গাছেদের জীবন

Photo: Statesman

ফোনটা রেখে রান্নাঘর থেকে সুধা আনন্দে উচ্চস্বরে ডাক দিল, ‘শ্যামলী, তোতন আসছে সামনের রবিবার, ওর পছন্দের সব খাবার তৈরি করতে হবে বুঝেছিস। সেই মতো বাজার-হাট সব করতে হবে। ছেলেটা পোস্ত-ইলিশ খেতে খুব ভালোবাসে, তারপর এঁচোড় চিংড়ি, বকফুলের বড়া, মাছের মাথা দিয়ে সোনা মুগের ডাল…’

শ্যামলী শুনতে শুনতে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। সুধা ওকে হালকা ধমক দেয়, বলে, ‘কী রে, শুনছিস না মনে হচ্ছে! মন কোথায় তোর?’
শ্যামলী নরম গলায় বলে, ‘জানি মা, কুচো চিংড়ি আর নারকেল দিয়ে মোচার ঘণ্ট, সজনের ডাঁটা দিয়ে শুকনো করে আলু পটলের চচ্চড়ি, আলুর লম্বা লম্বা ফালি দিয়ে কচি পাঁঠার মাংস, তিলের নাড়ু…’
সুধা প্রসন্ন মুখে বলে,‘বাহ্, তোর তো সব মুখস্থ দেখছি।’

শ্যামলী বলে, ‘তা মুখস্থ থাকবে না মা, এই বাড়ির রান্না খেয়েই তো বড় হয়েছি।’
শ্যামলী খুব একটা মিথ্যে কথা বলেনি। ছোটো থেকেই এ বাড়িতে তার ওঠাবসা। প্রতিবেশী হলেও সে তোতনের সঙ্গে এ বাড়ির উঠোনে খেলাধূলা করে বড়ো হয়েছে। কিশোরী বয়সে সুধা ওকে কতবার বলেছে, ‘আমার ঘরের বউ হয়ে আসবি? তোর থেকে তোতনকে আর কেউ ভালোভাবে বোঝে না।’


শ্যামলী লজ্জায় লাল হয়ে এক ছুটে ওর বাড়িতে পালিয়ে যায়। সুধা ওর এই কাণ্ড কীর্তি দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ে। মনে মনে বলে, পাগলি মেয়ে একটা!
তোতনের বাবা অমূল্যচরণ বেশ গম্ভীর স্বভাবের ছিলেন। খুব উদ্যমী। সুদূর গ্রাম থেকে এসে এই বর্ধিষ্ণু শহরে পাঁচ কাঠা জায়গা কিনে এই দোতলা বাড়ি করেছিলেন। বাড়ির পিছনে আম, জাম, কাঁঠাল আর নিম গাছ লাগিয়েছেন। মাঝে মাঝেই দার্শনিকের মত বলতেন, ‘সবাই চলে যায় সুধা, কিন্তু গাছেরা যায় না। ওরা শুধু আশ্রয় দিতে জানে, সারাজীবন নিজেরা রোদে পুড়ে অন্যকে ছায়া দেয়, আর বলহীনের অবলম্বন হয়।’

তিনি নিজ হাতে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। শহরে শাড়ি কাপড়ের মস্ত দোকান দিয়েছিলেন। ব্যবসার বাইরে কোনও কিছু বুঝতেন না। শেষের দিকে ব্যবসায় প্রচণ্ডভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হতে শুরু করেন। এইসময় সংসারের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন যেন টালমাটাল হতে শুরু করে। এই অবস্থার মধ্যেই একদিন স্ট্রোক হয়ে মারা যান। বেশ দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল তোতন এবং তার মা। তোতন তখন কলেজ পাশ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। সুধা তার সমস্ত গয়নাগাঁটি বিক্রি করে ছেলের পড়াশোনা চালিয়েছিল। ইউনিভার্সিটির শেষের দিকে ক্যাম্পাসিং-এ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি পেয়ে যায় তোতন। প্রথম পোস্টিং হয় বেঙ্গালুরুতে।

