ফেব্রুয়ারি, ঝরাপাতা আর এক নারী

রাজেশ কুমার

তারপর বিস্তীর্ণ ঊষর প্রান্তরে সেই এক নির্জন ক্যাফে আসে। চারধারে হু-হু হাওয়া। বহুদূরে টিলা পাহাড়ের মাথায় বেড়ে ওঠা বুনো ঘাস, ঝোড়ো হাওয়ায় হেলে পড়া। ছোট ছোট পাথরের স্তূপ, আদিগন্ত বিস্তৃত। লাইকেন, ছোট ছোট ঝোপফুল। চাপ চাপ ধূসরতা, ছেঁড়া পাণ্ডুলিপি যেন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ফেব্রুয়ারি এলে গিয়ে দাঁড়াই সে-সবের মাঝে। সেই এক ফেলে আসা সভ্যতার খোঁজে যাওয়া প্রাচীন মানুষের মতো কিংবা কোনও বৌদ্ধ ভিক্ষু পুরনো পুঁথির খোঁজে। দিগভ্রষ্ট হাওয়ায় হঠাৎ খুলে যায় দরজা। ভিতর থেকে এসে দাঁড়াও তুমি, সেই প্রথম দিনকার মতো। কাঁচা কামরাঙা পোশাকে। গভীর, গোপন চোখে। যেন পৃথিবীর শেষ ফুয়েল স্টেশন, ক্লান্তিকর ভ্রমণের শুরুতে এক বাধ্যতামূলক অবসর।

ফেব্রুয়ারির কমে আসা শীত ঘিরে থাকে তোমায়। ভিতের নীচে অদৃশ্য বরফ, উঠে আসে হিমাঙ্কের ওপরে। কলকল শব্দ অস্পষ্ট, মাথার ভেতর বিন্দু বিন্দু গড়িয়ে চলা। অন্য মাসে বলি স্মৃতি। এড়িয়ে যাই, ব্যস্ত রাখি নিজেকে ঘষা কাচের মধ্যে দিয়ে আসা মাথা-মুণ্ডুহীন স্বপ্নের মতো। এই মাসে নির্দিষ্ট হয়ে ওঠে তা। এইখানে এসে— এক নারী, একটুখানি সময় আর কিছুটা ক্ষত। স্পষ্ট হয়ে ওঠে কুড়িয়ে পাওয়া দূরবীনের মতো।
তুমি হাত বাড়িয়ে ডাকো। বলো, আমার সঙ্গে এসো। বসো, কথা বলো খানিক। অনেক দিন কিছু বলো না। শুধু চেয়ে থাকো সেই এক সবুজ বিন্দুর মতো। সেই এক গভীর নিস্তব্ধতার মাঝে সম্পৃক্ত স্থিতিতে। মেঘের মতো একরাশ সাদা ধোঁয়া বেরিয়ে আসে নির্জন সেই ক্যাফের ভেতর থেকে। এক অন্ধ বেড়াল, এক চলমান অভ্যাসের মতো আমি ঢুকে আসি সেই ঘোলাটে ক্যাফের পেটের ভেতর। কোনার দিকের চেয়ারে গিয়ে বসি, যেখানে বসতাম তুমি-আমি। অভ্যাস আসলে এক প্রদীপের রাক্ষস। আমাদেরই ইচ্ছায় যে দাসত্ব করায় আমাদের। না হলে পথ ভুলে বারবার একই মোড়ের মাথায় এসে দাঁড়াই কেন! যে কোনও মহানগর ছেড়ে আসার তো অনেক রাস্তা। মানুষের মস্তিষ্কের মতো জটিল আবার অ্যামিবার গঠনের মতো সহজ সরল।


