অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে ১৫ আগস্ট উপলক্ষে ঐতিহাসিক বার্তায় তিনি তাঁর পাঁচটি স্বপ্নের কথা প্রকাশ করেছিলেন। প্রথম স্বপ্ন—একটি স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ ভারত। দ্বিতীয়—এশিয়ার পুনরুত্থান এবং বিশ্বসভ্যতায় তার বৃহত্তর ভূমিকা। তৃতীয়—মানবজাতির জন্য একটি বিশ্বসংঘের প্রতিষ্ঠা। চতুর্থ—ভারতের আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বিশ্বব্যাপী প্রসার। পঞ্চম—মানবচেতনার এমন এক উচ্চতর স্তরে উত্তরণ, যেখানে মানুষের বহু পুরনো সমস্যা নতুনভাবে সমাধানের পথ খুঁজে পাবে। তিনি বলেছিলেন—স্বাধীনতা শেষ কথা নয়, স্বাধীনতা একটি বৃহত্তর যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ।
তবু সেই আনন্দের ভিতরেই ছিল এক গভীর অসম্পূর্ণতা। ব্রিটিশ ভারত স্বাধীন হলেও পন্ডিচেরি তখনও ফরাসি শাসনের অধীন। ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়েও পন্ডিচেরি তখন স্বাধীন ভারতের অংশ নয়। ফরাসি ভারতের অন্যান্য অঞ্চল—কারাইক্যাল, মাহে, ইয়ানাম এবং চন্দননগরও তখনও ফরাসি অধিকারে। তবু ১৫ আগস্ট পন্ডিচেরির রাস্তায় ভারতের পতাকা উড়েছিল। সকাল ও সন্ধ্যায় মিছিল বেরিয়েছিল। দেশাত্মবোধক গান গাওয়া হয়েছিল। কোথাও কোথাও ফরাসি ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্লোগানও উঠেছিল। স্বাধীনতার ঢেউ এসে পৌঁছেছিল ফরাসি ভারতের বুকেও।
শ্রীঅরবিন্দ (Sri Aurobindo) আশ্রমও সেই আবহ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। পন্ডিচেরিতে তখন আটা ও রুটির অভাব অত্যন্ত প্রকট। আশ্রম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে আপ্যায়নের জন্য বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করেছিল। ব্রিটিশ কনসাল জেনারেল পরে আশ্রমকে ধন্যবাদ জানিয়ে এই সাহায্যকে স্বাধীন ভারতের উদ্দেশে একটি উপহার হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এর মধ্যে যেন নিঃশব্দে প্রকাশ পেয়েছিল আশ্রমের ভারতীয় স্বাধীনতার সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক। কিন্তু ১৫ আগস্টের পন্ডিচেরির গল্প এখানেই শেষ নয়। বরং দিনের আলো যখন ক্রমশ ম্লান হয়ে এল, ইতিহাস তখন তার মুখ ঘুরিয়ে নিল এক নির্মম অন্ধকারের দিকে।
সন্ধ্যার দিকে আশ্রমের পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে কিছু স্থানীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে আশ্রমের বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধ সেদিন হিংসাত্মক রূপ নেয়। আশ্রমের দিকে পাথর ছোড়া হয়। কয়েকজন আশ্রমবাসী আহত হন। উৎসবের আলোয় যে দিনটি শুরু হয়েছিল, সন্ধ্যার অন্ধকারে সেই দিনটিতে লেগেছিল রক্তের দাগ। ঘটে মুলশঙ্করের হত্যাকাণ্ড।
মুলশঙ্কর ছিলেন শ্রীঅরবিন্দের (Sri Aurobindo) ঘনিষ্ঠ সেবকদের একজন। গুজরাতের এই যুবক ত্রিশের দশক থেকে আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত, শ্রীঅরবিন্দের (Sri Aurobindo) সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। ১৫ আগস্টের সন্ধ্যায় তিনি আশ্রমের বাইরে গিয়েছিলেন। ফিরে আসার পথে তিনি দাঙ্গাকারী দুষ্কৃতীদের হামলার শিকার হন। গলার কাছে গভীর ছুরির আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন।
চন্দ্রকান্ত প্যাটেলের স্মৃতিচারণে সেই দৃশ্যটি আজও শিউরে ওঠার মতো। অন্ধকার রাস্তায় রক্তাক্ত মুলশঙ্কর সাহায্যের জন্য কাতর আর্তনাদ করছেন। কিন্তু তার ক্ষতবিক্ষত কন্ঠ দিয়ে এক অস্ফুট গোঙানির স্বর | তাঁকে আশ্রমের ভিতরে নিয়ে আসা হয়। রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা চলে। পরে শ্রীমায়ের গাড়িতে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তাঁকে বাঁচানো যায়নি। ভারতের স্বাধীনতার প্রথম দিনেই শ্রীঅরবিন্দের আশ্রমের একজন ঘনিষ্ঠ সেবক রক্তাক্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।
