ইন্দ্রাণী বিশ্বাস মণ্ডল
কালজয়ী সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় যাঁদের কাহিনি পাঠকের কাছে বলেছেন, তাঁরা হলেন বীরভূম-বর্ধমান অর্থাৎ অন্ডাল রানিগঞ্জ অঞ্চলের কয়লাখনির সাঁওতাল কুলিমজুর। কয়লাখনির শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে শৈলজানন্দের আগে কেউ লেখেননি তা বলাই যায়। আচার্য সুকুমার সেন শৈলজানন্দের কাহিনির স্বাতন্ত্র্য বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘স্থান-কাল-ভাষা-পরিবেশের সৌষ্ঠব, যাহাকে ইংরেজিতে বলে ‘লোক্যাল কালার’, তাহা শৈলজানন্দের গল্পে পরিপূর্ণভাবে দেখা গেল। অথচ কাহিনির অত্যন্ত জৈবিক মানুষগুলি স্থান-কাল-পরিবেশের মধ্যে কোথাও খর্ব হইয়া হারাইয়া যায় নাই।’ স্বয়ং শৈলজানন্দের কথায়, ‘আমার গল্পের সর্বপ্রথম পরিমণ্ডল কয়লার খনি এবং চরিত্ররা সব সাঁওতাল কুলিমজুর।’
তাঁর গল্পের কাহিনি ও চরিত্রগুলি যেমন জীবন্ত তেমন নিষ্ঠুর। তাঁর লেখা পড়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ১৯২৭ সালে লিখেছিলেন, ‘শৈলজানন্দের গল্প আমি কিছু কিছু পড়েছি। দেখেছি দরিদ্র জীবনের যথার্থ অভিজ্ঞতা এবং সেইসঙ্গে লেখবার শক্তি তাঁর আছে বলেই তাঁর রচনায় দারিদ্র্য ঘোষণার কৃত্রিমতা নেই। তাঁর বিষয়গুলি সাহিত্যসভায় মর্যাদা অতিক্রম করে নকল দারিদ্র্যের শখের যাত্রাপালায় এসে ঠেকেনি। নবযুগের সাহিত্যে নতুন একটা কান্ড করছি জানিয়ে পদভরে ধরণী কম্পমান করবার দাপট আমি তাঁর দেখিনি— দরিদ্রনারায়ণের পূজারির মস্ত একটা তিলক তাঁর কপালে কাটা নেই। তাঁর কলমে গ্রামের যেসব চিত্র দেখেছি, তাতে তিনি সহজ ঠিক কথাটি বলেছেন বলেই ঠিক কথা বলবার কারি পাউডার ভঙ্গিটা তাঁর মধ্যে দেখা দেয়নি।’
ভারতবর্ষের ইতিহাস অষ্টাদশ শতকের শেষে অর্থাৎ ১৭৭৪ সালে কয়লাকুঠির জীবন ও তার কাহিনির সূচনা হয়েছিল। ভারতে এই সময় থেকেই শুরু হয় কয়লাখনির কাজ। ১৭৭৪ সালে বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন সামার আর গ্রান্ট হিটলি (১৭৫১-১৭৯৩) আবেদন করেছিলেন, তাঁরা দামোদর নদের তীরের কিছু এলাকাতে কয়লার খনিতে খননকার্য চালাতে চান। সেইখান থেকে বলা যায় সূচিত হলো কয়লাখনির জীবনবৃত্তান্ত। এরপরে ১৮২০-২১ সাল থেকে বাংলার রানিগঞ্জ অঞ্চলে নিয়মিতভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হল। ধীরে ধীরে পরিবর্তন সূচিত হল বাংলার খনিজশিল্পের মানচিত্র। সেইসঙ্গে বদলাতে শুরু করলো তৎসন্নিহিত আদিবাসী মানুষজনের জীবনচিত্র।