তবু কেন প্রতিবার চলমান নক্ষত্রের মতো সেই রাস্তাই ধরা দেয় আমায়, যা শেষ হয়েছে ঠিক তোমার পায়ের কাছে এসে। কেন এখনও বিকেল গড়িয়ে এলে আলো জ্বলে ওঠা সন্ধ্যায় কোনও কফির দোকানে ঢুকলে হঠাৎ মনে হয়, তুমি হয়তো এভাবেই আসবে। এসে বসবে আমার ঠিক সামনের চেয়ারটায়। দু-হাত টেবিলে রেখে খানিক ঝুঁকে বলবে, রাগ করে না লক্ষ্মীটি। কেন মনে হয় তুমি ঠিক এভাবেই আসবে আমার কল্পনায় যেভাবে আসো ফেব্রুয়ারি মাস এলে। অস্তমিত সূর্যের রঙে, কফির গন্ধে, আর গোপনীয়তায় ঘেরা ফ্রস্টেড গ্লাসে। আসো না। তবুও চেয়ারটা খালি রাখতে বলি ওয়েটারকে ডেকে। বোঝাই এই শহরে অনেক খালি চেয়ার আছে, উদ্যানে, সিনেমা হলে, ভরা সন্ধের পাবে। কিন্তু এটা আসলে শূন্য। শূন্য মানে মূল্যহীন নয়। এক সীমাহীন মূল্য যোগের অপেক্ষা। ওয়েটার তোমায় কখনও দেখেনি। স্মৃতিকে কে আর দেখতে পায় কবে! তাই সে বোঝে না খালি আর শূন্য এক জিনিস নয়। বারবার আমায় ফিরে আসতে হয় ওইসব কফির দোকান থেকে। আবার ফিরেও যেতে হয় তাদেরই কাছে বারবার তোমার কথা বলার জন্য। বোঝাতে হয় তুমি আসলে কোনও নারী নও। প্রকৃতির এক অপার রহস্য। তোমার না থাকাও আসলে প্রবলভাবে থেকে যাওয়া এই শহরের আকাশে, বাতাসে, সন্ধের কফি শপের আবহে।

তুমি হেসে ওঠো। বলো, ও মা, এই সামান্য ধাঁধাও বোঝ না! এটাই তো সেই নিয়তি। শেষ পর্যন্ত যা তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে। দু’জনে গিয়ে দাঁড়াব প্রার্থনা গৃহে, সেই এক কনফেশন বক্সের সামনে। অনেকক্ষণ কথা বলব না কোনও। তারপর স্বীকার করব, যার যার অপরাধ একে অপরকে সাক্ষী রেখে। তুমি বুকের মধ্যে টেনে নেবে আমার হাত। বলবে, এতোদিন কোথায় ছিলে!

আমি বলি, অপরাধ! সেসব তো খেয়াল নেই আর। রাস্তার নামের মতো বদলে গেছে সবকিছু। ফুটপাথ নতুন হয়েছে। রেলিং বসেছে এক পাশে। নতুন নতুন অ্যাপার্টমেন্ট, কাটা পড়েছে সেই গাছ, যার ঝরা পাতার উপর একদিন হেঁটে গিয়েছিলাম আমরা। শুধু মনে আছে আমি চেয়ে থাকতাম তোমার পায়ের দিকে। তুমি হেঁটে গেলে শব্দ উঠতো পড়ে থাকা সেইসব পাতায়। খেয়াল করতাম আমি। খেয়াল করতাম উঁচু নীচু, কোথায় শেষ হচ্ছে ফুটপাথ। তখন প্রেম ছিল না। এখন বুঝি, ওই খেয়াল করাটাই আসলে প্রেম। শাড়ির যে আঁচল লুটিয়ে পড়ত তোমার রাস্তায়, তা কুড়িয়ে নেওয়াই ছিল ভালোবাসা।

