বাঙালির চা চর্চা

সুস্মিতা মুখার্জি চট্টোপাধ্যায়

‘এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই’…. শীতের সকালে আদা দিয়ে চা আর চায়ের পেয়ালা হাতে বেদম রাজনৈতিক তর্কের সঙ্গে চায়ের কাপে ঝড়… চরম ব্যস্ততার যুগেও এগুলো এখনও বাঙালির খুব পছন্দের। সেদিন টিফিন টাইমে চা এলো। দারুণ লাগল কাপটা হাতে পেয়ে। কাগজের কাপ, আর তাতে লেখা ‘চা কী?’ তারপর বড় বড় করে লেখা ‘চা একটি অনুভূতি…’

তলায় লেখা ‘আনন্দে চা, কষ্টে চা, লাগলে চা, টেনশনে চা, ডেট-এ চা, ব্রেকআপে চা, চায়ের পরে চা।’ কথাগুলো পড়ে এত ভালো লাগল যে তখনই মনে হলো চা নিয়ে কিছু লিখি।


ট্রেনে ‘গরম চায়ে, চায়ে গরম’… আমাদের কাছে একটা খুব পরিচিত ডাক। এই মিষ্টি ডাক শুনলে বাঙালির মনটা চায়ের জন্য চা-চা তো করেই। অনেক সময়ই শখ করে একটু দামি পাতা কিনে এনে ভাবি, জল আগে, না পাতা আগে… কোনটা আগে দেব! মানে শুকনো পাতায় গরম জল ঢালব, না কি গরম জলে চা পাতা দেব? আসলে সত্যি কথা বলতে কী, চা যেন আমাদের জাগ্রত জীবনীশক্তির আধার। কিন্তু যে চা পান করতে বাঙালি এত ভালোবাসে, সেই চা পানের অভ্যাস কতটা পুরোনো? উচ্চকোটির সাহেবদের Low tea, আম সাহেবদের High tea বা টেস্ট ক্রিকেটের টি-ব্রেক ছাপিয়ে আমরা যে সকাল থেকে রাত, সবসময়কেই ‘চা-সময়’ বানিয়ে ফেললাম, তার পিছনে কারণ কী? মাত্র দুশো বছরের পুরানো একটা অভ্যাস এত তাড়াতাড়ি আমাদের জীবনে এভাবে জড়িয়ে গেল বা অলিখিত জাতীয় পানীয়ের মর্যাদা পেল কীভাবে? এর এক কথায় উত্তর, সুপরিকল্পিত বিজ্ঞাপন, প্রচার বা প্রোপাগান্ডা। লাগাতার প্রচার যে একটা জাতির খাদ্যাভ্যাস বদলে দিতে পারে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল চা।

ধীরে ধীরে চা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠল যে, ভারতের যেখানেই যান, পাবেন‌ চায়ের ঠেক। আঁতেল আলোচনা থেকে হাল্কা গসিপ, সব কিছুতেই আমাদের সঙ্গী চা। কোথাও আদ্রক চা, কোথাও কড়ক চা, কোথাও লাল চা, কোথাও সুলাইমনি চা, কাশ্মীরে গোলাপি রঙের নুন-চা, আর মুম্বাইয়ে কাটিং চা… কত ধরনের চা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি চা-প্রীতি বোধহয় কলকাতাবাসীর। এক কাপ চা ভাগ করে খাওয়ার যে অনাবিল আনন্দ তা কি আর বাঙালিকে শেখাতে হবে? রোজ আমার স্কুল থেকে ফেরার পথে চায়ের ঠেকে দাঁড়িয়ে চা না খেলে যেন‌ পুরো দিনটাই মাটি হয়ে গেল বলে মনে হয়। আমরা যে দোকানে রোজ চা খাই, চোখের সামনে সেই দাদা যখন এক হাতের মগ থেকে আর এক হাতের মগে চা ঢালেন, তখন প্রাণটা যেন সেই তরল পানীয়তে আটকে যায়। একটা ফোঁটাও চা বাইরে পড়ে না। তারপর ভাঁড়ে করে সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে গরম চায়ে চুমুক! আহা এই আনন্দ কি ভাষায় প্রকাশ করা যায়!

