সে আসবেই

Photo: Statesman

সুনয়ন আজ ভোরে এসেছিল। ভোরের হালকা আলোর ব্যালকনিতে বসেছিল চেয়ারটায়। আমার মুখের দিকে চাইল।
স্বপ্নতত্ত্বের ব্যাখ্যায় ভোরের এই মানুষ আসার অর্থ— সে আপনাকে কিছু বলতে চায়। সুনয়ন প্রায় আসে। কিন্তু প্রত্যেকবার তার কিছু বলার আগে স্বপ্নটি ভেঙে যায়। আজও ধাতব এক শব্দে স্বপ্নটা চুরমার হয়ে গেল। সুনয়ন কী বলতে চায় আমি জানি—

পলাশপুরে আমার সাজানো ঘর বাড়িতে সুনয়ন কিছুদিন বাস করেছিল। অজয় তার সম্পর্কিত দাদা, সেই সুবাদে কলকাতায় বদলি হয়ে কোথায় আর ঘর খুঁজবে, তাই শহরতলীতে থাকা। তার বউ রত্নাও চাকরি করে বর্ধমানে। —ছুটিছাটা ছাড়া কাছে থাকা হয় না তাদের।

সুনয়নের বাড়ি বর্ধমানের গ্রামের দিকে। সম্পর্কের কারণে সুনয়ন আমাকে সম্মান ও ভালবাসার স্বচ্ছন্দ ঘনিষ্ঠতা দিত। আমার ছেলে, মেয়ে, বর এই ইউনিটে ননদ তৃষাও আছে। বাবা মা বেঁচে থাকতে কিছুদিন বরের ঘর যেটুকু করেছে, পরে সেটা ভেঙেচুরে এখানেই। সেও চাকরি করে বিয়ের আগে থেকেই।


সুনয়ন ছুটি পেলেই বাড়ি যায়। বাড়ি বলতে, খেলা খেলনাহীন একচিলতে রত্নার ফ্ল্যাট। সাত বছরেও শিশু আসেনি যে ঘরে। আমার ছেলে-মেয়ের জন্য লজেন্স চকো আনা আর আদরের আতিশয্য দেখে তার চাপা চাহিদার তীব্রতা বোঝা যায়। অজয়ের সঙ্গে ক্যারম বোর্ড খেলছে সুনয়ন, আমার ছেলেটা তার বাবার পিঠ ধরে ঝুলছে। আর অজয় তাকে বিরক্ত হয়ে ধেৎ ধাৎ ধমক দিচ্ছে। সুনয়ন নজর করে বলল, অজয়দা, ছেলে মেয়ে নিয়ে তাদের মা বাপের বাড়ি গেলে, তুমি একা এ বাড়িতে কদিন থাকতে পারবে?

অজয় বলল, এদের দুষ্টুমি চেচাঁমিচিতে অতিষ্ঠ হয়ে যাই। বিরক্ত লাগে। তবে না থাকলে আরও বোর লাগে। তিষ্ঠতে পারি না। সুনয়ন
হো-হো করে হেসে উঠল। তৃষা এ সময় তাদের দু’কাপ চা ধরিয়ে দিয়ে বলল, সুনয়নদা এবার একদিন বৌদিকে আনুন। আমরা দেখি। নাহলে আমরা চলে যাব আপনার বাড়ি বৌদিকে দেখতে। সুনয়ন নিজের গুটির দিকে স্ট্রাইকার স্থির রেখে হাসল শুধু। জবাব দিল না। তৃষা স্বভাবমতো স্বচ্ছন্দে সবার সঙ্গে মিশতে পারে। তবে সুনয়নের উত্তর না এলেও একদিন এ বাড়িতে রত্না এল—।

সুনয়ন আমাকে ‘নন্দিতাদি’ বলে ডাকতো। প্রথমেই না, —বেশ কিছুদিন মেলামেশার পর। একদিন শনিবার অফিস ফেরত এখানে আসতে দেখে বললাম, কী ব্যাপার, বাড়ি গেলে না?  সে যেন স্বেচ্ছাকৃত ক্লান্তস্বরে বলল, নন্দিতাদি চা খাওয়াও। পরে জানাল, রত্না এ সপ্তাহে তার দিদির বাড়ি গেছে।