তুমি হাসতে। বলো, কী অদ্ভুত ছিলাম আমি! কিশোর ছেলের মতো সেই এক অবাস্তবের দুনিয়ায়। মাথার ভেতর যেন ঘনঘন পরিবর্তন করে যেত দৃশ্যপট। চোখ খুলতাম তো তোমাকেই দেখতাম। চোখ বন্ধ করতাম, তোমাকেই দেখতে পেতাম। সাইকোপ্যাথ প্রেমিকের মতো সেই এক উথাল পাথাল অনুভূতি। চোরা স্রোত, থেকে থেকে আঁকড়ে ধরার প্রচেষ্টা। যেন ভালোবাসা মানে শুধু ছুঁয়ে থাকা। হাত ছেড়ে গেলে সব শেষ। অহেতুক ছলছল করে উঠত চোখ। সেইসব বিকেলগুলোয় যখন তুমি থাকতে না, কেমন যেন জ্বর আসত মাছধরা নৌকোর ঘরে ফেরার মতো। অস্থির করে তুলত ভেতর-ঘর, কিন্তু বাইরে স্থির, স্নিগ্ধ। কপালে এইমাত্র এঁকে দেওয়া চুমুর দাগের মতো। কিংবা কোনও বোবা পাখির মতো সন্ধের অন্ধকারে অচেনা ছাদের কার্নিসে আশ্রয় নিত যে। ওদিকে ভাটার টানে ভেসে যেত ফুল, বেলপাতা। শহরের যত আবর্জনা। দূর থেকে ভেসে আসত মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি। সন্ধ্যারতির প্রদীপের আলো।

ফেব্রুয়ারির বিকেলগুলো খুবই নির্দিষ্ট ছিল আমাদের জন্য। অন্যরা ফুল কিনত, প্রিন্সেপ ঘাটে নৌকোভ্রমণ করত। কেউ কেউ হয়ত ছবি তুলত ভিক্টোরিয়ায়। আমরা তখন কফি খেতাম। মুখোমুখি বসে গল্প করতাম কোনও রেস্তোরাঁয়। মেনু কার্ড দেখতাম দু’জনে ঝুঁকে পড়ে। ঝগড়া করতাম আমিষ, নিরামিষ নিয়ে। হয়তো অর্ডার দিতাম কোনও স্পেশাল ডিস। কাটাকুটি খেলতাম কাঁটা চামচ নিয়ে। মেয়োনিজে ডুবিয়ে তুমি হয়তো মুখে তুলে দিতে কাঁটায় ধরা ফ্রায়েড মোমোর টুকরো। উঠে যাওয়ার সময় ওয়েটারের জন্য ছেড়ে যেতে টিপস। ফেব্রুয়ারির সেইসব বিকেলগুলো আজও অপ্রস্তুত করে আমাকে। কফি মগের গায়ে আজও খুঁজে বেড়াই তোমার ঠোঁটের চিহ্ন, পরিচিত লিপস্টিকের দাগ। সেইসব উষ্ণতা টেবিলের ধোঁয়াওঠা খাদ্য বা পানীয় থেকে, যা লেগে থাকত আমার চোখে, ঠোঁটে, গলায়।

জানি, এইসব কথা আর কোনও অভিঘাত সৃষ্টি করে না। কথাদেরও এক্সপায়ারি ডেট থাকে। তামাদি হয়ে যাওয়া, অনেকটা বেতো ঘোড়ার মতোই। হেঁটে, চলে বেড়ায় ওই পর্যন্ত। কিংবা অবহেলায়, অবচেতনে ঝরে পড়া সেইসব পাতাদের মতো যাদের সামনে হাঁটু মুড়ে বসি। কথা বলি আনমনা। হয়তো বা আলগোছে তুলে নিই হাতে। যাদের কথা কবিতায় লিখে যাই আজন্ম। তুমি হেসেছিলে একদিন ঝরাপাতার উপমায়। সেই সব ঝরাপাতা, যা পার হয়ে যেতে অক্লেশে, নির্বিকার মুখে, দ্রুত রাস্তা পার হয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে। বলতে— গাছেরও ক্লান্তি হয়। তারা পাতা ঝরায়। ঝেড়ে ফেলে জমানো তিক্ততা, অপারগতা। তারপর নতুন করে সাজায় নিজেকে। ভেবেছিলাম এও তোমার জন্মগত এক খামখেয়ালিপনা। শুধু কথা বলার নেশায় বলে যাওয়া একঘেয়ে মনোলগ। খেয়াল করিনি তাই, খুঁজে দেখিনি কথার ভাঁজে লুকানো কথা। এখন বুঝি, সম্পর্ক আসলে মানুষেরই মতো। দু’জনেই ক্লান্ত হয়। পাতা ঝরায়। যেমনটা ঝরেছিল আমাদের। ধীরে ধীরে, সবার অলক্ষ্যে। হয়তো আমাদের নিজেদেরও চোখের আড়ালে। তাই চিৎকার করে উঠিনি কেউ। শব্দ হয়েছিল কি! দূরে কোথাও জাহাজের নোঙর ওঠানোর! কিম্বা ঘুমের ভেতর মালগাড়ি সান্টিংয়ের! আজ আর মনে পড়ে না তেমন। ধীরে ধীরে কুয়াশার এক হালকা পরত নামে। তোমার আমার ভেতর যে বিস্তীর্ণ ঊষর নীরবতা ঘিরে ধরে তাকে। ঝিঁঝি ডাকে রাতের অন্ধকারে। বহু দিন যেন কেউ খোঁজখবর নেয়নি তাদের।