এই যে এত জনপ্রিয় চা, তা কিন্তু অত সহজে বাজার গরম করতে পারেনি। প্রথম দিকে চা মার্কেটিংয়ের জন্য বেছে নেওয়া হয় স্টেশনসহ বিভিন্ন লোকালয়। রেলস্টেশন, লঞ্চঘাটসহ পাবলিক প্লেসে বিজ্ঞাপন ফলক লিখে প্রচার শুরু হয়। সমাজে চা জনপ্রিয় করে তোলার জন্য দর্শনীয় স্থানগুলোতে বিভিন্ন স্লোগান সংবলিত বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো। বলতে গেলে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে চা পানের গুণকীর্তন করা হতো।

প্রাথমিক পর্যায়ে ভারতবর্ষে চায়ের বিপণন ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। ক্রেতাদের চা-মুখী করার জন্য কোম্পানিগুলোর নানারকম তৎপরতা ছিল উল্লেখ করার মতো। তারা এ কাজে বাহারি বিজ্ঞাপন ছাড়াও নানাবিধ বিনিয়োগের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের মানুষদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করত। তবে শুরুতে চরম প্রতিকূল পরিবেশেরও সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাদের। আজকের দিনের অপরিহার্য এই পানীয়কে ভারতবর্ষে ঢুকতে হয়েছিল অনেক বাধাবিঘ্ন ও ঝুটঝামেলা পার করে। ছোট ছোট দোকান খোলার জন্য নামমাত্র দামে, বাকিতে ও বিনামূল্যে চা সরবরাহ করেছে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো। ব্রিটিশরা প্রথমেই বুঝেছিল, এখানে চা-চাষকে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা যাবে না, যদি না এদেশের কাছে চায়ের মর্ম পৌঁছে দেওয়া যায়। আসাম চা কোম্পানি নামের প্রথম চা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর ইংরেজরা চা নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞাপনে নামে। বিশেষজ্ঞ দিয়ে তখনই প্রথম বের করা হয় চা পানের বিজ্ঞানসম্মত উপকারিতা। চমক দেওয়া ভাষা দিয়ে তৈরি করা হয় নানামুখী প্রচারপত্র। সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল এমন—
‘প্রাণশক্তি ও উৎসাহের উৎস এবং ম্যালেরিয়ানাশক— ভারতীয় চা। সারা দিনের কঠিন শারীরিক পরিশ্রম বা মাথার কাজের পর এক পেয়ালা ভালোভাবে তৈরি দেশি চা খেলেই শরীর সজীব ও মন প্রসন্ন হয়ে উঠবে। সকালবেলা নিয়ম করে অন্তত দুই পেয়ালা ভালো দেশি চা রোজ পান করুন, জড়তা দূর হয়ে যাবে— সারা দিন শরীর মজবুত থাকবে, আবার দিনের শেষে দুই পেয়ালা চা পান করবেন— সারা দিনের খাটুনির পর মধুর বিশ্রামের কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।’