আমার আর বলা হল না, তুমি যাবে জেনেও গেল কি না। তাদের কিছু জটিলতার কথা সুনয়ন আমাকে বলেছে। দেশের বাড়ির বড় গোষ্ঠীর সংসারে— তার বাবা-মার একটি শিশু— আকাঙ্ক্ষার টার্গেট হয়ে— বাক্যের বাণে রত্নাকে ফ্ল্যাটে একা সরে আসতে হয়েছে। শুনে বললাম, ভালোই করেছে। কথার বিষ— বিষের থেকেও তীব্র। বাচ্চা হয়নি। হবে। না হলেই বা কী। তুমি এখানে এনে ভালো গাইনি দেখাও।

সে বলল, বর্ধমানে কি ডাক্তারের অভাব আছে! সব দেখিয়েছি। ডাক্তার বলেছে, এসব ক্ষেত্রে সাইকোলজিরও একটা এফেক্ট আছে। রত্না অভ্যস্ত জেদি আর স্টিফি। যা অনেক সময় এদিকের অন্তরায় হয়ে যায়। আমি কিছু বলতে পারলাম না। সুনয়ন সেদিন অনেকটা ভেঙে পড়া আর্ত গলায় বলেছিল, নন্দিতাদি তুমি আমাকে একটু মানসিক আশ্রয় দিও। যা আমি কোথাও পাইনি। দু’মাস থাকবো বলে একবছর কাটিয়ে দিলাম। সবটাই কি অজয়দার উদারতায়!

আমি তার সহানুভবে থেকেও এটা বুঝলাম, সবদিক থেকে জটিল এক পরিস্থিতির চাপে থাকা পুরুষ এই সুনয়ন। এ সময় যে কেউ তার কাছে খড়কুটোর অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে। তবু তার পাশে থেকে, তার মনের অনায়াস–সরণিতে যেতে আসতে আমার দ্বিধা হয়নি। অজয়কে এসব কথা বলি না। কীভাবে নেবে। সে বরাবর সুনয়নের এখানে থাকা পছন্দ করে না। আমারই প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় আমি অজয়ের নামে তুলে ধরি সবার কাছে।

সুনয়নের সঙ্গে বেশি মেলামেশা তৃষাও পছন্দ করে না। আচমকা তার মেজাজ চরমে ওঠা, সেটা জানান দেয়। বলে, বাইরের একটা মানুষ, নিজের দরকার আছে। থাকছে খাচ্ছে ব্যস। অত কীসের গুরুত্ব!

আমি সতর্ক থাকি। কথা বাড়াই না। তবু খোঁচাতে ছাড়ে না। কথা কাটাকাটি করে। কখনও বড় আকারে নিয়ে গিয়ে, রাতে বন্ধুর বাড়ি গিয়ে থাকে। আমি কয়েকদিন দলছুট হয়ে যাই। তৃষা তখন সবাইকে রাতের খাবার সার্ভ করে। আমার তোয়াক্কা না করেই বাচ্চাদের প্লেট ধরিয়ে দেয় টেবিলে। আরও নিবি? আরও দিই— বলে ঝুঁকে পড়ে পাতে। সুনয়ন নিজের ঘরে শুতে যাবার আগে বলে, তুমি খাবে না তৃষা? সে স্বাভাবিক স্বরে বলে, খাবো তো। আমি আর বৌদি একসঙ্গে খাবো—।

সুনয়ন একবার আমার দিকে দৃষ্টি ছুঁড়ে ঢুকে যায় ঘরে। দিনগুলো এভাবেই যায়। যে দৃশ্যমানতায় শুধুই সরলরেখা, তা কি সত্যিই জটিল নয়!
আমি সে রাতে ছেলে-মেয়ে নিয়ে শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করতে গিয়ে থমকে গেলাম। করিডোরে বিছিয়ে থাকা এক ফালি হালকা আলো পেরিয়ে তৃষা নিজের ঘরে ঢুকছে। হাতে জলের বোতল। ওই তো খোলা দরজা সুনয়নের। আমি বললাম, জল তো টেবিলেই ছিল, সে ঝেঁজে বলল, আগে নিজেরটা দ্যাখো গে যাও— সুনয়ন এ সপ্তাহে অফিসের পথে ব্যাগ কাঁধে জানাল, অফিস ফেরত ওদিকে বাড়ি চলে যাবে। রত্নার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। দু’চারদিন হবে। ভেবো না নন্দিতাদি, ফোন করব। আমি তাকে উইশ করার মতো চৌকাঠ পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। হাত নাড়লাম।