অথচ কী আশ্চর্য! এই ফেব্রুয়ারিই হয়ে ওঠার কথা ছিল কোলাহলপূর্ণ। সানবাঁধানো ঘাটে নদীর জলের ছলাৎ ছল শব্দ। ভাষাশহিদের মাস। শুধু তোমার আমার ভাষায় কথা বলবে বলে প্রাণ দিয়েছিল কতজনে। আর আমরা এসে থেমেছিলাম ঠিক এই মাসেই। বেছে নিয়েছিলাম অদ্ভুত এক ক্যাথারসিস, শীতের রাতে ক্রমশ মিলিয়ে যেতে থাকা এক অস্ফূট গানের কলি। মেলানকলি ছিল কি! তুমি কখনও বলোনি, থেকে যাবো। আবার চলে যাবে জানাওনি সেকথাও। তুমি শুধু ছিলে, কোন দূর দেশ থেকে আসা এক অতিথির মতো। তারপর ফিরে গিয়েছিলে, কে জানে কোথায়! তোমার চলে যাওয়া স্মরণে নেই আমার, তবুও হঠাৎ মুখ তুলে লেখার টেবিলে অনুপস্থিতিটাই টের পাই শুধু। খোলা জানালায়, আলো নিভে আসা শহরে ডানা ঝাপটায় এক রাতচরা পাখি। যেন বলে যায় আজীবন শুধু তোমার কথাই লিখে যেতে।

এই যে ডেক্সটপ, যার সামনে বসে থাকি আমি, গালে হাত দিয়ে ভাবি, অনেকক্ষণ পর পর হয়তো লিখে রাখি এক একটা শব্দ, সিগারেট খাই ঘনঘন, সে-ও আসলে জানে কত কিছু লেখা হয় না আজও। কত শব্দ আছে, কত দৃশ্য মুছে ফেলতে হয় বারবার লিখেও। তুলে রাখতে হয় সেই না-লেখা চিঠির মতো বহু যুগ ধরে, যা পড়ে থাকে আলমারির কোনও গোপন কোণে কিংবা অনেক দিন না-খোলা ড্রয়ারের অন্ধকারে। মাঝে মাঝে ভাবি কী হবে সেসব দলিল দস্তাবেজের মতো আঁকড়ে থেকে! তুমি কি আদৌ আসবে! খুঁজে দেখবে! হাত বুলিয়ে তাদের জীবন্ত করে তুলবে আবার! আদর করবে বালিশে লেগে থাকা সেই চুলের গন্ধের মতো। নিজে হাতে লিখে দেবে ঠিকানা! নাকি চুপ করেই ফিরে যাবে আবার, প্রতিসারিত জল যেভাবে ফিরে যায় তার নিজের জায়গায়, কোনও বস্তু ডুবে যাওয়ার পর। নিশ্চুপে, সবার অলক্ষ্যে।