কলকাতার চা-সংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণ ফুটপাত ও তার অলি-গলিতে মাটির ভাঁড়ে দাঁড়িয়ে চা খাওয়ার অসংখ্য দোকান। তাই কলকাতাকে বলা হয় ‘টি কোর্ট অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘টি ড্রিংকিং হাব’। কলকাতায় আছে অসংখ্য স্মৃতিবাহী চা খাওয়ার দোকান। এগুলি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পরিকল্পনার জায়গা, পুলিশ হানা দিত বারে বারে। সাহিত্য জগৎ, সিনেমা জগৎ ও নানান ক্ষেত্রের বিশিষ্টজনের আনাগোনা। ফলে চায়ের দামও উত্তরোত্তর বাড়তে লাগল। এখানে এসেছেন নজরুলের সঙ্গে সুভাষ চন্দ্র বসু, বিপ্লবী গণেশ ঘোষ, অম্বিকা চক্রবর্তী, লোকনাথ বল, ড. রামমোহন লোহিয়া, সাহিত্যিক নরেন্দ্র দেব ও রাধারানী দেবী প্রমুখ। কল্লোল যুগকে পূর্ণতা দিয়েছে এই কেবিন। বাগবাজারের গিরিশমঞ্চের বিপরীতে ১৩০ বছর পেরোনো হরেন্দ্রনাথ দত্ত টি স্টলের কথাও এই প্রসঙ্গে মনে আসছে। এরপরে আসি, রাসবিহারী এলাকায় ১০০ ছুঁই ছুঁই ‘‘বলবন্ত সিংহ’জ টি হাউস’’-এর কথা। এখানে বিখ্যাত পাঞ্জাব থেকে আনা চা রেসিপির কেশর চা। আসতেন পৃথ্বীরাজ কাপুর, রাজ কাপুর, কেএল সায়গল, চারু মজুমদার প্রমুখ। লেক মার্কেটের ৯০ বছরের পুরোনো স্বাধীনতা সংগ্রামী রাধানাথ দত্তের ‘রাধাবাবুর চা দোকান’। কানন দেবী, রাজ কাপুর, উত্তমকুমার হামেশাই আসতেন এখানে। ৭৫ বছরের পুরোনো মানিকতলার ‘রবিদার চা দোকান’ আর বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের জহুরি সিংয়ের ৩ টাকা ভাঁড়ের চায়ের টি স্টলের কথা। এছাড়াও শিয়ালদহের প্রাচী সিনেমার কাছে উপচে পড়া ভিড়ের চা দোকান ‘মা কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’; ওম পুরি, অপর্ণা সেন, গণেশ পাইন, ঋতুপর্ণ ঘোষদের প্রিয় ঢাকুরিয়ার দক্ষিণাপণে ‘ডলি’জ টি হাউস; ভবানীপুরে ছাগলের দুধ আর তেজপাতা মেশানো চায়ের দোকান ‘শর্মা টি হাউস’, মৃণাল সেন ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রিয় সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের ‘দিলীপ টি স্টল’ আর ৮বি বাস স্টপেজে ‘বৌদির চা দোকান’, দেশপ্রিয় পার্কে সৌরভ গাঙ্গুলির প্রিয় চা দোকান ‘মহারানী’।

যাইহোক, বাঙালি মনীষীদের মধ্যে অনেকেই ধীরে ধীরে চায়ের ভক্ত হয়ে ওঠেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, দীনেশচন্দ্র সেন, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখ। তাঁদের নানা লেখায় ও অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকদের স্মৃতিকথায় প্রকাশ পেয়েছে চায়ের প্রতি তাঁদের অনুরাগ।
রবীন্দ্রনাথ গিয়েছেন জাপানে। স্থানীয় ভক্ত, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে খোশমেজাজে চা খাচ্ছেন। সবাই নিজের নিজের কাপে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। ব্যতিক্রম শুধু কবিগুরু। কাপের চা প্লেটে ঢেলে খাচ্ছেন। একটু পরেই তাঁর দেখাদেখি সবাই তা-ই করতে শুরু করলেন। অপ্রস্তুত রবীন্দ্রনাথ বলতে বাধ্য হলেন, আমরা প্রাচীন ভারতীয়রা এভাবেই চা খাই। এ কথা একেবারে ঠিক, যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই চা বানানো যায়, আবার তা খাওয়াও যায়।
সেন্ট্রাল টি বোর্ডের চায়ের বিজ্ঞাপনে কবিগুরুর একাধিক কবিতা ব্যবহার করা হয়েছে। আর তা প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বভারতীয় পত্রিকার বেশ ক’টি সংখ্যায়। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষাভেদে কবিগুরুর নতুন নতুন কবিতা প্রকাশ পেয়েছে। তবে সেখানে টি বোর্ডের স্লোগান ছিল একটাই— ‘ঋতুচক্রের বিচিত্র উৎসব-মুহূর্তগুলোকে রঙে রসে মধুর করে তোলে।’ চা পানের বিচিত্র পদ্ধতি ছিল রবীন্দ্রনাথের। তিনি খানিকটা গরম জলে কয়েকটা চা পাতা ফেলে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দুধ মিশিয়ে খেয়ে নিতেন।