বাড়িটা অজয় ফিরলেও ফাঁকা। দু’দিন হল ঝগড়া করে তৃষা বন্ধুর বাড়ি গিয়ে আছে। বলেছে, চাকরি করি, যেখানে থাকবো— পয়সা ফেলে খাব। অসুবিধা কী। তবে এবারে বরাবরের বন্ধু সুচেতার কাছে নয়। দিয়ার কাছে, চারু মার্কেটে। দিয়ার লিভ-ইনের পার্টনার এখন দু’বছরের জন্য বিদেশে। আমি ওর নম্বর জানি না যে খবর নেবো। অজয় বলল, সুচেতার কাছে দিয়ার নম্বরটা পাও কিনা দ্যাখো। আমার আর ভালো লাগে না। ভাবলাম, যাক দুটো দিন, তারপর দেখা যাবে।

দেখতে দেখতে ডিসেম্বরের শেষে শহর ও শহরতলির দিকে দিকে বইমেলার পোস্টার পড়ে গেল। ওইরকম একটা প্রত্যাশিত খোলামেলা খবরের মতো সুনয়ন জানালো সে কলকাতায় ঘর ভাড়া করে উঠে যাচ্ছে। সুন্দর একটা শো-পিস গিফট করল আমাকে। হাসিমুখে বলল, কতদিন থাকলাম। সবটাই তোমাদের মায়ার টানে। ভালো থেকো নন্দিতাদি। ছেলে-মেয়েদুটোকে কাছে টেনে আদর করল। শেষে অজয়কে প্রণাম করে বলল, আসি অজয়দা—। তৃষা ধারে কাছে কোথাও ছিল। সামনে এল না। সুনয়ন সটান বেরিয়ে গেল।

ভাবলাম, তৃষা এত থম ধরে থাকল কেন। তার কি আপদ বিদেয় হল! সুচেতার কাছে ফোন নিয়ে দিশার কাছে জেনেছিলাম, সে আদৌ দিয়ার কাছে যায়নি। ফিরে অবশ্য বাড়ির সবার সঙ্গে সহজ হয়ে মিশে গিয়েছিল। শুধু সুনয়ন ছাড়া।

চৈত্রশেষের ঝরাপাতার মতো আমারই কেবল মনটা উড়ু উড়ু করে। সুনয়নের ফোন তেমন আর আসে না। ছেলে-মেয়েদুটো বছরের ক্লাস প্রমোশনের মতো মাথাতেও বেড়ে উঠছে। অজয়কে অনেকটা সচেতন হতে হয়েছিল বোনের প্রতি। যা এতদিন দরকার মনে করেনি। তাতেও কোনো ফল হয়নি। এখন সে দিয়ার সঙ্গে শেয়ার করে ফ্ল্যাটে থাকে। যোগাযোগ প্রায় রাখেই না। অজয় ক্ষুব্ধ হতে হতে বোনের প্রতি হালছাড়া এবং হতাশ।

এমনই কিছু নিস্তরঙ্গ দিনগুলোতে সুনামি উঠিয়ে রত্না এসে হাজির। ছোট্ট আমার বাড়িটার সামনে ঘাস পাতা মাড়িয়ে— শীর্ণকায় উঁচুদাঁতের এক মহিলা।

আমি ঘাবড়ে গেলাম। দেখিনি আগে। সে বলল, আমি রত্না। সুনয়নের স্ত্রী। খোলা দরজা দিয়ে এগিয়ে এসে সোফায় বসল। আমার বলার আগেই। ভাবলাম, এই তাহলে রত্না! আমি ঘোরের মধ্যে তাকে দেখছি। হতবাক তাই, আপ্যায়ন করতে ভুলে গেছি। রত্না সেসব তোয়াক্কা না করে মূল কথায় নেমে পড়ে বলল,
—আপনারা কেমন গার্জেন!
—আমি থতমত খেয়ে বললাম, মানে?
—আপনার ননদ তৃষা? সে কোথায় থাকে?