উত্তর পাই না। তবুও অপেক্ষায় থাকি ফেব্রুয়ারি এলে। ধীরে হাঁটি, রাস্তা পার হই দেখেশুনে। অফিস ঢুকি, ফোন দেখি। যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। লক্ষ্য করছে দূর থেকে। যেন বলছে, তাড়াহুড়ো কোরো না। তোমার তো পৌঁছনোর নেই কোথাও। স্মৃতির মধ্যে হেঁটে গেলে গন্তব্য থাকে না মানুষের। ঘড়ির কাঁটার থাকে না নির্দিষ্ট অভিমুখ। তাই ব্যস্ততা তোমায় মানায় না। স্মৃতির শহরে ব্যস্ততা বলে কিছু হয় না আসলে। ঘরের ভেতর বন্ধ কাচের খড়খড়ি দিয়ে ঝাপসা আলো আসে। আমি সেই আলো-আঁধারির মধ্যে গিয়ে দাঁড়াই। দেখতে পাই না কাউকে। শুধু মনে হয় কেউ একটা উপস্থিত আছে কোথাও। বড় স্পষ্ট হয়ে। আচ্ছা, এই উপস্থিতিটাই কি তুমি! নাকি সবই মনের ভুল আমার! হ্যালুসিনেশন, ইনসমনিয়া! আজকাল কত ওষুধই তো খেতে হয় রোজ। শখের অসুখের কি শেষ আছে মানুষের!

বুঝি না। তবে যত দিন যাচ্ছে স্পষ্ট হচ্ছে এই শহরেই মিশে রয়েছে তোমার ঘ্রাণ। নিঃশ্বাস, প্রশ্বাসের শব্দ। কাজহীন কোনও নিশ্চিন্ত দুপুরে একশো বছর পুরনো কোনও গাছের গুঁড়িতে কান পাতলেই শোনা যায়। অনুভব করা যায় তোমায়। প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যায় সবকিছু। বদলে যায় পৃথিবীর সব শহর। দোকান, বাজার, সিনেমা হল। আয়নার সামনে মানুষের মুখ। বদলায় না শুধু স্মৃতি। একরোখা, অবুঝ বাচ্চার মতো থেকে যায় তারা। ফেব্রুয়ারিতে হয়ে ওঠে আরও জেদি। হঠাৎ কোনও গন্ধে, হঠাৎ কোনও শব্দে সামনে এসে দাঁড়াও তুমি। কথা বলো না, শুধু দাঁড়িয়ে থাকো। তাকিয়ে থাকো আমার দিকে সেই এক অসম্পূর্ণ বিকেলের মতো। ঠান্ডা হয়ে আসে হাতে ধরা কফির কাপ। কোথায় যেন ঝরাপাতা ভাঙে নতুন প্রেমিক যুগল। বাতাসে ভেসে আসে তাদের কলরব। সন্ধে নামে, ঝপ করে জ্বলে ওঠে আলো। কে যেন মনে করিয়ে দেয় ঘরে ফেরার কথা। শহরের যানজট, ট্রাফিক সিগন্যাল গিলে খায় তোমার মুখ।

জানি, এই ফেব্রুয়ারিতে আর কিছুই ঠিক হবার নেই। স্মৃতিকে ভালোবাসা বলা মিথ্যে। ভুলে যাওয়া আরও বড় মিথ্যে। আমি আটকে থাকি দু’য়ের মাঝামাঝি। আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকি ঘাসের ওপর। সেই এক পোড়ামাটির ভাঙা পুতুলের মতো, যা কখনও জোড়াও লাগে না, আবার অস্বীকারও করতে পারে না নিজের অস্বিত্ব। জানি, আর কখনও ফেরা হবে না, সেই পুরনো ঠিকানায়। সিঁড়ি উঠে যাওয়া সেই গোপন ঘরের কাছে। তোমার আমার ফেলে আসা অলীক সংসারে। বিছানার সেই চাদর, ব্যবহার করা তোয়ালে, টিপের পাতা, ওষুধের স্ট্রিপ। ফেব্রুয়ারি থেকে যাবে এক অসম্পূর্ণ মাস হয়ে। কমতে কমতে একদিন চলে যাবে শীত। ঘনত্ব হারাতে হারাতে হারিয়ে যাবে কুয়াশারাও। রহমানের গানের সুরে সমুদ্রের সেই এক উত্তাল ঢেউয়ের মতো আর কখনই আছড়ে পড়বে না তুমি আমার বুকের ওপর এসে। ফিরেও যাবে না সমুদ্রতট থেকে সবটুকু বালি ধুয়ে মুছে নিয়ে। থেকে যাবে শুধু এক ইঙ্গিতময় তটরেখা হয়ে। আদরের চিহ্ন, যা আমাদের এঁকে দেওয়ার কথা ছিল এই শীতে, চিরকালের জন্য অপূর্ণই থেকে যাবে তা। ভেজা কফির গন্ধে মিশে যাবে পুরনো কাগজ, সেই সব সন্ধে আর আমাদের না রাখা কথাগুলো। কফি কাপের নীচে তলানিতে পড়ে থাকে যতটুকু তেতো আমরাও থেকে যাব ঠিক সেভাবেই।

