুলি খাটে একটি গদি বিছানো আছে। এই খাটে শেষ মোগল সম্রাট পায়ের ওপর পা দিয়ে বসেছিলেন। পূর্বের আড়ম্বরপূর্ণ জাঁকজমক অবস্থা তাঁর আদৌ ছিল না। অশীতিপর বৃদ্ধ বাদশার সাদা দাড়ি ঝোলা বুক পর্যন্ত। পরনে সাদা পোশাক। মাথায় সাদা রঙের একটি বৃত্তাকার পাগড়ি। দু’জন কর্মচারী পেছনে দাঁড়িয়ে পাখা দিয়ে বাতাস করছে তাঁকে। কোনও কথা বা শব্দ বের হচ্ছে না তাঁর মুখ দিয়ে। বসেছিলেন চুপচাপ। মেঝের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ। তিন ফুট দূরে আর একটি খাট। ওই খাটে বসে একজন ইংরেজ সেনা অফিসার। বাদশাহের দু’দিকে গুলিভর্তি বন্দুক নিয়ে দুজন শ্বেতাঙ্গ সৈন্য প্রহরারত। যদি বাদশাহ পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তবে তাঁকে তৎক্ষণাৎ গুলি করবে।
লালকেল্লার দেওয়ান-এ-খাস-এ বাহাদুর শাহের বিরুদ্ধে মামলার রায়ে বিচারক লিখেছেন: বাদশাহকে প্রথম বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেখা যায় এবং বিদ্রোহীরা তাঁকে দিল্লির বাদশাহ হিসেবে ঘোষণা করে। এটা প্রমাণ করে বিদ্রোহীদের সঙ্গে পূর্ব থেকেই বাদশাহের যোগাযোগ ছিল। কিন্তু সত্যিটা হল ১১ মে ১৮৫৭ সকালে যখন বিদ্রোহী সিপাহিরা মিরাট থেকে দিল্লি এসে হাজির হয়, বাদশাহ কিছুই জানতেন না। জেনেছেন দু’দিন পরে। মামলায় জজ সাহেব রায় দেন: বাদশাহ অস্ত্রাগার লুন্ঠনের জন্য একদল সৈন্য প্রেরণ করেন এবং ইংরেজ সৈন্যদের পাকড়াও করে কেল্লায় আনার নির্দেশ দেন। নির্দেশ অমান্য করলে কাউকে অস্ত্রাগার থেকে বের হতে দেবেন না। বিচারকের গুরুতর অভিযোগ: ব্রিটিশ সরকারের পেনশনভোগী হওয়া সত্ত্বেও বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফর কেন ১০ মে থেকে ১ অক্টোবর ১৮৫৭ কোম্পানির বিরুদ্ধে অস্ত্রাগারে কর্মরত ইংরেজ সৈন্য ও অফিসারের বিরুদ্ধে সিপাহিদের উস্কানি দেবেন? তাই পেনশনও পাননি মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর মোট পাঁচ মাস।
বল্লমধারী নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা তিনটি গাড়ি এভাবে পথ চলতে চলতে যখন কানপুর এসে গেল, বাষ্পীয় ইঞ্জিনে টানা রেলগাড়ি দেখে বন্দি সম্রাট সহ সকলে বিস্মিত। প্ল্যাটফর্মে ইংরেজরা বাজাচ্ছে ব্যান্ড পার্টি। অদ্ভুত আওয়াজ করতে করতে ট্রেন পৌঁছল ইলাহাবাদ। চারদিকে ছড়িয়ে আছে সংঘর্ষের চিহ্ন। অনেক আগেই ইলাহাবাদ দুর্গ চলে গিয়েছে কোম্পানির দখলে। তাঁদের নিরাপত্তা আধিকারিক লেফটেন্যান্ট ওমানিকে বন্দি সম্রাট বলতে লাগলেন সমুদ্র দেখতে ও জাহাজে চড়তে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
দিল্লি ছেড়ে এসে বন্দি-মোগলরা খুব যে কষ্টে আছে, তা নয়। অনেকেই আনন্দে সময় কাটাচ্ছেন। পর্দার আড়ালে থাকা মহিলাগণ কথা বলছেন, হাসছেন।
আসলে মোগল-সংসারেও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল নানা অশান্তি। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ যখন ৬২ বছর বয়সে মসনদে বসেন, তখন তাঁর প্রধান পত্নী ছিলেন তাজমহল বেগম। তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা। তিন বছর পরে অর্থাৎ ৬৪ বছর বয়সে সম্রাট যখন ১৯ বছর বয়সি সুন্দরী জিনাত মহলকে বিয়ে করেন, ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দ্রুত সরে যেতে হয় তাজমহল বেগমকে। বাদশাহের মোট ৬০ জন পত্নী ও উপপত্নী থাকলেও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে ঝগড়া মূলত এই দুই বেগমের মধ্যে। এছাড়া জিনাত মহলের সঙ্গে তাঁর নিজ পুত্র জওয়ান বখ্তের কথা কাটাকাটি তো লেগেই থাকত। কারণ জওয়ান বখ্ত হারেমে পিতা তথা সম্রাটের এক উপপত্নীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, তাছাড়া রক্ষীকে ঘুষ দিয়ে মদ এনে খেত, যা ইসলাম বিরুদ্ধ। সম্রাটের এক ভাইপোর সঙ্গেও ছিল তাজমহল বেগমের অবৈধ সম্পর্ক। সব মিলিয়ে গোলমাল লেগেই ছিল। নানা কারণে বহু উপপত্নী, কর্মচারীরা পছন্দ করত না তাজমহল বেগমকে। যদিও তিনি ছিলেন প্রতিভাময়ী। কিন্তু জিনাত মহল ছিলেন বাদশাহের প্রতি বরাবর আন্তরিক এবং আমৃত্যু সঙ্গিনী। কিন্তু নির্বাসন যাত্রাকালে সবাই চুপচাপ বরং সময়কে উপভোগ করছেন হালকা চালে। কিন্তু বন্দিশিবিরের কেউ জানেন না ঠিক কোন জায়গায় হচ্ছে তাঁদের নির্বাসন। বন্দি বাদশাহ শুনেছেন মাত্র নির্বাসন হতে পারে বার্মা, আন্দামান বা আফ্রিকার কোনো জায়গায়। ইতিমধ্যে দিল্লির সঙ্গে কলকাতার চিঠি চালাচালি হয়েছে অনেক কিন্তু স্থির হয়নি জায়গা। ইলাহাবাদে ছিলেন লর্ড ক্যানিং। তিনিই ঠিক করলেন ব্রহ্মদেশের রেঙ্গুনে হবে তাঁদের নির্বাসন। বন্দিশিবিরে ছিলেন মোট ৩১ জন মোগল খানদানি। তাঁদের মধ্যে তাজমহল বেগম-সহ মোট ১৬ জন বাদশাহর সঙ্গে যেতে নারাজ। সবচেয়ে বড় কারণ বন্দিশিবিরে তাজমহল বেগমের নিজের কোনো সন্তান নেই। ১৬ জন ফিরে গেলেন দিল্লি। বন্দি বাদশাহ-সহ বাকি ১৫ জনের দলকে ১৮৫৮ সালের ১৬ নভেম্বর স্টিমার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জলপথে। গঙ্গার তীরে মির্জাপুর ও রামপুর দু’জায়গায় স্টিমার বদলানো হয়। উচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছেন রাজবন্দিরা। বৃদ্ধ বাদশাহও আনন্দিত কারণ এতো বড় জাহাজ আগে চড়েননি। গঙ্গায় এখনো নজরদারি চলছে বিদ্রোহীদের খোঁজে। তারই মধ্যে বেনারসের সুন্দর সুন্দর মন্দির ঘাট ও অন্যান্য দৃশ্য দেখাতে দেখাতে জাহাজ চলল ধীর গতিতে। ডায়মন্ড হারবার পৌঁছয় ৪ ডিসেম্বর। জাহাজ বদল হল আবার। এবার স্বয়ং ইংল্যান্ডের রানির যুদ্ধ জাহাজ ‘মাগারা’। এতদিন পাহারায় ছিল যে সেনাবাহিনী, ফিরে গেল দেশের রাজধানী কলকাতায়।
বন্দি বাদশাপত্নী জিনাত মহল পুত্র মির্জা জওয়ান বখ্ত, পুত্রবধূ শাহ্জমানি বেগম, নাতি আবুবকর প্রমুখদের নিয়ে দ্রুত উঠলেন যুদ্ধ জাহাজ ‘মাগারা’য়। একটানা পাঁচদিন চলার পর জাহাজ ঢোকে রেঙ্গুন নদীতে। দূর থেকেই দেখা গেল সোনায় মোড়া রেঙ্গুনের বিখ্যাত প্যাগোডা। জাহাজে তাঁদের দেখাশুনোর দায়িত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট ওমানি কিন্তু লর্ড ক্যানিং রেঙ্গুনে তাঁদের থাকার সকল বন্দোবস্ত করতে নির্দেশ দিলেন মেজর ফায়রেকে। কিন্তু বন্দি-বাদশারা সেখানে পৌঁছে দেখেন শুধুই অব্যবস্থা। দুটো ছোট ছোট ঘর এবং কয়েকটা তাঁবু। পরে অবশ্য বাদশাকে দেওয়া হয় একটি প্যাগোডা ধর্মী কাঠের বাড়ি। ওটাই কারাগার। দিনে রাতে পাহারা দিত পাঁচজন রক্ষী। স্বভাব কবি চাইলেন কালি কলম কাগজ। দেওয়া হল না, পাছে চিঠি লিখে পাঠান তাঁর দুঃখ দুর্দশার কথা জানিয়ে। শেষে দাঁত মাজার জন্য দেওয়া কাঠ কয়লা দিয়ে শায়েরি ও কবিতা লিখতেন দেওয়ালে। প্রথম দিকে প্রায়ই মনমরা থাকতেন। ঘর থেকেই সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, দেখতেন জাহাজের যাওয়া আসা। স্মৃতিচারণ করতেন কী থেকে কী হল, কোথায় থাকতেন কোথায় এলেন। মন খারাপ হলেও শরীর ভালো ছিল। কিন্তু ১৮৬২ সাল নাগাদ শরীর ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। প্রথমে জিভে ঘা, চিবোতে অসুবিধা হচ্ছিল।
