মানস আর ব্যানার্জি, সিদ্ধার্থ রায়, নীতীশ কাপুর
কলকাতা/দিল্লি:
পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন আবগারি কমিশনার রণধীর কুমার, যার সময়ে ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ স্টেট বেভারেজেস কর্পোরেশন লিমিটেড (ডব্লিউবিএসবিসিএল) গঠিত হয়, ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লিখিত সম্ভাব্য মদ কেলেঙ্কারির বিষয়টি আংশিকভাবে সমর্থন করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ২০২১ সালে কিছু পরিবর্তন আনার আগ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল।
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রর আমলে ডব্লিউবিএসবিসিএল গঠন করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল মদের সরবরাহ ব্যবস্থাকে সুসংগঠিত করা, রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করা এবং রাজ্যে একাধিক মদে বিষক্রিয়ার ঘটনার পর অবৈধ মদের প্রচলন কমানো।
রণধীর কুমার ‘দ্য স্টেটসম্যান’কে বলেন, “হ্যাঁ, আমার সময়েই এবং আমার নেতৃত্বে ডব্লিউবিএসবিসিএল গঠন করা হয়েছিল, যাতে সরকার পুরো ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। বাস্তবে ডব্লিউবিএসবিসিএল একটি পাইকারি বিক্রেতার মতো কাজ করত। কোনও রাজনৈতিক নেতা বা দলের জন্য টাকা তোলার ব্যবস্থারূপে এটি কখনওই ভাবা হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “আমি আবগারি দপ্তরে যোগ দেওয়ার আগে ২০১৬ সালে রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ৩,৮০০ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১,৮৭৪ কোটি টাকায়। আমার সময়ে কোনও অনিয়ম ঘটেনি।”
রণধীর কুমার আরও যোগ করেন, “আমার জানা মতে, ২০২১ সালে কিছু পরিবর্তন করা হয়।”
এদিকে বিজেপি আবারও তৃণমূল কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছে। বিজেপির মুখপাত্র শেহজাদ পুনাওয়ালা বলেন, “মদের নীতিতে যে সব পরিবর্তন আনা হয়েছে, তার মূল লক্ষ্য যেন ছিল ‘ইএমসি’—অর্থাৎ এক্সটরশন, ম্যানিপুলেশন ও কমিশন। এর ফলে তৃণমূলের প্রথম পরিবারের বিপুল লাভ হয়েছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে, পঞ্জাবে আপ বা ছত্তিশগড়ে কংগ্রেস— সব ক্ষেত্রেই যেন একই ধারা দেখা যায়। মনে হয় নীতিগুলি দুর্নীতিগ্রস্তদের জন্য, দুর্নীতিগ্রস্তদের দ্বারা এবং শুধুমাত্র দুর্নীতিগ্রস্তদের স্বার্থেই তৈরি হয়েছে।”
১৩ আগস্ট ২০২১ তারিখের “পশ্চিমবঙ্গে মদের ব্যবসার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষণ” শিরোনামের ২১ পাতার একটি রিপোর্ট, যা ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’ ও ‘দ্য স্টেটসম্যান’ দেখেছে, তাতে আবগারি দফতরের পাঁচজন আধিকারিকের স্বাক্ষর ছিল। এদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন স্পেশাল কমিশনার (রাজস্ব) গৌতম ঘোষ, স্পেশাল কমিশনার (এইচআর) কুণাল বিশ্বাস, অ্যাডিশনাল কমিশনার (রাজস্ব) রাজর্ষি চক্রবর্তী, সিনিয়র জয়েন্ট কমিশনার (রাজস্ব) শান্তনু আচার্য এবং ডেপুটি কমিশনার (রাজস্ব) সঞ্চয়ন গাঙ্গুলী।
একজন আধিকারিক, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমার যতদূর মনে পড়ে, সেই সময় অর্থ দফতর একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। সম্ভবত আমি সেই কমিটির সদস্য ছিলাম। কমিটি বিষয়টি পরীক্ষা করে রাজ্য সরকারকে তাদের সুপারিশ জমা দেয়।”