এই বদলে যাওয়া মানুষগুলোকে যিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। তিনি জন্মেছিলেন ১৯০১ সালের ১৯ মার্চ বীরভূম জেলার রূপসীপুর গ্রামে। বাবা ধরণীধর মুখোপাধ্যায়, মা হেমবরনী দেবী। মাত্র তিন বছর বয়সে মা মারা যাওয়ায় তিনি বড় হয়েছেন বর্ধমান জেলার অন্ডালে মামাবাড়িতে। মাতামহ উখড়ার জমিদার ও কয়লাখনির মালিক সেকালের খ্যাতনামা ব্যক্তি রায়বাহাদুর মৃত্যুঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়। শৈলজানন্দ জীবনের প্রথমদিকে বোলপুর ও মামাবাড়ির উখড়ার স্কুলে পড়লেও সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন রানিগঞ্জ হাইস্কুলে। এখানে আসার পরে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব হয় কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। ১৯২১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বর্ধমানের ইকড়ার জমিদার করালীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা লীলাবতীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। বৈবাহিক সূত্রে তিনি কয়লাখনির জীবন খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। তিনি তাঁর শ্বশুরমশাইকে কয়লার ‘ডিপো’ করে দিতে বলেছিলেন। শুরু হল তাঁর ‘জোড়জানকি’ কয়লাখনিতে যাতায়াত। ডিপোর কাজ ছাড়াও তিনি কয়লাখনির কুলিমজুর জোগাড় করার কাজ করতেন যাকে বলা হত ‘আড়কাঠি’। ফলে তাঁকে প্রায়শই যেতে হত সাঁওতাল পরগণার জঙ্গলের সাঁওতাল পল্লিগুলোতে। তিনি নিবিড়ভাবে লক্ষ করেছেন সেখানকার ভূখন্ড, মানুষজন ও তাদের দিনযাপন। এই প্রেক্ষাপটে ১৯২২ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস নাগাদ ‘মাসিক বসুমতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হল তাঁর লেখা ‘কয়লাকুঠি’ গল্প। ১৯২২ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে লিখে চললেন শৈলজানন্দ তাঁর কয়লাকুঠির কাহিনিমালা। কয়লাখনির দুর্ঘটনা, আদিবাসী কুলিকামিনদের মালিকপক্ষের অধিক মুনাফা লোটার তাগিদে তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া, ‘নিঃস্ব-রিক্ত-বঞ্চিত’ মানুষগুলোর প্রতি মালিকপক্ষের বা ম্যানেজারদের করা বঞ্চনার ইতিহাস শৈলজানন্দ তাঁর গল্পের মধ্যে বুনে দিয়েছেন। কালিদাস রায় ‘বিজলী’ (সাপ্তাহিক) পত্রিকায় বলেছেন, ‘শ্রীমান শৈলজানন্দের কথাসাহিত্য তাই প্রথাসাহিত্য মাত্র নহে— মূলতঃ ব্যথাসাহিত্য’।