১৯২৪ সালে চীন ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী ছিলেন দোভাষী একজন নারী। এই বিদেশি বন্ধুর নামে তিনি শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সুসীম চা-চক্র’ মজলিস। ১৯২৮ সালে ‘সু-সী-মো’র শান্তিনিকেতন দর্শন উপলক্ষে গান রচনা করেন…
‘হায় হায় হায় দিন চলি যায়
চা-স্পৃহ চঞ্চল চাতকদল চলো চলো চলো হে।’
পরবর্তীকালে এই চা চক্রের আমন্ত্রণে আর একটি কবিতায় কবি অতিথিগণকে নিয়ে লেখেন।
‘চা-রস ঘন শ্রাবণ ধারা প্লাবন লোভাতুর
কলাসদনে চাতক ছিল ওরা।’

বাংলা সাহিত্যের নানা কবি, সাহিত্যিকের লেখায় আমরা তাঁদের চা-প্রিয়তার খবর পাই। জোড়াসাঁকোর গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে চা খেতে আসতেন বাংলার প্রথম ছোটোলাট লর্ড কারমাইকেল। ১৮৯৯-এর ২৮ জানুয়ারি পাথুরিয়াঘাটার যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের সিঁথির বাগানবাড়ি মরকতকুঞ্জে নিবেদিতার আহ্বানে চায়ের আড্ডায় প্রথম সাক্ষাৎ হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিবেকানন্দের। এছাড়াও ছিলেন ডা. মহেন্দ্র লাল সরকার, সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র বসু ও ড. প্রসন্ন কুমার রায়, সরলা ঘোষাল ও স্বর্ণকুমারী দেবী, মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায়। স্বর্ণকুমারী দেবীর বাড়িতে চায়ের আসরে আসতেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।‌

শংকরের লেখা ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’ গ্রন্থ থেকে স্বামী বিবেকানন্দের চা-প্রেমের খবর পাওয়া যায়। স্বামী সারদানন্দ ছিলেন চায়ের প্রবল ভক্ত। বিবেকানন্দ-ভ্রাতা মহেন্দ্রনাথ একবার সারদানন্দকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমি এতো চা খেতে শিখলে কোথা থেকে?’ স্বামী সারদানন্দের উত্তর ছিল: ‘তোমার ভাইয়ের পাল্লায় পড়ে। তোমাদের বাড়িতে যে চায়ের রেওয়াজ ছিল সেইটা বরাহনগর মঠে ঢুকিয়ে দিলে, আর আমাদের চা-খোর করে তুললে। তোমরা হচ্ছ একটা নার্কটিকের ফ্যামিলি।’ ঐতিহাসিক গৌতম ভদ্র স্বামী বিবেকানন্দের চা-প্রীতির একটি বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর লেখায়: ‘ক্ষমতা ও লোকনিন্দার থোড়াই কেয়ার করতেন বিবেকানন্দ, তাই ১৮৮৬

সালেই শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে পোড়ানোর রাতেই দরমা জ্বালিয়ে কেটলি করে চা খেয়েই তিনি ও তাঁর গুরুভাইরা রাত কাবার করেছেন। দারুণ অভাবেও বরাহনগরের মঠে স্বামীজি চা ছাড়েননি, অন্যদেরও ধরিয়েছেন। জেলা কোর্টে দাঁড়িয়ে হলফ করে চা খাওয়ার পক্ষে সওয়ালও করেছিলেন।’

মহেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিকথাতেও এসেছে এ সংশ্লিষ্ট তথ্য। তিনি লিখেছেন— ‘গুঁড়ো চা গরম জলে দিয়ে একটু কড়া করে নেয়, আর তাই ঢক ঢক করে খায়, দুধ চিনির তো নামই নাই। তাই বলে মাঝে মধ্যে যে চায়ের ভোল বদল হতো না, এমনটাও নয়— যেদিন যেদিন সুরেশবাবু বা মাস্টারমশাই দুধ ও চিনির জোগানদারের ভূমিকা নিতেন, সেদিন সেদিন লালিমা ঘুচিয়ে দুধসহ মিষ্টি চা খাওয়ার সৌভাগ্য হতো বিবেকানন্দসহ গুরুভাইদের।’ মঠে চা-টা শুরু থেকেই বেশ গুরুত্ব পেয়ে গেল। নেশার তলব থেকে নয়, অর্ধাহারী মঠবাসীদের খিদে মারার মহৌষধ হিসাবে।

কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ছিলেন চায়ের দারুণ ভক্ত। তাঁর কাছে চা ছিল— কষিত কাঞ্চন কায়া, সর্ব নিদ্রা নিবারণী, নিত্যানন্দদায়িনী। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় একবার এক জমিদারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি চা খান কিনা। না বোধক উত্তর আসায় তাঁর মন্তব্য ছিল, ‘কিন্তু তোমাকে তো ভদ্রলোকের মতোই দেখায়’! এরকম কবির দ্বারাই বোধকরি চা পানের স্তুতিগান করে লেখা সম্ভব এভাবে—
‘বিভব সম্পদ ধন নাহি চাই
যশ মান চাহি না
(শুধু) বিধি যেন প্রাতে উঠে পাই
ভালো এক পেয়ালা চা-চা-চা-চা।’
আবার তিনি লিখলেন…
‘সে আসে ধেয়ে, এনডি ঘোষের মেয়ে,
ধিনিক ধিনিক ধিনিক, চায়ের গন্ধ পেয়ে।’

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের চা পান সম্পর্কে হেমেন্দ্রকুমার রায় লিখেছেন— ‘কেবল কাঁড়ি কাঁড়ি পান নয়, আঠার-বিশ পেয়ালা চা না পেলে সিক্ত হতো না তার কণ্ঠদেশ!’ ‘ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়’ বইটিতে পল্লীকবি জসীমউদ্‌দীন কবি কাজী নজরুল ইসলামকে চা পান করানোর একটি মজার কাহিনি উল্লেখ করেছেন। সেবার ফরিদপুরে বঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় সমিতির একটি অধিবেশনে কবি নজরুল এসেছিলেন। কবির সম্মানে জসীমউদ্‌দীনের উদ্যোগে সেই রাতে গানের জলসা বসানো হয়। সেখানেই এই চা কাহিনির সৃষ্টি। জসীমউদ্‌দীনের ভাষায়, ‘রাত্রিবেলা এক মুস্কিলে পড়া গেল। চা না পাইয়া কবি অস্থির হইয়া উঠিলেন। এই পাড়াগাঁয়ে চা কোথায় পাইব? নদীর ওপারে গিয়া চা লইয়া আসিব, তাহারও উপায় নাই। রাত্রিকালে কে সাহস করিয়া এত বড় পদ্মা-নদী পাড়ি দিবে? তখন তিন-চার গ্রামে লোক পাঠানো হইল চায়ের অনুসন্ধানে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আলিম মাতব্বরের বাড়ি হইতে কয়েকটা চায়ের পাতা বাহির হইল। চা-পাতা দেখিয়া কবির তখন কী আনন্দ!’ চায়ে মুগ্ধ কবি নজরুল ‘চা-স্তোত্র’ নামে চায়ের স্তবগান রচনা করেছেন। চা নিয়ে বিরূপ মন্তব্যকারীদের প্রতিও কবির স্বভাবসুলভ ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে এখানে—
‘চায়ের পিয়াসি পিপাসিত চিত আমরা চাতক-দল
দেবতারা কন সোমরস যারে সে এই গরম জল।
চায়ের প্রসাদে চার্বাক ঋষি বাক-রণে হল পাশ,
চা নাহি পেয়ে চার-পেয়ে জীব চর্বণ করে ঘাস।’

দীনেশচন্দ্র সেন অধিক পরিমাণ চিনি মিশিয়ে চা পান করতেন। কেউ প্রশ্ন করলে বলতেন, চিনি খাব বলেই তো চা খাই!

চায়ের আর এক গুণগ্রাহী প্রমথ চৌধুরী এ সম্পর্কে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে লিখেছেন— ‘চা পান করলে নেশা না হোক, চা পানের নেশা হয়।’ একটা দীর্ঘ সময় ধরে চা পান নিয়ে বাঙালি মনীষীদের এই অনুরাগ-বিরাগ
চায়ের ইতিহাসকে আরও বৈচিত্র্যময় করেছে নিশ্চয়।

