Explained: তোলাবাজি, গুন্ডাগিরির বিরুদ্ধে মারাত্মক পদক্ষেপ মুখ্যমন্ত্রীর,  ঠিক কী কী থাকছে নতুন আইনে?

বাংলায় এবার খতম গুন্ডারাজ (AI নির্মাণ)

একটা সময় ছিল, যখন পাড়ার সেই লোকটার নাম মুখে নিতে ভয় লাগত। এলাকার যে কোনও কনস্ট্রাকশনে বালি-পাথর-রড যা-ই লাগুক, তার থেকেই নিতে হবে। এটা ছিল ফতোয়া। না নিলে কাজ বন্ধ। এলাকায় চপ-রোল-মুদির দোকান খুললেও চাঁদা। না দিলে শাটার নামিয়ে দেওয়া হবে। পুলিশ? তারাও অনেকটাই নিরুপায় ছিল, কারণ তাদের বাত-পা বেঁধে রাখার রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ছিল।

বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি (BJP) বলেছিল, ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah), প্রচারে এসে বারবার এই কথাই বলে গিয়েছেন।

এখন ক্ষমতায় এসে সেই প্রতিশ্রুতিকে আইনের ভাষায় বেঁধে ফেলতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। আগামী সোমবার (২৯ জুন) একদিনের বিশেষ বিধানসভা অধিবেশনে পেশ হচ্ছে দুটো নতুন বিল।


এই আইন পাস হলে কী বদলাবে? আপনার জানা দরকার।

দুটো বিল, দুটো লক্ষ্য

প্রথম বিলটা পুরনো। কংগ্রেস আমলে ১৯৭২ সালে তৈরি ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার অ্যাক্ট’ (West Bengal Maintenance of Public Order Act) আছেই। সেটা সংশোধন করে আরও শক্ত করা হচ্ছে।

দ্বিতীয়টা সম্পূর্ণ নতুন। নাম ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোস্যাল অ্যাকটিভিজ বিল, ২০২৬’ (The West Bengal Public Safety and Control of Anti-Social Activities Bill, 2026)। এটাই মূল আলোচনার বিষয়।

গুন্ডামানে ঠিক কী, বিলে স্পষ্ট করা হয়েছে

‘গুন্ডা’ শব্দটা এখন আইনের ভাষায় সংজ্ঞায়িত বা ওয়েল ডিফাইনড। বিলে লেখা আছে, ঠিক কী কারণে কাকে গুন্ডা বা দাগি বলা হবে।

যে নিজে অথবা কোনও চক্র বা সিন্ডিকেটের হয়ে অসামাজিক কাজ করে, করায়, মদত দেয়, বা টাকা জোগায়, সে গুন্ডা। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র ১১১ বা ১১২ ধারায় যার নামে চার্জশিট হয়েছে, সে গুন্ড। আর্মস অ্যাক্ট (Arms Act), মাদক আইন (NDPS Act), ইমমোরাল ট্র্যাফিক অ্যাক্ট (Immoral Traffic Act) বা মানবপাচার আইনে, বিস্ফোরক আইনে (Explosive Substances Act) যে জড়িয়ে পড়েছে, সেও গুন্ডা বা দাগি। যাকে সমাজ বিপজ্জনক ও মরিয়া মানুষ হিসেবে চেনে, সেও এই তালিকায়।

আর ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ মানে? সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক তৈরি করা। কারও ব্যবসা, পেশা, চলাফেরায় বাধা দেওয়া। বেআইনিভাবে জমি বা সম্পত্তি দখল। সরকারি বা বেসরকারি সম্পদের বড়সড় ক্ষতি। এমনকি অবৈধভাবে বালি তোলা, পাথরখাদান চালানো, বনের গাছ বা বন্যপ্রাণ নিয়ে কারবার করা।

এক বছর পর্যন্ত আটকে রাখা যাবে

এই আইনের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হল প্রতিরোধমূলক আটকের ক্ষমতা। পুলিশ সুপার বা ঊর্ধ্বতন কোনও পুলিশ আধিকারিকের রিপোর্টের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার কাউকে আটক রাখার নির্দেশ দিতে পারবে।