সরল সাঁওতাল আদিবাসীদের খনি অঞ্চলের দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বজন হারানোর উদ্বেগ, তাদের হারানোর পরে প্রাপ্য আদায়ের মর্মান্তিক বিড়ম্বনা যা লেখকের এক একটি গল্পের বিষয়। যেখানে গল্পের উপরতলার চরিত্রগুলোর নীতিহীনতা, সীমাহীন লোভ-লালসার ফলে মুনাফা-সর্বস্ব বাণিজ্যিক বুদ্ধি দ্বারা কয়লা খাদানগুলো এক অসাধু ব্যবসায় নিমজ্জিত। সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সমাজের তথাকথিত সভ্য মানুষদের অঙ্গুলিহেলনে। এই ভোগসর্বস্ব মালিক শ্রেণির চারিত্রিক শঠতা প্রান্তিক মানুষদের জীবন বিঘ্নিত ও অতিষ্ঠ করেছে। শৈলজানন্দের কয়লাকুঠির কাহিনিমালা ভারতবর্ষের আদিবাসী সমাজের সাহিত্যিক সাক্ষ্য বহন করেছে। শৈলজানন্দ মনুষ্যত্বের দাবি থেকে বঞ্চিত কলের কুলী, খনির কুলী, মুটেমজুর, বাউরি, হাড়ি, ডোম, সাঁওতাল জীবনের সুখ দুঃখ, হাসিকান্নার কথা বলেছেন। তাঁর সাহিত্যে শুধু কয়লাখনির শ্রমিক নয়, জমিদার, কেরানি, মুদি, চা-ওলা, স্টেশনমাস্টার, ময়রা, ডাক্তার, রাজমিস্ত্রি, ওঝা, যাত্রাশিল্পী, বেকার, বাউন্ডুলে প্রভৃতি শ্রেণির মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এইভাবে শৈলজানন্দ বাংলা সাহিত্যে সূচনা করলেন ‘Mass Treatment’। তিনি বলেছিলেন, ‘গল্পে হচ্ছে এক জীবন থেকে আর এক জীবনের দিকে যাত্রা, দেখো, চেনো, অন্তরঙ্গ হও’। তাঁর গল্প উপন্যাসের মানুষজনদের মধ্যে নারী সবচেয়ে বেশি শোষিত, বঞ্চিত। গল্পগুলি চমৎকার আলেখ্য হয়ে উঠেছে খনিশ্রমিক জীবনের প্রেম, বঞ্চনা, মালিকের শোষণ এবং ইন্দ্রিয় লালসার দ্বারা।
এক নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে গ্রামকেন্দ্রিক আদিবাসীদের আনা হচ্ছে, আর তারা মুখোমুখি হচ্ছে কয়লাখনির বস্তি জীবনের সঙ্গে। তখন না পারছে নিজেদের গ্রামে ফিরে যেতে, না পারছে এই জীবনের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে। যে কারণে গল্পগুলির মধ্যে রয়েছে একটি বিষাদের সুর। রচনা করেছেন লেখক ‘কৃষ্ণবর্ণ-মহাভারত।’ যেখানে সুস্থ, স্বাভাবিক মানসিকতার পাশাপাশি রয়েছে বিকৃত মানসিকতার মানুষজন। হতে পারে তারা অর্থলিপ্সু, ধান্দাবাজ ও যৌনলিপ্সু। মাটির নীচে অন্ধকারের মধ্যে কালোহিরের সন্ধান করতে করতে কখন যেন কয়লাখনির শ্রমিক ও মালিক উভয়েই জীবনের কালোরঙ টিকেই বেছে নিয়েছেন। স্পষ্টতই যা ধরা পরে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কয়লাকুঠি সংক্রান্ত গল্পগুলির মধ্যে।
কয়লাকুঠির নারী পুরুষ:
কয়লাকুঠির নারী পুরুষ উভয় চরিত্রের মানুষের মধ্যে থেকে তিনি তুলে নিয়ে এসেছেন কালোরঙের শেডস। যা মুহূর্তকাল মানুষকে ভাবায়। মানুষের শঠতা, ক্রুরতা কয়লাকুঠির নিকষ কালো জমাট অন্ধকারকে যেন আরও বেশি অন্ধকার করে তোলে। যেখান থেকে মানুষের মুক্তি নেই। যেখানে ছড়িয়ে থাকে কয়লাকুঠির মানুষজনদের মধ্যেকার অসহায়তা ও গ্লানি।