বললাম, কেন, কী হয়েছে? সে তো তার বন্ধু দিয়ার কাছে থাকে নিজের স্বাধীনতায়—রত্না তাচ্ছিল্যের স্বরে বললে, ভালোই খবর রাখেন। আসলে, ভিড়িয়ে দেয়ার পলিসি। স্বামীত্যক্তা বোনকে অন্য পুরুষে ভিড়িয়ে দিয়ে দিব্যি আছে দাদা-বৌদি— হুঁঃ— উঠে পড়ল রত্না। আমি তার হাত ধরে বাকি কথার কবুল চাইলে— সে ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল।

এরপর আমি আর অজয় যখন একটা নিরন্ধ্র বলয়ে, গোলকধাঁধার মতো পথ খুঁজছি— কী করি, কোথা পাই। জানা গেল, দিয়ার কাছে তৃষা কিছুদিন ছিল, বরাবর নয়। সে বলল, ফোন নম্বর খুঁজতে হবে। ওদিকে সুনয়নের বাসা কি বাসা বদলের খবর আমরা জানি না। সে যোগাযোগ
রাখে না।

ঠিক এমন এক সময়ে নির্জন স্তব্ধ দুপুরে কড়া নড়ল। সুনয়ন। কী বলব আমি। আমাকে কিছু বলতে হল না। উদ্ভ্রান্তের মতো আকুল হয়ে সুনয়ন আমার হাত জড়িয়ে ধরল, নন্দিতাদি আমাকে বাঁচাও। আমি একদিন তোমার মানসিক আশ্রয় চেয়েছিলাম, এখন আমারই আত্মার একটা টুকরোকে তুমি রক্ষা করাে—।

এতদিনে আমি বিমুখ তাচ্ছিল্যে তাকে বলতে পারলাম, বাহ অনেক হেঁয়ালি নাটক দেখছি। কিছুদিন আগে বউ এল। এখন তুমি। ননদ তো কবেই চলে গেছে। এসব যে ঘটছে আমাদের জানিয়ে? আমরা কিছু জানি? তলে তলে এত? সুনয়ন বলল, তৃষা তো আমার কাছে এসেছে। জড়িয়ে পড়ে আর কীকরে ফেলে দিই। তবে রত্নাকেও তো আমি ত্যাগ করিনি—।

বললাম, তবে আর অসুবিধা কী, ভালোই তো চলছে— সে বলল, তুমি আমাকে যা খুশি বলো— শুধু মুখ ফিরিয়ে নিও না। এখনও বলছি, তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই।
আমি জানি বাচ্চাটা জন্মালেও পরিচয় পাবে না, বৈধ নয় বলে। অথচ ওর কী অপরাধ বলো। আমি তোমাকে দুটো হাত ধরে মিনতি করছি, তুমি সমাজে ওর একটু জায়গা করে দিও আমার সন্তান হিসেবে—।

আমার আভুমি কেঁপে উঠল— সে আবার কী কথা? সুনয়ন! তুমি এত নীচ! এত লম্পট? জানতাম না তো!
সুনয়ন কেঁদে ফেলল। বলল, আমার পাপ আমার অন্যায় মেনে নিয়েই বলছি, শুধু একটি সন্তানের মুখ— আমি এ আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসতে পারিনি। জানি না, তৃষা ওকে পৃথিবীতে আনবে কিনা— যদি সে আসে আমার সন্তান হয়েই আসুক— তুমি তাকে—
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, এত সহজ! তোমার সন্তানকে সমাজে জায়গা করে দেবার আমি কে! এই অবৈধ কাজের ফলাফল সবার যা হয়েছে, তোমারও তাই হবে—।

সুনয়ন চলে গেল। সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। সময় থমকে থাকেনি। শিশু জন্মেছে এবং সে আছে মায়ের কাছে মায়ের পরিচয়েই।
তবু সুনয়ন আসে। সে আসবেই আমি জানি—-