বর্ষার শেষে এমন অবস্থা হল যে চামচে করে তরল খাবার খাইয়ে দিতে হতো। অবস্থা ভালো নয় বুঝে নিরাপত্তায় থাকা ক্যাপ্টেন নেলসন ডেভিস ডাক্তার ডাকলেন। ডাক্তারের অভিমত আর বেশিদিন বাঁচবেন না বাদশা। নিদারুণ কষ্টে দিনগুজরান করার ফলে শেষ হয়ে আসছিল জীবনীশক্তি। অবশেষে ৮৭ বছর বয়সে হিন্দুস্থানের শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের জীবনদীপ নিভে গেল ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর ভোর পাঁচটায়। সেইদিনই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। উপস্থিত ছিলেন তাঁর দুই পুত্র এবং কয়েকজন পরিচারক। পত্নী জিনাত মহল বা অন্য কোনো মহিলাকে আসতে দেওয়া হয়নি। সমাধিস্থল পরে ঘিরে দেওয়া হয় বাঁশের বেড়া দিয়ে, যাতে ঘাসে ঢাকা পড়ে গেলে সবাই ভুলে যায় যে, এখানেই শায়িত আছেন হিন্দুস্থানের শেষ মোগল সম্রাট। কিন্তু মৃত্যুর দিনই স্থানীয় মানুষরা বিষয়টা বুঝতে পেরে ভেতরে আসতে চেয়ে অনুমতি পাননি। রেঙ্গুনে বসবাসকারী মুসলিম সম্প্রদায় বাহাদুর শাহ জাফরকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁকে একজন সন্ত হিসেবে দেখতেন। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও বাদশাহের জন্য কখনো ভালো কিছু করে উঠতে পারেননি। প্রিয় পত্নী জিনাত মহল মারা যান ১৮৮২ সালে। তাঁর জীবদ্দশায় খুব চেষ্টা করেছিলেন বাদশাহের সমাধির ওপর যাতে একটি স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়। তখন না হলেও ১৯০৬ সাল নাগাদ ইংরেজ সরকারের টনক নড়ে এবং ১৯০৯ সালে রেঙ্গুনে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধির ওপর স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়।
সম্রাটের মৃত্যুর পর তাঁর প্রিয় পুত্র মির্জা জওয়ান বখ্ত আবিষ্কার করেন পিতার লেখা প্রচুর শায়েরি কবিতা এবং পূর্ব পুরুষদের নিয়ে স্মৃতি কথা। সম্রাটের আক্ষেপ ছিল প্রিয় পত্নী জিনাত মহলকে কাছে আসতে দেওয়া হত না বলে, এমনকি মৃত্যুর আগের মুহূর্তে প্রিয় পুত্র মির্জা জওয়ান বখ্তকে একবার শেষ দেখা দেখতে চেয়েও অনুমতি পাননি। সম্রাটের আরও বড় আক্ষেপ ছিল তাঁর সমাধি প্রিয় হিন্দুস্থানের মাটিতে হবে না জেনে। কারণ দিল্লির খানদানিতেই তাঁর জন্ম ১৭৭৫ সালে। কাঠের বাড়িতে থেকে জন্মভূমির প্রতি তাঁর টান ফুটে উঠত কবিতায়ঃ ‘দো গজ জমিন তো না মিলি হিন্দুস্থান মে…’
তবু উল্লেখ করার বিষয় যে, স্বাধীন ভারতের তিন তিনজন প্রধানমন্ত্রী যথাক্রমে প্রয়াত রাজীব গান্ধী, সস্ত্রীক ড. মনমোহন সিং এবং নরেন্দ্র মোদী মায়ানমার সফরকালে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। সেখানে রাখা মন্তব্য করার খাতায় রাজীব গান্ধী বাদশাহের আক্ষেপের সুরে সুর মিলিয়ে লিখেছেন: ‘দো গজ জমিন তো না মিলি হিন্দুস্থান মেঁ/ ফির তেরি কুরবানি সে উঠি আজাদি কি আওয়াজ/ বদ নসিব তু নেহি জাফর…’
‘হিন্দুস্থানের মাটিতে দু’গজ জমি মেলেনি ঠিক কথা, কিন্তু আপনার আত্মত্যাগের বিনিময়ে উঠেছিল স্বাধীনতার আওয়াজ। তাই আপনি আদৌ ভাগ্যহীন নন জাফর…।’