বেঙ্গালুরু যাবার আগে তোতন ওর মাকে বলেছিল, ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পোস্টিং নিয়ে কলকাতায় চলে আসবো মা। তুমি চিন্তা কোরো না। তোমার দেখভালের জন্য শ্যামলী আছে তো।’
—‘শ্যামলীর কী দায় আমাকে দেখভাল করার? ও তো আর ঘরের বউ না!’
—‘তোমার কী ইচ্ছে মা? ও ঘরের বউ হয়ে আসুক।’
—‘তার আগে তুই বল, তোর কী ইচ্ছা? তোরা তো একসঙ্গেই বড় হয়েছিস। তুই যদি রাজি থাকিস, তাহলে কথা এগোই।’
—‘এখন এসব নিয়ে ভাবছি না মা। নতুন চাকরি, একটু থিতু হতে দাও।’
প্রসঙ্গটা এখানেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।

না, তোতন পোস্টিং নিয়ে আর কলকাতায় আসেনি। বেঙ্গালুরু থেকে সে সোজা চলে গিয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়ায়।
শ্যামলীর পাত্র দেখা শুরু হয়েছিল। কিছুতেই সে বিয়েতে রাজি হচ্ছিল না। শেষে ওর মা তীক্ষ্ণ ভাষায় অপমানের সুরে বলে, ‘বড়লোক ইঞ্জিনিয়ারের বউ হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে দে। ওরা শুধু টোপ দেবে, গায়ে গতরে খাটিয়ে নেবে।’

সুধা সেইসব দিনে শ্যামলীর দিকে আর তাকাতে পারেনি। মেয়েটা কেমন যেন খাপছাড়া হয়ে থাকে। একদিন শ্যামলী বলেই বসে, ‘আমার বিয়ে হয়ে গেলে, তুমি কীভাবে থাকবে মাসিমা?’
—‘বোকা মেয়ে একটা। নিজের জীবনের কথা ভাব। নিজেরটা নিজেকেই তো গুছিয়ে নিতে হবে। তোকে ঘরের বউ করার স্বপ্ন তো আর পূরণ হলো না!’

সুধার বুকের অতল গভীর থেকে দীর্ঘনিঃশ্বাস বের হয়। স্বপ্নের ভাঙা কাচগুলো ওই নিঃশ্বাসের সঙ্গে মেঝেয় গড়িয়ে পড়ে।
শ্যামলী বেশিদিন শ্বশুরবাড়ির সংসার করতে পারল না। বরটা ছিল পাঁড় মাতাল। মদ খেয়ে রাতে বাড়ি ফিরে বউ পেটানো ওর প্রাত্যহিক অভ্যেস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শ্বশুর শাশুড়ি ভয়ে বা অপত্যস্নেহে এই দৈনিক বউ পেটানো পরম্পরার কোনও প্রতিবাদ করেনি।

একদিন প্রচণ্ড নেশায় সে শ্যামলীর মাথা ঠুকে দিয়েছিল শক্ত দেওয়ালে। মাথা ফেটে ঝরঝর করে রক্ত বেরোচ্ছিল। প্রথমদিকে ওরা হাসপাতালে ভর্তি করতে চায়নি। কিন্তু অবস্থা বেগতিক বুঝে শ্বশুরমশাই শেষমেশ হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। কপালজোরে শ্যামলী সে যাত্রায় বেঁচে যায়। হাসপাতাল থেকে সে সোজা চলে আসে নিজের বাড়ি।

কিন্তু বাড়ি এসে বিপদ যেন আরও বেড়েছিল। ওর মা পারলে ওকে ঠেলেঠুলে তখনই শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেয়। জোরে জোরে চিৎকার করে পাড়া মাথায় তুলে বলে, ‘বুড়ো বয়সে আর বাপের বোঝা হয়ে দাঁড়াস না। এমনিতেই মানুষটা অক্ষম। আগের মত আর কাজ করতে পারে না।’
—‘কিন্তু মা, আমি তো মরেও যেতে পারতাম!’
—‘মরে তো আর যাসনি! কী হলে কী হতো, ওসব নিয়ে ভাবিস না। সে তো তুই একদিন ইঞ্জিনিয়ারের বউ হতে পারতিস। কিন্তু তা তো আর হয়নি।’
—‘মা আস্তে বলো। পাড়ার সবাই তো শুনতে পাবে। আর বারবার কেন একই কথা বলো?’
—‘শুনুক। পাড়ার সবাই জানুক, কীভাবে মেয়েকে টোপ দিয়ে ফ্রিতে কাজ করিয়ে নিতে হয়।’