এদিকে, এক শীর্ষস্থানীয় আধিকারিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‘দ্য স্টেটসম্যান’কে জানান, “কয়েক বছর আগে কলকাতার সল্টলেকে দেশি মদের বটলজাতকারীদের একটি বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী চারজন সশস্ত্র ব্যক্তিকে নিয়ে জোর করে ঢুকে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বটলজাতকারীদের প্রতি বোতল ২.৫ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হতে হয়। এটাই ছিল মদের ব্যবসা থেকে বেআইনি টাকা তোলার সূচনা।”
ওই আধিকারিক আরও জানান, দেশি মদের (সিএস) ব্যবহার মোটামুটি ৩০ শতাংশ, আর দেশীয়ভাবে তৈরি বিদেশি মদ (এফএল) প্রায় ৭০ শতাংশ বাজার দখল করে। তাঁর মতে, এই অসমতা থেকেই বেআইনি টাকা আদায়ের নতুন পদ্ধতি তৈরি করা হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, মোট আদায়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দপ্তরের জন্য নির্ধারিত ছিল।
‘দ্য স্টেটসম্যান’ যে নথিপত্র পরীক্ষা করেছে, তাতে দেখা যায় সংশ্লিষ্ট সময়ে মোট ১৮ জন ডিস্ট্রিবিউটর নিয়োগ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৩ জন বিদেশি মদের ডিস্ট্রিবিউটর এবং ৫ জন দেশি মদের ডিস্ট্রিবিউটর ছিলেন।
সূত্রের দাবি, পরে গৌতম ঘোষের বদলির পর— যিনি পরবর্তী সময়ে আইএএস ক্যাডারে উন্নীত হয়ে অর্থ দফতরে যোগ দেন— কর্পোরেশনের কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ অন্য আধিকারিকদের হাতে চলে যায়।
এই বিষয়ে মন্তব্য জানার জন্য বারবার ফোন করা হলেও গৌতম ঘোষ কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি।
সূত্রের আরও অভিযোগ, ২০২৪ সাল থেকে ডব্লিউবিএসবিসিএল-এর স্পেশাল কমিশনার (রাজস্ব III) ও জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশনস) সুদেষ্ণা চক্রবর্তী কর্পোরেশনের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেন। সূত্রের দাবি, কিছু বটলজাতকারীর পেমেন্ট সাইকলকে চাপ সৃষ্টি করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হত।
যোগাযোগ করা হলে সুদেষ্ণা চক্রবর্তী সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের কোনও লেনদেন হয়নি এবং ডব্লিউবিএসবিসিএল-এর অডিট রিপোর্টেও এ ধরনের কোনও প্রমাণ নেই।
এদিকে শিল্পমহলের সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক রিপোর্ট প্রকাশের পর দেশি ও বিদেশি মদের বটলজাতকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাঁদের মতে, আগামী দিনে এই বিষয়টি আরও বড় বিতর্কে পরিণত হতে পারে।
এই বিষয়ে রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায় বলেন:
“যেদিকেই তাকান, সর্বত্রই দুর্নীতি। তৃণমূল কংগ্রেসের মন্ত্রী, বিধায়ক এবং সাংসদ—সকলেই এই দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকাণ্ডে জড়িত। গত ১৫ বছর ধরে তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া আর কিছুই করেনি। সাধারণ মানুষের জন্য এবং পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থ আত্মসাৎ করে নিজেদের সম্পদ ও প্রভাব বাড়ানো হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় প্রতিটি বড় কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত। এমন কোনো কেলেঙ্কারি নেই যেখানে তাঁদের নাম নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কেলেঙ্কারি ঘটেনি, এবং এমন কোনো বিতর্ক নেই যেখানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ওঠেনি।
কেন্দ্রীয় সংস্থার হস্তক্ষেপের প্রশ্নে তাপস রায় বলেন, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই ধরনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজনীয় এবং তা হওয়া উচিত।”