গল্পগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে প্রকৃতিও যেন ধূর্ত মানুষগলোর মনের ভিত তৈরি করেছে। প্রকৃতি তার অপার রহস্য ভরে রেখেছে মানুষের মধ্যে। ‘নারীমেধ’ গল্পটি যেখান থেকে উঠে আসে সেখানে প্রকৃতির বর্ণনা এমন, ‘কয়লাকুঠির দেশ। চারিদিকে রেলের লাইন, লোহা-লক্কড়ের যন্ত্রপাতি চিমনি আর ধোঁয়া অসমতল প্রান্তরের উপর মাঝেমাঝে এক একখানি গ্রাম।… বহুকালের পুরাতন কয়েকটা কয়লাকুঠি। কোনোটা চলিতেছে, কোনোটা বা বন্ধ। বন্ধ খাদের চতুঃসীমায় পা বাড়াইবার উপায় নাই। যেখানে সেখানে ধ্বস নামিয়া উপরের মাটি বহু নিম্নে পাতাল-পুরীর অতল গহ্বরে তলাইয়া গিয়াছে। প্রয়োজনের দিনে ইহার চারিদিকে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া ছিল, রাত্রে লাল রঙের বাতি জ্বলিত, আজকাল আর সে-সব কিছুই নাই। খুঁটিসমেত তার তলা খুলিয়া লইয়াছে, বাতিও আর জ্বলে না।’ কয়লাকুঠির নারী পুরুষের মনেও যেন বাতি না জ্বলা একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। পুরুষ অন্ধকারে হায়না হয়ে নারীর মাংস ভক্ষণ করে। ‘নারীমেধ’ গল্পে দেখি গল্পের প্রধান চরিত্র পঞ্চু। তার বৌ মায়া হলো বন্ধ্যা। তাদের ঘরে গুরুমা একদিন সুন্দরী মেয়ে ছবিকে নিয়ে আসে। পরে তিনি ছবিকে রেখে চলে গেলে কামার্ত পঞ্চু রাতের অন্ধকারে দিনের পর দিন সেই ছবিকে ধর্ষণ করলে, ছবি গর্ভবতী হয়ে পড়ে। শয়তান পঞ্চু ছবির পেটের বাচ্চাকে নষ্ট করে দেয়। পঞ্চু ওর সঙ্গীসাথী নিয়ে এসে ছবির রক্তাক্ত দেহটাকে টেনে হিঁচড়ে কয়লাখনির খাদে ফেলে দেয়। স্বামীর ওপর নির্ভরশীল মায়া, স্বামীর অপকর্ম সব বুঝেও ভয়ে চুপ করে থাকে। শৈলজানন্দের এই গল্পে উঠে এসেছে কয়লাখনির শ্রমজীবী মানুষের লোভ ও লাম্পট্য। সেইসঙ্গে লেখকের গভীর অন্তর্দৃষ্টি, বাস্তব জীবনবোধ এবং সমাজের শোষিত, বঞ্চিত, অসহায় নারীজীবনের দলিল লিপিবদ্ধ হয়ে আছে কয়লাকুঠির ‘নারীমেধ’ গল্পটিতে। পুরুষের পাশাপাশি নারীর শঠতাও চিনিয়ে দেয় শৈলজানন্দের কলমকে।
লেখক একপেশে দৃষ্টিতে কয়লাখনির শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে দেখেননি। পুরুষদের পাশাপাশি সেখানকার দরিদ্র সাঁওতাল, বাউরি মহিলা কুলিমজুরদের মনের মধ্যেও জন্ম নেয় লোভ ও লালসা। যে কারণে ‘পাতালপুরী’ গল্পে টুমনি ও মুংরার প্রেমজীবন ধ্বংস হয়ে যায় বিলাসীর বিষ নজরে পড়ে। কালো কষ্টি পাথরের মতো সুগঠিত সুঠাম শরীরের প্রতি দৃষ্টি পড়ে বাউরিদের সুন্দরী মেয়ে বিলাসীর। টুমনির দিক থেকে মুংরাকে নিজের দিকে টেনে আনতে যৌবন পটিয়সী বিলাসীর সময় লাগে না। টুমনি যখন মুংরাকে জিজ্ঞেস করে, ‘বিলাসীকে খুব তোর ভালো লাগলো মুংরা আমার চেয়েও?’ মুংরা তখন নেশার ঝোঁকে উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ, বিলাসী! বিলাসী! বেশ নাম। খাসা মেয়ে।’ বিলাসীর কথায় মুংরা ‘বিষকাঁড়’ দিয়ে টুমনিকে শেষ করে দেবার কথা ভাবতেও পিছপা হয় না।