শ্যামলী আর কথা বাড়ায়নি। চুপচাপ বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছিল।
পরদিন খুব সকালে সুধা ওদের বাড়ির উঠোনে এসে হাজির হয়েছিল। ওকে দেখে শ্যামলীর মা-বাবা অবাক হয়ে গিয়েছিল। সুধা শ্যামলীর মায়ের উদ্দেশে বলেছিল, ‘ইঞ্জিনিয়ারের বউ হতে পারেনি তো কী হয়েছে? ও আমার মেয়ে হয়ে আমার কাছে সারাজীবন থাকবে। চল রে মা।’
শ্যামলীও সুধার কথায় নিজের বাড়ি ছেড়ে তার বাড়িতে উঠেছিল। সেই থেকে সে এই বাড়িতেই আছে। সুধা তাকে নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসে, আদর যত্ন করে।

একদিন শ্যামলীর স্বামী মত্ত অবস্থায় সুধার বাড়িতে এসে চরম গালিগালাজ শুরু করে। শ্যামলীকে জোর করে ধরে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু সুধার উগ্র বিভীষিকা মূর্তি দেখে ও পুলিশের ভয় দেখানোয় সে পালিয়ে যায়।
তারপর সুধা শ্যামলীকে বলে, ‘তোর আমি ভালো জায়গায় বিয়ে দেবো। তুই শুধু রাজি হ।’
—‘আমাকে আর ওই নরককুণ্ডে ফেলো না।’
—‘কিন্তু তোর একটা ব্যবস্থা না করলে সব লোকে যে বলবে, তোকে আমি বিনা পয়সার ঝি করে রেখেছি।’
—‘সে লোকে যা বলার বলুক গে। আমি তোমার মেয়ে হয়েই থাকতে চাই।’

এরপর বহুপ্রতীক্ষিত সেই রবিবার এসে গেল। আজ সুধা ভোরে উঠে কাঁচা আলোর সুঘ্রাণ নিল। তুলোর মত নরম আলো বাতাসে মিশে আছে মায়াবী সুগন্ধ। সুধা উঠোনে চেয়ার নিয়ে বসল। এই উঠোন, আম-জাম-কাঁঠালের ছায়াঘন বাগান, দূরের পুকুরের আগাছায় ভরা পাড়— এসব জায়গায় তোতনের শৈশব কৈশোর মাখামাখি হয়ে আছে। সুধা ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হচ্ছিল সেই রঙিন হারিয়ে যাওয়া অতীতে। সেখান থেকে কুড়িয়ে আনছিল নিবিড় কিছু স্মৃতি। সেই নিবিষ্ট রোমন্থনে সে মনে মনেই হাসছিল।

এমন সময় শ্যামলী ওর পাশে এসে দাঁড়ায়। সুধার কাঁধে আলতো স্পর্শ করে বলে, ‘মা, কী মনে করে নিজে নিজেই হাসছ?’
সুধা ওর দিকে নরম চোখে তাকিয়ে বলে, ‘ও তেমন কিছু না, এই তোতনের কথা ভাবছিলাম। দেখতে দেখতে ছেলেটা কত বড় হয়ে গেল!’
শ্যামলী প্রসঙ্গ পাল্টাল, ‘আজ কী রান্না করব মা?’
—‘এক কাজ কর, মোচা-চিংড়ি, কলাইয়ের ডাল, আলু পোস্ত, আর কাতলা মাছের মাথা দিয়ে একটা চচ্চড়ি। হ্যাঁ, তাই কর। আর শোন, হরিকে দিয়ে যতটা পারিস বাজার করিয়ে নে। ছেলের কখন কী খেতে মন চায়!’

শ্যামলী চলে যেতেই ইঠাৎ করে কেমন যেন মনখারাপের মেঘ ওর মনের মধ্যে ভেসে এল। ছেলেটা এত বছর বিদেশে আছে, অথচ ফোনে তেমন যোগাযোগ করে না। ফোন করলে বলে, ‘ব্যস্ত আছি মা, তোমায় পরে কলব্যাক করব।’ কিন্তু সেই ‘পরে’র মুহূর্তটি আর আসে না। সপ্তাহে বা পনেরো দিনে একটা দায়সারা কল করে। কথা শুনেই বোঝা যায়, তোমন আগ্রহ নেই। মিনিট দুয়েক কথা বলেই রেখে দেয়। দিন দশেক আগে ও নিজে থেকেই ফোন করে বলে, ‘আমি কিছু দিনের জন্য ওখানে যাব মা। তোমার সঙ্গে কিছু বিষয়ে জরুরি কথা আছে। ফোনে ওসব বলা যাবে না। আগামী রোববার ভোরে ফ্লাইট।’ এই কথা বলেই ফোন কেটে দেয়। এরপর থেকেই সুধা আনন্দে দিশেহারা হতে থাকে। নিজের ছেলেকে ছুঁয়ে দেখেনি কতোদিন, ওর মাথার আঘ্রাণ নেয়নি কতোদিন— এই সব ইচ্ছেরা অন্তত কিছুদিনের জন্য পূরণ হবে।
তোতনের গলায় সামান্য বিরক্তির সুর, ‘মা, এসব রান্না আর আমার ভালো লাগে না। হট ডগ, পিৎজা, স্যান্ডউইচ এসব খেতে খেতে অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। এসব সরিয়ে রাখ মা। তার চেয়ে বরং আমি আর জেনিফার শহরে কোনও রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেয়ে আসি।’