কিন্তু সবাই আবার চায়ের পক্ষে কথা বলেননি। ‘দেশ’ পত্রিকার তৃতীয় বর্ষ ৩ সংখ্যায় (৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত) আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের একটি কলাম প্রকাশিত হয়। লেখাটির শিরোনাম ছিল ‘চা-এর প্রচার ও দেশের সর্ব্বনাশ’। বেশ বড় আকারের প্রবন্ধে তিনি ব্রিটিশদের চা নিয়ে মাতামাতির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘শীত-প্রধান দেশে চা-পানের কিছু প্রয়োজন থাকিতে পারে সত্য, কিন্তু আমাদের উষ্ণ দেশে উহার কোনই সার্থকতা নাই। সাহেবরা যখন চা পান করে, তখন তাহার সঙ্গে অনেক কিছু পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী পেটে পড়ে, কিন্তু কলিকাতা, বোম্বাই প্রভৃতি নগরের স্বল্প বেতনভুক, শীর্ণ কেরাণী আহার্য্য ও পানীয়ের উভয়বিদ প্রয়োজনে চা পান দ্বারাই মিটাইয়া থাকেন। আপিসে আসিয়া ২/১ ঘণ্টা কাজে বসিতে না বসিতেই ইহারা চা-এর তৃষ্ণায় কাতর হন। কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে চা পান করিয়া ইঁহারা ক্ষণিকের জন্য কিঞ্চিত আরাম ও উত্তেজনা এবং স্ফূর্তি অনুভব করেন। আবার সেই একঘেয়ে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি— মধ্যে মধ্যে চা-এর পেয়ালায় চুমুক— ইহাই হইল কেরাণীর দৈনন্দিন জীবন। এই প্রকারে সারা দিনরাত প্রায় পাঁচ ছয় পেয়ালা চা। এই বদ অভ্যাসের পক্ষে তিনি এই যুক্তি দেখাইয়া থাকেন যে, উহাতে ক্ষুধা নষ্ট হয়, সুতরাং ব্যয়সাধ্য পুষ্টিকর আহার্য্যেও আর প্রয়োজন পড়ে না।’

সেকালের চায়ের বিপণন সম্পর্কে বলতে গিয়ে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় লিখেছেন— ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার সময়ে পরীক্ষার্থীদিগকে বিনা মূল্যে চা পান করাইবার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রে কেন্দ্রে তাঁবু ফেলা হইতে লাগিল। একজন ‘টি কমিশনার’ এতদর্থে নিযুক্ত হইলেন। ‘টি কমিশনার’ সুলভ মূল্য নহে, একবারে বিনা মূল্যে জনসাধারণকে ‘চা-খোর’ করিতে লাগিলেন। ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে ১৩৭টি শহরে চা-খানা স্থাপিত হইয়াছিল। বৎসরের শেষে উহা ৬৮৩টিতে পরিণত হয়।’

চা নিয়ে ইংরেজদের বিজ্ঞাপনী ভাষার সমালোচনা করে তিনি আরেক জায়গায় বলেন, ‘অতিরঞ্জন, অতিভাষণ ও মিথ্যাভাষণ উক্ত প্রচারকার্য্যের মূলমন্ত্র। ইউরোপে চায়ের বাজার মন্দা যাইতেছে, তাই সেখানকার মন্দা এতদ্দেশে উশুল করিবার জন্য টী অ্যাসোসিয়েশন জনসাধারণের মুখে চা-এর বিষপাত্র তুলিয়া ধরিতে মরিয়া হইয়া লাগিয়াছেন। ৫/৬ কোটি ভুখারী, দারিদ্র্য ও উপবাস তাহাদের নিত্যসঙ্গী, পেট ভরিয়া আহার কাহাকে বলে জানে না, কিন্তু তাহাতে কি যায় আসে? অর্থলোলুপ স্বার্থান্বেষী ধনিক ও বণিক সমাজ স্বকার্যসাধনে কোন জীন উপায় বা চাতুরীর আশ্রয় লইতে কুণ্ঠিত হয় না। মিথ্যা প্ররোচনায় মুগ্ধ করিয়া হতভাগ্যদিগকে ঊর্ণনাভের জালে জড়িত করিতেই ইহাদের উৎসাহের কমতি নাই।’