বিলাসীর মতো সাঁওতাল রমণী যেমন লেখক সৃষ্টি করেছেন তেমনি নারীর অনন্ত ভালোবাসার ছবিও এঁকেছেন শৈলজানন্দ তাঁর ‘কয়লাকুঠি’ গল্পটিতে। যেখানে ঘটনা আবর্তিত হয়েছে বিলাসী নানকু ও মাইনুর মধ্যে। সাঁওতাল রমণী বিলাসীর প্রেম অবহেলা করে নানকু মাইনুর কাছে গেলেও, মাইনুর মৃত্যুর পরে নানকু জোড়জানকি কয়লাখনিতে ফিরে এলে বিলাসী কয়লাখনির অন্ধকার গহ্বরের মধ্যেই সাঁওতাল যুবক রমনার একতরফা প্রেম অগ্রাহ্য করে নানকুকে পেতে প্রচুর কষ্ট স্বীকার করে। নানকুকে বিলাসী ভালোবাসে তীব্র আবেগ দিয়ে আদিবাসী রমনীর একমুখী প্রেম গল্পের বিষয় হয়ে ওঠে। সাঁওতাল নারীরা যে সহজলভ্য নয়, তাদেরও শ্রমের পশ্চাতে থাকে প্রেমের রঙিন হৃদয় তা ‘কয়লাকুঠি’ গল্পটির মধ্যে খুঁজে পাই, ‘উন্মাদনীর মত আলুলায়িত কেশা, বিস্রস্ত-বসনা-স্কন্ধে স্বামীর মৃতদেহ। সতীর দেহত্যাগের পর মহাদেব নাকি এমনই করিয়া মৃতদেহ স্কন্ধে ত্রিভুবন ঘুরিয়াছিলেন, আজও তেমনই মনে হইতেছিল, সতীই যেন শিবের শব স্কন্ধে লইয়া মসীগাঢ় অন্ধকারময় পাতালপুরীর গুহায় গুহায় ঘুরিয়া বেড়াইতেছে।… কয়লার একটি মস্ত চাংড়া ধড়াস করিয়া ছাড়িয়া তাহাদের মাথার উপর সশব্দে নামিয়া পড়িয়া একসঙ্গে দুইজনকে সেই বিরাট কয়লাস্তূপের নিম্নে সমাধিস্থ করিয়া দিল’ ।
কয়লাখনির রিক্রুটার বা আড়কাঠি ও ম্যানেজার:
কয়লাকুঠির কাহিনি এক চলমান জীবনচিত্র। খনির নীচের জীবন শৈলজানন্দের গল্পের প্রধান উপাদান। সেখানকার কাহিনি শুধুমাত্র সাঁওতাল কুলি মজুরদের কাহিনি নয়, সেখানে আছে মালিকপক্ষ ম্যানেজার, আছে কয়লাকুঠির কর্মচারী। এই কর্মচারীদের মধ্যে কেউ কুলিকামিনদের প্রতি সহানুভূতিশীল, কেউ হৃদয়হীন। এই হৃদয়হীনদের মধ্যেই আছে ‘আড়কাঠি’। খাতায় কলমে যারা ‘রিক্রুটার বাবু’। এরা গ্রাম থেকে সাঁওতাল সহজ সরল পুরুষ নারীদের কয়লাকুঠিতে কাজ এবং বেশি পারিশ্রমিকের লোভ দেখিয়ে টেনে আনে। এরা একটি চক্র হিসেবে কাজ করে। কয়লাকুঠির শ্রমজীবী মানুষেরা ছিল খনি ব্যবসার মানবসম্পদ।