খবরটি যখন শ্রীঅরবিন্দের (Sri Aurobindo) কাছে পৌঁছল, তাঁর ঘরে নেমে এল গভীর নীরবতা। নীরদবরণের স্মৃতিচারণে জানা যায়, সংবাদটি শোনার পর শ্রীঅরবিন্দ শান্তভাবে বসে ছিলেন; তাঁর মুখে ফুটে উঠেছিল এমন এক গম্ভীর ও বিষণ্ণ অভিব্যক্তি, যা তাঁর সঙ্গীরা আগে খুব কমই দেখেছিলেন। বাইরে তখন স্বাধীনতার উল্লাস। কোথাও পতাকা, কোথাও গান, কোথাও মানুষের মিছিল। আর সেই একই সময়ে শ্রীঅরবিন্দের ঘরে এক প্রিয় সহচরের মৃত্যুসংবাদ। এই বৈপরীত্যই ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টকে ইতিহাসের এক অসামান্য দিনে পরিণত করেছে।
ঘটনার কয়েক দিন পর আশ্রমে ‘সত্যাগ্রহ’ চলছিল বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দেওয়ার একটা প্রয়াস সাম্রাজ্যবাদী শক্তি করেছিল এই আশ্রমের প্রতি | সেই মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হয় ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় শ্রীঅরবিন্দের নির্দেশে তার প্রতিবাদ করা হয়। ২০ আগস্ট নলিনীকান্ত গুপ্ত পত্রিকার সম্পাদককে প্রতিবাদ-স্বরূপ জানান, সেখানে কোনো সত্যাগ্রহ হয়নি।
১৫ আগস্ট দর্শন শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে আশ্রমে দাঙ্গাকারী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আক্রমণ হয়েছিল; একজন সদস্য নিহত, অন্যরা আহত এবং আশ্রমের ভবনগুলিতে পাথর ছোড়া হয়েছিল। আশ্রমের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছিল, আশ্রম একটি অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং ঘটনাটিকে রাজনৈতিক সত্যাগ্রহ হিসেবে দেখানোর কোনো বাস্তবসম্মত ভিত্তি নেই।
শ্রীঅরবিন্দের (Sri Aurobindo) অবস্থান ছিল অত্যন্ত সংযত। পন্ডিচেরির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে উত্তেজক ভূমিকা নিতে চাননি। কারণ তিনি জানতেন, তাঁর বক্তব্যকে নানা রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা সম্পর্কে তাঁর অবস্থানে কোনো দ্বিধা ছিল না।
ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার কথা তিনি বলেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন সেই দাবি ছিল অত্যন্ত সাহসী। ১৯৪২ সালে ক্রিপস মিশনের সময়ও তিনি ভারতীয় নেতাদের প্রস্তাবটি গ্রহণের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তাঁর কাছে ভারতের স্বাধীনতা ছিল কেবল রাজনৈতিক মুক্তি নয়—ভারতের বৃহত্তর ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক কর্মের অপরিহার্য পূর্বশর্ত।
তাই ১৫ আগস্ট ১৯৪৭-এর বার্তায় তাঁর কণ্ঠে ছিল না কোনো সংকীর্ণ রাজনৈতিক উল্লাস। ছিল এক সুদূরপ্রসারী প্রত্যয়। ভারত স্বাধীন হয়েছে—এবার তাকে তার বৃহত্তর কাজের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
সেই কারণেই তাঁর পাঁচটি স্বপ্ন আজও এত তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীন ভারত তাঁর কাছে ছিল এমন একটি দেশ, যা নিজের আত্মাকে আবিষ্কার করবে, ঐক্য ফিরে পাবে, এশিয়ার পুনর্জাগরণে ভূমিকা নেবে এবং মানবসভ্যতার বৃহত্তর বিবর্তনে অবদান রাখবে।কিন্তু সেই স্বপ্নের দিনেই তাঁর আশ্রমে একজন সেবককে হত্যা করা হল।
ইতিহাসের এই বৈপরীত্য আমাদের থমকে দেয়। স্বাধীনতা এল, কিন্তু বিভাজনের ক্ষত নিয়ে। নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হল, কিন্তু চারদিকে রক্তপাত, অপূর্ণতা, অপ্রাপ্তি এবং দাঙ্গার পরিবেশ । এ কেমন স্বাধীনতা? এই স্বাধীনতা কি কাঙ্ক্ষিত ছিল বিপ্লবী ভারতের পক্ষে? আর পন্ডিচেরিতে, যেখানে ভারতের স্বাধীনতার অন্যতম প্রাচীন স্বপ্নদ্রষ্টা তাঁর জীবনের শেষ পর্ব কাটাচ্ছেন, সেখানেও স্বাধীনতার প্রথম দিনটি শেষ হল এক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে! তবু অখণ্ড ভারতের স্বপ্নে ধীর-স্থির, আশাবাদী ছিলেন শ্রীঅরবিন্দ! অস্থিরতার মধ্যেও ভবিষ্যৎকে দেখতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে ইতিহাসের বিপর্যয় কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়; মানুষের এবং জাতির বিবর্তনের পথে অন্ধকারও কখনও কখনও বৃহত্তর পরিবর্তনের পূর্বভূমিকা হয়ে ওঠে।
তাই ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট শ্রীঅরবিন্দের (Sri Aurobindo) জীবনে কেবলমাত্র তার জন্মদিন নয়, শুধু স্বাধীনতার দিনও নয়। এটি ছিল স্বপ্ন ও বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর দিন। সকালে আশ্রমে ছিল উৎসবের আলো। ভারতের স্বাধীনতার জন্য ছিল আনন্দ। আর সন্ধ্যায় বিষাদগ্রস্ততা সেই আলোর মধ্যেই নামিয়ে এনেছিল কালরাত্রির ছায়া।