সুধা আঘাত পেলেও কোনও শব্দ উচ্চারণ করে না। শ্যামলীকে ডেকে খাবারগুলো তুলে নিতে বলে। শ্যামলীও তোতনের সামনে খুব একটা আসে না। যে তোতনের সঙ্গে সে শৈশব এবং কৈশোরের সোনালি অধ্যায় কাটিয়েছিল, সে পাল্টে গিয়েছে। সে এখন উন্নাসিক, গুরুগম্ভীর, কিছুটা অহংকারী। এসে থেকে সে শ্যামলীর সঙ্গে একটি বাক্যালাপও করেনি। এই বিষয়টা শ্যামলীর আত্মসম্মানে আঘাত করেছে। বিশেষত, এই কারণেই সে তোতনের সামনে আসে না। সব সময় নিজেকে আড়ালে আবডালে লুকিয়েই রাখে।

জেনিফারকে দেখে সুধা বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিল। তোতন বিন্দুমাত্র এই বিষয় সম্পর্কে আভাসও দেয়নি। মায়ের এই হতভম্ব ভাবটা তোতন মনে মনে উপভোগ করছিল। তারপর নিজের থেকেই বলেছিল, ‘মা, এ হলো তোমার হবু বৌমা। আমরা একসঙ্গেই থাকি। শিগগিরই বিয়ে করব। আমার কোম্পানিতেই ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করে।’

সুধা প্রথম অবস্থায় কিছু বলতে পারেনি। তারপর ধীরে ধীরে নরম গলায় বলেছিল, ‘সুখী হও মা।’
রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে রাত করেই ওরা বাড়ি ফেরে। তোতন মার কাছে গিয়ে ফ্লাইটের একটা টিকিট বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘মা, এবার তোমাকেও আমাদের সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে থাকতে হবে। আমরা দু’জনেই অফিসে বেরিয়ে যাই। বাড়িতে কাজকর্মের বেশ অসুবিধে হয়। তুমি থাকলে তোমার একাকিত্বও কাটবে, আবার নতুন দেশও ঘোরা হবে।’

সুধা উত্তর দেয়, ‘আমি এখানে একা নই তোতন। আমার সঙ্গে শ্যামলীও আছে। ওর কী হবে?’
—‘তুমি নিজের ছেলের চিন্তা করবে, না পরের মেয়ের চিন্তা করবে? ওকে না হয় কিছু টাকা পয়সা দিয়ে ব্যবস্থা করা যাবে।’
সুধার মুখে আর বাক্য সরে না। বাইরের ঘোর অন্ধকার ওর মনের মধ্যে ঢুকে ভাবনার জগতকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। সমস্ত ভাবনাচিন্তা এক লহমায় যেন জট পাকিয়ে যায়। সে ধীরে ধীরে শোয়ার ঘরের দিকে রওনা দেয়।

পরদিন সকালে চা খাওয়ার সময় শ্যামলী সুধাকে বলে, ‘মা, তুমি তোমার ছেলের কাছেই যাও। আমাকে নিয়ে অযথা ভেবো না। আমার ঠিক একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
—‘কিন্তু, কী ব্যবস্থা করবি তুই?’
—‘সে না হয় দেখা যাবে, তবে তোমার ছেলে অনেক আশা করে তোমাকে নিতে এসেছে, ওর সঙ্গে গেলে বাকি জীবনটা তোমাকে আর চিন্তা করতে হবে না। নিজের ছেলের কাছে থাকাটা শেষ বয়সে বেশ সৌভাগ্যের। সবার এমন কপাল হয় না।’
—‘তুই ভেবে বলছিস, শ্যামলী?’
—‘হ্যাঁ মা, যথেষ্টই ভেবে বলছি। তুমি যাও, তোমার জিনিসপত্র আমি গুছিয়ে দিচ্ছি।’

