এক মুহূর্তে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল বিশাল লোহার কাঠামো। ধুলো, ধ্বংসস্তূপ আর মানুষের আর্তনাদে ঢেকে গিয়েছিল তারাতলার ব্রেসব্রিজ সংলগ্ন এলাকা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে লোহার বিম ও কংক্রিটের স্তূপের নিচে আটকে ছিলেন বহু শ্রমিক। কেউ জীবনের জন্য লড়াই করে ফিরে এসেছেন, কেউ কেউ আর ফিরে আসতে পারেননি। দুর্ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে থাকা রক্তমাখা লোহার বিম, কংক্রিটের স্তূপ আর প্রিয়জনের খোঁজে ছুটে আসা পরিবারের কান্না — সব মিলিয়ে এক শোকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
দুর্ঘটনার পর প্রথমে স্থানীয় মানুষই উদ্ধারকাজ শুরু করেন। কিন্তু বিশাল লোহার বিম ও কংক্রিটের স্তূপ সরানো তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। খবর পেয়ে দমকল, কলকাতা পুলিশ, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, পরে সেনাবাহিনী ও জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। আনা হয় ৫০ টন ওজন তুলতে সক্ষম হাইড্রোলিক ক্রেন, জেসিবি, গ্যাস কাটার, ভার্টিক্যাল ড্রিলিং মেশিন এবং স্নিফার ডগ।
উদ্ধারকারীরা প্রথমে লোহার বিম কেটে ফাঁকা জায়গা তৈরি করেন, যাতে ভিতরে বাতাস, জল ও অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া যায়। টর্চ ও হ্যান্ড মাইকের সাহায্যে বারবার ডাকা হয় আটকে থাকা শ্রমিকদের। দিন গড়িয়ে রাত নেমে আসার পরেও থামেনি উদ্ধারকাজ। তিনটি সম্ভাব্য জায়গা চিহ্নিত করা হয়, যেখানে শ্রমিকরা আটকে থাকতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। এক মহিলা শ্রমিককে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ আরও একজনকে জীবিত বের করে আনা সম্ভব হয়।
দুর্ঘটনার খবর পেয়েই নবান্নের নির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করা হয়। ঘটনাস্থলে যান রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ, কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ, পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে-সহ একাধিক শীর্ষ আধিকারিক। পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তাঁর বক্তব্য, উদ্ধারকাজে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে প্রাণহানি আরও বাড়তে পারত।
আহতদের গ্রিন করিডোর করে এসএসকেএম হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে ভর্তি কয়েকজনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক। দুর্ঘটনাস্থলে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় একাধিক অ্যাম্বুল্যান্স। খোলা হয়েছে অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্পও। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর শুধু উদ্ধার অভিযানই নয়, গোটা কলকাতার নির্মাণ ব্যবস্থাকেই কড়া নজরে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার।
রাত বাড়লেও থামেনি উদ্ধার অভিযান। ধ্বংসস্তূপের অন্ধকারে এখনও আটকে থাকা শ্রমিকদের বাঁচিয়ে ফিরিয়ে আনার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সেনা, এনডিআরএফ, দমকল ও পুলিশ কর্মীরা। আর বাইরে অপেক্ষা করছেন অসংখ্য মানুষ— কেউ বাবা, কেউ স্বামী, কেউ ভাই কিংবা ছেলের খোঁজে। সেনা, এনডিআরএফ, দমকল ও পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় চলছে সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই। তারাতলার গুদাম চত্বরজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন— ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা বাকিদের কি জীবিত ফিরিয়ে আনা যাবে ?