কয়লাকুঠির গল্প বলতে গেলে একাধারে মানবসম্পদ চালানের গল্পও বলা যায়। প্রথম জীবনে শৈলজানন্দ নিজেও চাকরি করতেন কয়লাখনিতে ‘আড়কাঠি’ হিসেবে। সে কারণে তিনি এদের অত্যন্ত কাছ থেকে দেখে আড়কাঠির ভূমিকা নিয়ে যে গল্পগুলি লিখেছিলেন তার মধ্যে ‘বিজয়িনী’ বা ‘নারীর মন’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেখানে দেখা যায় আড়কাঠি এসে ভুলির বোন সাঁওতাল যুবতী টুরনীকে আসামের চা-বাগানে কাজ করতে নিয়ে যেতে চায়। পঁচিশ টাকার বিনিময়ে কয়লাকুঠি থেকে টুরনীকে কি যেতে দিতে পারে ভুলি? ‘ভুলি তাড়াতাড়ি আড়কাঠির নিকট গিয়া বলিল, …টুরনী আমারই বোন, সে যাবেক নাই। চল আমি যাব।’
কয়লাকুঠির শ্রমিকদের কিছু সংখ্যক ডাক্তার রেজিংবাবু বা বড়বাবুদের বাদ দিলে সকলেই নানাভাবে তাদের শোষণ করেছে। সেইসঙ্গে ছিল পরাধীন ভারতের কয়লাকুঠির মালিক ইংরেজ সাহেবদের অত্যাচার।
পরাধীনতার গ্লানি কয়লাকুঠির কিছু গল্পে উঠে আসে। ইংরেজ খনি মালিকদের সঙ্গে ছিল সহযোগী হিসেবে দেশীয় ম্যানেজার বাবুরা। এদের শোষণযন্ত্রের তলায় কয়লাকুঠির সাঁওতাল কুলি মজুরদের জীবনে উঠেছিল নাভিশ্বাস। এইরকম চিত্র দেখতে পাওয়া যায় ‘অভাগা’, ‘রেজিং রিপোর্ট’, ‘বন্দী’, ‘ভূতুড়ে খাদ’, ‘প্রেতপুরী’, ‘বলিদান’, ‘মরণবরণ’ প্রভৃতি গল্পে। ‘অভাগা’ গল্পে কয়লাকুঠির ম্যানেজারের ভূমিকা দেখি অত্যন্ত নীচ ও কদর্য। গল্পে আছে, ‘‘আমাদের যে ম্যানেজার সাহেব ছিল, তাহার স্বভাব ছিল বড় খারাপ। সে আমাদের পা দিয়া দলিত। ভাবিত, ছোট জাতের ভালবাসা বলিয়া কোনো জিনিস নাই। সাহেব মাহিনা দিয়া একটা লোক রাখিয়াছিল, পয়সার লোভ দেখাইয়া, জোর জবরদস্তি করিয়া সাহেবের কাছে ছুকরী মেয়েদের ধরিয়া লইয়া গিয়া তাহাদের সর্বনাশ করানোই ছিল সে লোকটার কাজ।’
‘রেজিং রিপোর্ট’ গল্পে সাহেবদের কোলিয়ারির মানুষের প্রতি মনোভাবের পরিচয় দেওয়া যেতে পরে, রেজিংবাবু চঞ্চলকুমার মনে মনে বলেছেন, ‘নিদোর্ষ ওই সাঁওতাল কুলি যুবকের প্রাণের দাম, তোমার রেজিং-এর দামের চেয়ে অনেক বেশী মূল্যবান।’ এই ভাবনার মধ্যে দিয়ে রেজিংবাবুর চরিত্রটি মানুষের প্রতি সহানুভূতির দিক প্রকাশিত। অন্যদিকে বৃদ্ধ ম্যানেজার যেমন অকাতরে বলে, ‘কুছ পরোয়া নেই। এমন কত খুন হয়ে গেছে আমার হাতে।… এখনও রেজিং চাই, আরো বাড়াতে হবে রেজিং।… হেড আপিসের তাড়া সইতে হয় আমাকেই।’ কয়লাখনির ম্যানেজারের নৃশংসতা তার লেখা চঞ্চলকুমারকে একটি চিঠির পরিচয় থেকে জানতে পারি—
“Chan Chal
I am sorry, your services are no longer required. I dismiss you and give you orders to be cleared up and leave colliery within 24 hours.
Herewith I send a slip to the cashier who will you up.
You should not call you any explanation as I have seen you, with my own eyes in the pit No. 5.