কাকে? যে গত সাত বছরে অন্তত একবার সংশ্লিষ্ট অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে, অথবা তিনটি আলাদা মামলায় চার্জশিটভুক্ত হয়েছে।

আটকের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১২ মাস। জেলাশাসক বা পুলিশ কমিশনারও জরুরি পরিস্থিতিতে আটকের নির্দেশ দিতে পারবেন। তবে সেটা ১৫ দিনের বেশি কার্যকর থাকবে না, যদি না রাজ্য সরকার অনুমোদন দেয়।

পালিয়ে গেলে? সরকারি গেজেটে নোটিস, নির্দেশ না মানলে দুই বছর পর্যন্ত জেল।

এলাকা ছাড়া করার ক্ষমতাও থাকছে

শুধু আটক নয়। জেলাশাসক বা ডিআইজি মর্যাদার পুলিশ আধিকারিক কোনও দাগিকে নির্দিষ্ট এলাকা বা জেলা থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবেন। সেই নিষেধাজ্ঞা এক বছর পর্যন্ত চলতে পারে। সেই সঙ্গে থাকবে নজরদারি, অর্থাৎ নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা।

সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, তারপর নিলাম

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করব, নিলামে তুলব।’ সেই প্রতিশ্রুতি এই বিলেও আছে। দোষীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা নিলাম করে ক্ষতিপূরণ উসুল করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক মহল বলছে, উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ (Yogi Adityanath) সরকারের ‘বুলডোজার মডেল’-এর ছায়াতেই এই বিল তৈরি।

অ্যাডভাইজরি বোর্ড, একটা নিরাপত্তা বলয়

আটক ব্যক্তির তাহলে কোনও সুরক্ষাই কি থাকবে না? উত্তর, অবশ্যই থাকবে। রাজ্য সরকার একটি অ্যাডভাইজরি বোর্ড (Advisory Board) তৈরি করবে। চেয়ারপার্সন হবেন হাইকোর্টের (High Court) বর্তমান বা প্রাক্তন বিচারপতি। আরও দু’জন সদস্য থাকবেন।

কাউকে আটক করার ৩ সপ্তাহের মধ্যে মামলাটি এই বোর্ডের কাছে যাবে। ৯ সপ্তাহের মধ্যে বোর্ড মতামত দেবে। বোর্ড দোষী প্রমাণের ‘যথেষ্ট কারণ নেই’ বললেই মুক্তি। আটক ব্যক্তিকে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের সুযোগও দিতে হবে।

যেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে

বিলে একটি ধারা আছে, যেটাকে বিশেষজ্ঞরা লক্ষ করছেন। বলা হয়েছে, সরকার বা সরকারি আধিকারিক ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ (Good Faith) কাজ করলে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা যাবে না। এই ‘সৎ উদ্দেশ্য’ ধারাটি অনেক সময় অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে, এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

তা ছাড়া, এই আইনে গ্রেফতার হলে তা হবে কগনিজেবল (Cognizable) এবং ননবেলেবল (Non-Bailable)। অর্থাৎ ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার করা যাবে, জামিনও পাওয়া হবে কঠিন।

এরপর কী?

সোমবার বিল পেশ হবে। তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ জানিয়ে দিয়েছেন, দোষীদের শাস্তি হলে তাঁদের দল এই বিল সমর্থন করবে। বাকি বিরোধীরা এখনও নীরব।

বিল পাস হলে কতটা বদলাবে বাস্তব? সেটা নির্ভর করবে প্রয়োগের উপর। আইন তো আগেও ছিল, ১৯৭২ থেকেই। শুভেন্দু অধিকারী নিজেই বলেছেন, ‘আইন ঠান্ডা ঘরে পড়ে ছিল।’ নতুন সরকার সেটা ‘বার করে নিয়ে এসেছে।’

অর্থাৎ, পাড়ায় পাড়ায় তোলাবাজি, দাদাগিরি, সিন্ডিকেটরাজ আর থ্রেট কালচার জমানার পাকাপাকি ইতি ঘটতে চলেছে, এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। তা কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সেটাই দেখার।