দেবাশিস দাস
মমতা কি পারবেন চতুর্থ বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হতে? নাকি রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতায় আসবে বিজেপি? প্রত্যাবর্তন নাকি পরিবর্তন? তাই নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছে এতদিন ধরে। সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বাংলার রায় আজ। ২০১৬ বিধানসভার নির্বাচনে ২১১টি আসনে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। ২০২১-এর নির্বাচন ছিল তৃণমূলের কাছে অনেকবেশি চ্যালেঞ্জিং। তাসত্ত্বেও ২১৫টি আসন পেয়েছিল রাজ্যের শাসকদল। সেবার প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি ছিল অনেক বেশি।
২০২৬ বিধানসভার নির্বাচনের উপকরণের কোনো অভাব ছিল না। বিজেপি যখন প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা এবং হিন্দুত্ব অস্ত্রে শান দিয়ে নবন্ন দখলের জন্য জোরদার প্রয়াস চালিয়েছে, ঠিক সেই সময়ে মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এসআইআর ইস্যু এবং একাধিক কল্যাণকামী প্রকল্পকে সামনে রেখে বাংলার মানুষের মন জয় করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। এ রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতা দখলের জন্য বিজেপির অন্তহীন প্রয়াস ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০২১ বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপির স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল। মাত্র ৭৭টি আসন পেয়ে তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল।
সে কারণে এবার আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছিলেন বিজেপি নেতারা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দলকে পরাস্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২২টি, অমিত শাহ ৩৮টি কর্মসূচি করেন। বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা থেকে শুরু করে মোদী মন্ত্রিসভার সিংহভাগ মন্ত্রী রীতিমতো বাংলাকে ঘিরে ব্যূহ রচনা করেছিলেন। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১০৮টি কর্মসূচি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ৮৬টির উপরে কর্মসূচি ছিল চোখে পড়ার মতো।
বাম ও কংগ্রেস যেসব বিধানসভায় শক্তিশালী, সেই আসনগুলিকে সামনে রেখে রণকৌশল তৈরি করেছিল। এর মধ্যে যাদবপুর, পানিহাটি যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি মুর্শিদাবাদের বেশ কয়েকটি আসনও রয়েছে। মালদা, মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের ভোট ব্যাংক রয়েছে। সেই ভোট ব্যাঙ্ক পুনরুদ্ধার করে বিধানসভায় প্রতিনিধি পাঠাতে কতটা সফল হলো তাও জানা যাবে আজ। শূন্যের গেরো কাটানোর পাশাপাশি এই দুই দলের ভোট ব্যাঙ্ক কোন কোন আসনে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নেয় তারও হদিশ মিলবে।
ভোটের ময়দানে রয়েছে আইএসএফ। সেই সঙ্গে আচমকাই নতুন দল গঠন করে হুমায়ুন কবীর সংখ্যালঘু ভোট কাটার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। কিন্তু তার অডিও টেপ ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় রাজনীতির ময়দানে অনেকটা নিষ্প্রভ হয়ে পড়েন তিনি। প্রচারের আলো সরে যায় তাঁর থেকে। অনেক আশা জাগিয়েও তিনি আদৌ নিজের আসন ধরে রাখতে সক্ষম হলেন কিনা সেদিকেও নজর থাকবে। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক যার মধ্যে নিহিত রয়েছে, তৃণমূলের সরকারের চাবিকাঠি, সেই ভোট ব্যাঙ্ক শেষ পর্যন্ত শাসকদল অটুট রাখতে পারল কিনা তাও স্পষ্ট হবে এদিনের গণনাতে।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে এবার বিধানসভা নির্বাচনে ৬০-এর বেশি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা প্রবল। গতবার এই আসনগুলিতে স্বল্প ব্যবধানে জয় পরাজয় নির্ধারণ হয়েছিল। দুপক্ষ আত্মবিশ্বাসী হয়ে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হলেও বাংলার মানুষের মন কোন পক্ষে, তা নিয়ে সমীক্ষক সংস্থাগুলির মধ্যে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। অমিত শাহ নির্বাচনী প্রচারে এসে ১৭০টি আসন জয়ের টার্গেট বেঁধে দিয়েছিলেন। সেই কাজে বিজেপি সফল এমনটাই পূর্বাভাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, বাংলার মহল বলছে বিজেপি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে তাঁকে আসতে হবে। সত্যিই কি তিনি সেই সুযোগ পেলেন? তাও ঠিক হবে আজ।
তবে সমীক্ষক সংস্থার পূর্বাভাস মানতে নারাজ তৃণমূল। বিজেপি প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের অনুকূলে এ ধরনের সমীক্ষা করিয়েছে বলে শাসকদলের অভিযোগ। মানুষের পালস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবচেয়ে ভালো বোঝেন। বুথের ভিড় তৃণমূলের ভোটবাক্সে বসন্ত আনবে, প্রত্যয়ী তৃণমূল। সে কারণে নির্বাচনী প্রচারকে উচ্চগ্রামে নিয়ে গিয়ে বাংলার মহলকে যতই মোদী ও বিজেপিময় করার চেষ্টা করা হোক না কেন, মানুষের হৃদয় কিন্তু মমতায় ভরা। ফল প্রকাশ হলে দেখবেন, খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে বিজেপি। বাংলা জয় করার স্বপ্ন অধরায় থেকে যাবে।
তৃণমূল নেতারা বলছেন বটে, কিন্তু এবার সত্যিই কি তাঁরা গতবারের মতো কনফিডেন্ট? জানতে চায় বিজেপিও। বাস, ট্রেন, অফিস– সর্বত্রই পরিবর্তন হচ্ছেই এমন প্রচার চালিয়েছে বিজেপি। ভোটারদের নীরবতা বিজেপির সেই জল্পনাকে উস্কে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা যে নেই এমন নয়। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে এসআইআর।
অন্যদিকে, ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারী প্রার্থী হয়ে ম্যাচ জমিয়ে দিয়েছেন। ভবানীপুরে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতাকে ব্যস্ত রাখার জন্য এই কৌশল বিজেপির। সেকারণে আগের থেকে এখন অনেক বেশি সতর্ক তৃণমূল।
নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর দুই কেন্দ্রে শুভেন্দু প্রার্থী। আজ নন্দীগ্রামে নয়, শুভেন্দু অধিকারী সকাল থেকেই শাখাওয়াত মেমোরিয়াল কেন্দ্র, যেখানে ভোট গণনা হবে, ভবানীপুরের সেখানেই থাকবেন। আর অন্যদিকে, তাঁর গড়ে দেওয়া টিম থাকবে নন্দীগ্রাম গণনা কেন্দ্রে। ভোট গণনার দিনও তৃণমূলকে এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে নারাজ শুভেন্দু। ভবানীপুরের ৮টি কাউন্সিলর তৃণমূলের। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে পাঁচটি ওয়ার্ডে তৃণমূল পিছিয়ে ছিল। এই অঙ্কই শুভেন্দুকে মেদিনীপুর থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরের ভবানীপুরে টেনে নিয়ে এসেছে। ২০২১-এ মমতা গিয়েছিলেন নন্দীগ্রামের প্রার্থী হয়ে। এবার ফের সম্মুখ সমরে তাঁরা। এই হেভিওয়েটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে টানটান উত্তেজনা রয়েছে। এর আগে অনেক প্রতিকূল অবস্থা অনুকূলে নিয়ে এসে বারবার ম্যাচ জিতিয়েছেন মমতা। এবারও সেই কাজে তিনি কতটা সফল হলেন তা জানা যাবে আজ।