ফেব্রুয়ারির শেষে শীত চলে যাবে পুরোপুরি। এ শহর হয়তো বিপ্লবের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠবে আবার। মানুষের অধিকার নিয়ে লেখা হবে নাটক, উপন্যাস। তৈরি হবে সিনেমা। রাতের অন্ধকারে হয়ত কেউ আবার লিখে যাবে দেওয়ালে দেওয়ালে ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’। দিনমান হুটারের শব্দ। আতঙ্ক আর আর্তনাদ। প্রকাশ্য রাস্তায় কালো কালির ওপর চলবে লাল কালির কাটাকুটি খেলা। আমাদের প্রেম নিয়ে কেউ বলবে না একটা কথাও। খরচ করবে না একটা শব্দও। থেকে যাবে শুধু ছোট ছোট কিছু স্মৃতি, একান্ত ব্যক্তিগত, ফেটে পড়া বট-ফলের মতো।

তুমি বলতে, পাতা ঝরার দৃশ্য সবচেয়ে সৎ। কোনও মিথ্যে নেই তাতে। ঝরলে ঝরে। অজুহাত নেই, অভিযোগ নেই। দায় নেই থেকে যাওয়ার। ফেব্রুয়ারির ঝরাপাতারা তাই আমাকে থামিয়ে দেয় আজও। মনে করিয়ে দেয় আমরাও তেমনই— শুধু একদিন নেই হয়ে গিয়েছি। মাঝে মাঝে ভাবি, আর একটু চেষ্টা করলে হতো। আরও কিছু লিখলে। কে যেন অযাচিত উপদেশ দেয়। বলে, সব গল্পের একই পরিণতি কি ভালো দেখায়! তার চেয়ে কিছু না লেখাই ভালো। তোমাকে মিস করি, এ-কথা বলা মানায় না আমাকে। আমি পেন খাতা নিয়ে বসি। মাথার ভেতর অসম্পূর্ণ, অব্যবহৃত সব শব্দ। খাম নেই, ঠিকানা নেই। কফির গন্ধই এখন কষ্ট দেয় সব থেকে বেশি।

ফেব্রুয়ারি আসলে ভালোবাসার মাস। মানুষ ভালোবাসে, উদ্‌যাপন করে। স্মৃতি উপদেশ মানে না। আমি বসে বসে তোমাকে না লেখা চিঠির কথা ভাবি। এই কয়েকটা দিন, থেকে যেতে চাই তোমার সঙ্গেই। কফির গন্ধে, ঝরা পাতায় আর না-বলা সমস্ত কথায়। হেঁটে যেতে চাই সেইসব রাস্তায়, সেইসব ঝরা পাতার ওপর দিয়ে। ফেব্রুয়ারি আসলে এক ব্যক্তিগত মাস। স্মৃতির মতো, তোমার আমার ছেড়ে যাওয়া সম্পর্কের মতো। লিখে যেতে চাই সেইসব ব্যক্তিগত কথা। আমাদের যৌথ যাপনের পরাকাষ্ঠা। অথচ কথা দিয়েছি একদিন, দেখো আজও লিখতে পারলাম না তোমার নাম।