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় আরও বলেন, ‘মুষ্টিমেয় নির্মম ধনিকের লালসা-বহ্নি, তাহাতে পতঙ্গের ন্যায় আত্মাহুতি দিতেছে সাধারণ জনগণ।’ তৎকালীন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জন ফিসারের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘হুইস্কির বোতল কিংবা চায়ের পাত্র ইহাদের কোনটি যে অধিকতর মারাত্মক, তাহা নিশ্চিতরূপে বলা কঠিন।’
মাসিক ‘বসুমতী’ পত্রিকার ১৩৩৮ বঙ্গাব্দের ভাদ্র ও কার্তিক সংখ্যাতেও আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ‘চা-পান ও দেশের সর্ব্বনাশ’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লেখেন। তাঁর মতে, চা মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষতিসাধন করে এবং ক্ষুধা নষ্ট করে। নিজের ধারণার সপক্ষে তিনি একটি ব্যঙ্গচিত্রও আঁকেন। এ ব্যঙ্গচিত্রে দেখা যায়, একজন ‘পাক্কা চা-খোর’-এর করুণ চিত্র। এই পাক্কা চা-খোরের টেবিলে একটি বড় চায়ের পাত্র আর তার হাতে এক কাপ চা। তার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, পায়ে ছিন্ন জুতা, ছেঁড়াখোঁড়া পোশাক, আর চারদিকে ছড়ানো অসংখ্য সিগারেটের খোসা। সব মিলিয়ে চায়ের নেশায় অকেজো এক মানুষের প্রতিচ্ছবি। ‘চা-পান ও দেশের সর্ব্বনাশ’ প্রবন্ধের উপসংহারে তিনি লিখেছেন— ‘চা পান করিলে জাতিনাশ হইবে, এমন কথা আমি বলি না। পরিমিত চা পানে দেহের স্বাস্থ্য ভঙ্গ হইবে, এমন কথাও আমি বলিতেছি না। আমার বলিবার কথা এই যে, যদি বাঙালি সংযম ও নিয়মের অনুজ্ঞা মানিয়া প্রচুর সারবান ও পুষ্টিকর খাদ্যের সহিত সামান্য একটু চা দিবাভাগে একবার মাত্র পান করে, তাহা হইলে বিশেষ ক্ষতি হয় না। কিন্তু বাঙালি অপরিমিত চা পান করিতে অভ্যস্ত হইয়া আপনার সর্ব্বনাশ সাধন করিতেছে, ইহাই দেখাইয়া আমি সময় থাকিতে বাঙালীকে সতর্ক হইতে বলিতেছি।’ চা চাষের ফলে বাঙালি অর্থনীতি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেসব কথাও তিনি তাঁর লেখায় তুলে ধরেন। ফলে বাঙালিদের অনেকেই তখন চা-পানের বিরোধিতা করে। ব্রাহ্মসমাজের অনুগামীরা প্রায় সবাই চা পানের আসক্তির ঘোরবিরোধী ছিলেন।

চা নিয়ে মৌলানা আবুল কালাম আজাদের রয়েছে এক দীর্ঘ চিঠি; যা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ‘গুবার-এ-খাতির’-এ। তাঁর লেখা চিঠিগুলোর সংকলনের পুস্তক এটি। চা-সংক্রান্ত চিঠিটির একটা অংশে তিনি লিখেছেন— ‘চায়ের সুরুচি, উপাদেয়তা এবং মিষ্টত্বের সঙ্গে তামাকের উগ্র কটু স্বাদের সংমিশ্রণে আমি একরকম জটিল উত্তেজক প্রস্তুত করেছি। …আপনারা বলতে পারেন, এমনিতেই তো চা খাওয়া খুব একটা সু-অভ্যাস নয়, তার সঙ্গে আরও একটি আপত্তিকর বস্তু যোগ করার দরকারটা কী? চা ও সিগারেটের এ জটিল মিশ্রণটি যেন শয়তানের সঙ্গে শয়তানের মিলনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’

কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের অবস্থানও ছিল চা পানের বিপরীতে। ১ আশ্বিন, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে শ্রীগিরিজাকুমার বসু ও শ্রীসুনির্মল বসুর সম্পাদনায় ‘ছোটদের চয়নিকা’ শীর্ষক গ্রন্থে ‘রামসুক তেওয়ারী’ নামক তাঁর লেখা ছড়া প্রকাশ পেয়েছিল। এটি সেসময় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে।