G. D. James
চঞ্চলের মুখ হইতে কিছুক্ষণ কোনো কথা বাহির হইল না’। কয়লাকুঠিতে ছিল কিছু চঞ্চলকুমারের মতো ভালো মনের মানুষ যে অত্যাচারিত সাঁওতাল কুলিমজুরদের মন বুঝতো। অভাগী সোহাগীকে কোম্পানীর নামে নিজের পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে সেখান থেকে দ্রুত প্রস্থান করে সে। চঞ্চলকুমারের তখনকার মনোভাব শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় খুব সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন, ‘যুক্তকরে সেই অনাদি অনন্তের উদ্দেশ্যে নমস্কার করিয়া মনে মনে কহিল, ‘হা ভগবান! দাসত্বের পায়ে নিজের মনুষ্যত্বটুকু বিসর্জন দিয়া যে পাপ সঞ্চয় করিয়াছি, আমাকে সে পাপের শাস্তি দিতে তুমি কুণ্ঠিত হইও না। আমার আর কিছু বলিবার নাই।’
কালজয়ী লেখক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় লিখিত কয়লাকুঠি গল্পের ১২৫তম বর্ষ পূরণে বোঝা যায় আজও তাঁর গল্পের জনপ্রিয়তা ও প্রাসঙ্গিকতার কথা। প্রেমেন্দ্র মিত্র বলেছেন, ‘বাংলা সাহিত্যে অপ্রত্যাশিত চমক লাগল শৈলজানন্দের গল্পে। কয়লাকুঠির গন্ধ। সেখানকার সাঁওতাল আদিবাসী- কুলিকামিনদের নিয়ে লেখা। সে গল্পের বিষয় শুধু আলাদা নয়, তার পরিবেশ থেকে সুর স্বর সবই ভিন্ন। শৈলজানন্দ শুধু নতুন মানুষ নিয়ে নতুন ধরনের গল্প লেখেননি, সাহিত্যের ভূগোলই আশ্চর্যভাবে বিস্তৃত করে দিয়েছেন। আঞ্চলিক সাহিত্যের সত্যকার সূত্রপাত শৈলজানন্দের সেই কয়লাকুঠির গল্পে।’ যদিও নিন্দুকরা বলতেন, ‘এ হল বস্তি সাহিত্য’। তবে একথা মানতেই হয় যে যতই তাঁকে সমালোচনা করুক না কেন, খনির কয়লাকাটা শ্রমজীবী মানুষদের হাসি-অশ্রু মেশানো গল্প পাঠক সমাজকে মুগ্ধ করে। খনির পার্শ্ববর্তী বসতি বা ধাওড়ার জীবনের সাঁওতাল বাউরি শ্রমজীবী মানুষদের প্রেম-অপ্রেম-ঈর্ষার সুন্দর বর্ণনা এবং সুবিধাভোগী সমাজের উপরতলার মানুষের নির্লজ্জ ভোগবিলাস প্রান্তিক মানুষদের অসহায় করে তোলে। শৈলজানন্দই প্রথম মজদুর সম্প্রদায়ের ঘরোয়া ও ব্যক্তিগত জীবনের ছবি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার দ্বারা লেখনীর মাধ্যমে নিয়ে এলেন।
তিনিই প্রথম তফশিলি জাতি ও উপজাতি সমাজের অর্থাৎ আদিবাসী খনি মজুরদের জীবনযাত্রার কথকতা কথাসাহিত্যে এনে হাজির করলেন, সেদিক থেকে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন উজ্জ্বল পথিকৃৎ। ১৯৭৬ সালের ২ জানুয়ারী এই মহান প্রতিভার মৃত্যু হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কথাসাহিত্যিকের উদ্দেশ যা বলেছিলেন, সে কথা উল্লেখ করে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধা জানাবো, ‘আমরা দোতলার জানালা দিয়ে গরীবদের দেখছি, তুমি তাদের সঙ্গে মিলে মিশে একাত্ম হয়ে তাদের সুখ দুঃখ অনুভব করেছ গভীরভাবে। তোমার লেখা আমার ভালো লাগে। সাহিত্য তোমার স্থায়ী আসন দেবে।’
গ্রন্থঋণ:
১. কয়লাকুঠি সমগ্র উপন্যাস ও ছোটগল্প— শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়।
২. সুনির্বাচিত কয়লাকুঠি গল্প সংগ্রহ— শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়।
৩. গল্পসমগ্র ১, ২, ৩— শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়।