তোতন আর জেনিফার এখন বাড়ির রান্না করা খাবার খায় না। প্রতিদিন রেস্টুরেন্টেই খেতে যায়।
পরদিন ভোরবেলা তীক্ষ্ণ যান্ত্রিক শব্দে সুধার ঘুম ভেঙে যায়। পিছনের জানালা খুলে দেখে একজন গাছ কাটার মেশিন দিয়ে বুড়ো নিম গাছের ডাল কাটছে। আর এই কাজের তত্ত্বাবধান করছে তোতন। নিমগাছকে আঁকড়ে ধরে যে বোগেনভিলিয়া গাছটি উঠেছিল সেটিকে নির্মমভাবে তছনছ করে দিয়েছে। ফুলগুলো চারিদিকে লণ্ডভণ্ড হয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। এই দৃশ্য দেখে সুধা দৌড়ে গেল ওখানে।

ছেলের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। তোতন সামান্য ঘাবড়ে যায়। থতমত ভাব কাটিয়ে বলে, ‘আসলে মা, আমরা যখন চলেই যাচ্ছি, তখন ভাবলাম এই বাড়িটার দেখভাল করবে কে?
তাই প্রোমোটার সতীশ রায়কে বাড়িটা বিক্রি করে দেব বলে মনস্থির করেছি। শুধু শুধু এত টাকার সম্পত্তি এখানে অরক্ষিতভাবে ফেলে রেখে কোনও লাভ নেই। তার থেকে বরং বিক্রি করলে মোটা অঙ্কের টাকা আসবে। তাই বাড়ি বিক্রির আগে এই গাছগুলো কেটে দরদাম করে বেচে দিচ্ছি।’

ছেলে এবং মায়ের কথোপকথনের মধ্যে ওই ব্যক্তিটি গাছ কাটা বন্ধ রেখেছিল। সুধা ওকে গাছ থেকে নামতে বলে। গম্ভীরভাবে চলে যেতে বলে। ও ফ্যালফ্যাল করে তোতনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ওর ইশারা পেয়ে চলে যায়। সুধা কোনও কথা না বলে বাড়ির মধ্যে ঢুকে যায়। তোতন কী করবে বুঝতে পারে না। মুখে বিরক্তিসূচক শব্দ উচ্চারণ করে বাড়ির বাইরে চলে যায়।
বাড়ি বিক্রি সম্পর্কে এরপর আর কোনও কথা উচ্চারিত হয়নি।

আগামীকাল সুধা চলে যাবে। শ্যামলী ওর জিনিসপত্র গুছিয়ে প্রস্তুত করে রেখেছে। আর বারবার কান্না জড়ানো গলায় বলছে, বিদেশে গিয়ে যেন ওর চিন্তা না করে।
সুধার কিছুতেই ঘুম আসছিল না। সে পিছনের জানালা খুলে তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। চাঁদের দুধসাদা আলোয় চারিদিক ধুয়ে যাচ্ছে। কুচি কুচি সাদা রঙের আলো কুয়াশার মত প্রকৃতিকে জড়িয়ে আছে। সুধা ওই আলোর মধ্যে ছন্নছাড়া হয়ে মটিতে লেপ্টে থাকা বোগেনভিলিয়ার ফুল দেখছিল। নিম গাছের কাটা ডাল দেখছিল। দেখতে দেখতে হারিয়ে যাচ্ছিল সুগভীর এক অতীতের মধ্যে। সে সারারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারল না।

পরদিন দুপুরে তোতন আর জেনিফার রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি থেকে এয়ারপোর্টের উদ্দেশে বেরিয়ে গেল। আর কোনওদিন এই জন্মভিটেয় পা দেবে না বলে জানিয়েও গেল।
বিকেলে সুধাকে চা দিয়ে শ্যামলী পাশে বসে এ কথা সে কথার পর বলল, ‘ফ্রিজে তো গাদা গাদা মাছ-মাংস পড়ে আছে মা, ওগুলো কী করব?’

সুধা দৃঢ় গলায় উত্তর দেয়, ‘ওগুলো সব হরিকে দিয়ে দে। আর শোন, ওকে একটা বোগেনভিলিয়ার চারা আনতে বলিস।’