১৬০০ সালের আশেপাশে ব্রিটিশরা যখন চা খেতে শিখল সেই সময় চা ছিল একটা আভিজাত্যের লক্ষণ। কেবলমাত্র ধনীরাই তা কিনতে পারত। ‘Agony of the Tea Leaves’ বলে একটা কথা আছে। চা গাছের মতনই এই প্রবাদটিও নাকি একটি চীনা আমদানি। গরম জল পেয়ে দোমড়ানো মোচড়ানো শুকনো পাতাগুলো যখন নিজেদের মেলে ধরে সেটাকেই বলে Agony of the Tea Leaves. কেউ কেউ আবার এটাকে Dance of The Tea Leaves বলেন।

১৯০৮ সালে Thomas Sullivan নামের এক আমেরিকান চা ব্যবসায়ী বিজ্ঞাপনের খরচ কমাতে টিনের বাক্সের বদলে সিল্কের পাউচের মুখে সুতো বেঁধে দিলেন। ব্যাস, আবিষ্কার হয়ে গেল টী-ব্যাগের!
Lu Wu তাঁর Cha Jing বা চা-সূত্র বইয়ে বলছেন:
‘tea made from mountain streams is best.’
এ কথা অনস্বীকার্য যে চীন দেশেই চা চাষ বা পানীয় হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়।‌

ভারতে চা পান ও বাণিজ্যিক ব্যবহার চীনের অনেক পরে। একসময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মী স্কটল্যান্ডের অধিবাসী মেজর রবার্ট ব্রুস ব্রিটিশ ভারতের একেবারে পূর্বপ্রান্তের ‘যোগীঘোপা’য় একটি ফ্যাক্টরির মালিক নতুন ব্যবসার প্রয়োজনে ঘুরে বেড়াতেন আসামের অভ্যন্তর এলাকায়। এখানেই রবার্ট ব্রুসের সঙ্গে আলাপ হয় মণিরাম দত্ত বড়ুয়া নামের অসমিয়া এক ভদ্রলোকের। রবার্ট ব্রুস মণিরামবাবুর কাছ থেকে আসামের শিবসাগর এলাকায় চায়ের ঝোপ জঙ্গলের কথা জানতে পেরে সেই এলাকা পরিদর্শন করলেন। রবার্ট ব্রুস প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে ভারতের আসামের জঙ্গলে চা গাছের অস্তিত্ব আবিষ্কার করলেন ১৮২৩-এ। মণিরাম দত্ত বড়ুয়া প্রথম ভারতীয়, যিনি প্রথম চা-চাষ করেছিলেন ভারতের আসামে।
যাইহোক, চা-শিল্পের ব্যাপক উন্নতিতে কলকাতার অবদান কম নয়। ভারতীয় চায়ের অধিকাংশ আমদানি রপ্তানি কলকাতা থেকেই। কলকাতাই ছিল চা বিক্রির প্রধান সাপ্তাহিক নিলাম কেন্দ্র। দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রচেষ্টায় কলকাতায় গড়ে উঠেছিল ‘বেঙ্গল টি অ্যাসোসিয়েশন’। চা ব্রোকারদের অধিকাংশ অফিস কলকাতায়।

চা-ব্রোকারস, ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল ‘দি ক্যালকাটা টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন’। এভাবেই ধীরে ধীরে চা পান সংস্কৃতি কলকাতা থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে। চীন ও জাপানের চা-আড্ডা আসরের মতোই কলকাতায় চা পার্টির আড্ডার প্রথম পার্টি দিয়েছিলেন মেরি কার্পেন্টার ১৮৬৬-তে। ১৯০৩-এ তৈরি হয়েছিল ‘Tea Cess Committee’. ১৯৩৭-এ তা বদলে হল ‘Indian Tea Market Expansion Board’. ১৯৫৩-য় আবার নতুন নামকরণ হল Tea Board of India, যার সদর দফতর এখনও কলকাতায়। চা-পন্থিদের তুলোধুনো, শত আপত্তি এবং নানা বিতর্ক সত্ত্বেও থেমে যায়নি কলকাতাবাসীর চা পান। নানাবিধ প্রতিকূলতার পরও চা-খ্যাতি বরং উত্তরোত্তর বেড়েছে, তা সে বিজ্ঞাপনের গুণেই হোক আর অন্য যে কোনো কারণেই হোক। আর এভাবেই চা হয়ে উঠেছে বাঙালির নিত্যসঙ্গী।